শ্যামল চক্রবর্তী : কলকাতা, ৫ জুলাই, ২০২৬। হয়ত সামান্য কিছু তথ্যগত ভুল থাকলেও থাকতে পারে। তারজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী ৩০ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের নিয়ে বি বি সি একবার একটি সার্ভে করেছিল। বিষয়— হিন্দুদের সবচেয়ে প্রিয় ভজন কোনটি? তাতে যে ফলাফল উঠে এসেছিল তা জানলে নিশ্চিত হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে দিনরাত বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে রাখা দই মারা নেপোদের মুখ পুড়বে।
ওই ৩০ লাখ হিন্দু মোট ১০ টি ভজনকে তাদের পছন্দের তালিকায় রাখে। তাদের পছন্দের এই ১০ টি ভজনের মধ্যে ৬ টি ভজনের গীতিকারই হলেন শাকিল বদায়ুনী। বাকি ৪টি ভজনের গীতিকার সাহির লুধিয়ানভি।
ওই ১০টি ভজনেই সুর দিয়েছেন নৌশাদ।ওই ১০টি ভজনেই কন্ঠ দিয়েছেন অর্থাৎ গেয়েছেন মোহাম্মদ রফি। ওই ১০টি ভজনই মেহবুব আলী খানের সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে। আর ওই ১০টি ভজন চিত্রায়নেই অভিনয় করেছেন ইউসুফ আলী খান। হঠাৎ এই সময় এই বাসি কাসুন্দি কেন? কারণ, এদেশে ধর্মীয় উদারতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যে প্রত্যেক ভারতবাসীর যুগ যুগান্তরের চর্চায় মজ্জাগত, তা জানিয়ে অন্য একটি অন্য তথ্য পরিবেশন করা।
আপাতত ভজনগুলো কী কী তা জানাই—
“মন তড়পত হরি দর্শনকো আজ…”
“ইনসাফকা মন্দির হ্যয়, ইয়ে ভগবানকা ঘর হ্যয়…”
“গঙ্গা তেরা পানি অমৃত…”
“আও পালনহারে নির্গুণ অওর নেয়ারে…”
“জয় রঘুনন্দন জয় সিয়া রাম…”
“আনা হ্যায় তো আ রাহা হ্যয় ম্যয়…”
“বৃন্দাবনকা কৃষ্ণ কানাইহা….”
“জান স্যকে তো জান, তেরে মন মে ছুপি ভগবান…”
মোটামুটি এরকম।
এবার বলি যে প্রসঙ্গে এই লেখা—
মোহম্মদ পুর লোডা (মুজফ্ফর নগর ,উত্তর প্রদেশ) গ্রামের নিতান্তই এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ফরমানি নাজ।
এ দেশে যেমনটি হয়ে থাকে — অশিক্ষিত দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়, তারও তেমনি হয়েছিল। কিছু দিনের মধ্যে সে এক সন্তানের মা’ও হয়। তারপরই সমস্যার শুরু। তার স্বামী ফরমানিকে অসুস্থ সন্তানসহ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্য এক মহিলার সঙ্গে সংসার বসায়। বাবার বাড়ি ফিরে আসে ফরমানি নাজ। এসে অভাবের তাড়নায়, সন্তানের চিকিৎসার জন্য সেও ভাইদের মতো দিনমজুরের কাজে যুক্ত হয়।
সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আধপেটা খেয়ে কোনক্রমে দিন গুজরান হয়ে যাচ্ছিল ফরমানি নাজের। আমাদের দেশে তাদের মত মানুষের এটাই ভবিতব্য। কিন্তু যেটা বলার মতো খবর, সেই স্বামী পরিত্যক্তা, দিনমজুর ফরমানি নাজ সেলিব্রেটি এখন!
ফরমানি নাজ কখনো গান না শিখেও অসাধারণ সুরেলা গাইতে পারে। তার ভাই আর ভাইয়ের এক বন্ধু একবার ফরমানি নাজের একটি ভজন ইউটিউবে আপলোড করে দেয়। আর তা রাতারাতি ভাইরাল হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই তার যাত্রা শুরু।তারপর থেকে সে তার সুরেলা গলায় একের পর এক শিবের ভজন ইউটিউবে আপলোড করতে থাকে। এবং প্রায় প্রত্যেকটি ভজনই হিট, সুপার হিট হতে থাকে। সে এখন ইউটিউবের জনপ্রিয় একজন ভজন শিল্পী। তার ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার এখন ৩৮ লাখেরও বেশি। ইউটিউবে তার গাওয়া “হর হর শম্ভু” ভজনটি সাড়ে ৭৮ লাখের বেশি মানুষ দেখেছেন, শুনেছেন।
কিন্তু যে সে সেলিব্রেটি হলেই তো হল না, তারও হ্যাপা আছে!
এদেশের মিডিয়া যে কাজে বিশেষ পটু, তারা প্রচার শুরু করেছে, হিন্দুত্ববাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন একজন মুসলিম হয়ে ফরমানি নাজ কেন শিবের ভজন গাইবে? অন্যদিকে মুসলিম মৌলবাদীরাও ফতোয়া দিয়েছেন একজন মুসলিম মেয়ে কেন শিবের ভজন গাইবে? ইসলাম ধর্মে গান গাওয়া হারাম!
ফরমানি নাজ সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে বলেছেন, আমার গ্রাম মোহম্মদ পুর লোডাতে সব রকম মুসলমানের বাস। কই সেখানে তো আমার কোন সমস্যা নেই! আপনারা এ রকম খবর কোথায় পেয়েছেন আমি জানি না! অন্যদিকে যদি কেউ বলেন মুসলিম মেয়ে হয়ে আমি শিবের ভজন গেয়ে অপরাধ করছি, তাহলে আমার অনেক আগেই মোহাম্মদ রফি সাহাব এই অপরাধ বহুবার করছেন।এবার নিশ্চয় বুঝেছেন প্রথমে বলা তথ্যটির গুরুত্ব? কিছু ধান্দাবাজ লোক এরপরও আমাদের লেজে মোচড় দিয়ে ছুটিয়ে দিতে, লেলিয়ে দিতে, ফরমানি নাজের কন্ঠকে রুদ্ধ করে দিতে পারবেন কিনা জানি না! আমার প্রশ্ন, ফরমানিকে যেদিন তার স্বামী, সন্তানসহ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন এইসব ধর্মের ঠিকাদার, এই সব সাংবাদিকরা কোথায় ছিলেন?
ছবি : প্রতীকী।



















Be First to Comment