Press "Enter" to skip to content

বহরমপুরের কর্ণসুবর্ণ রেলগেটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা..!

কার দোষে কর্ণসুবর্ণে ট্রেন দুর্ঘটনা ?

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : বহরমপুর, ১৭ জুলাই, ২০২৬।    সাতসকালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের কর্ণসুবর্ণ রেলগেটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ! একটি স্কুলগাড়ি এবং এক সাইকেল আরোহীকে সজোরে ধাক্কা দেয় দ্রুতগতিতে আসা নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেন। দুমড়ে যায় পুলকারটি। ভিতরে আট পড়ুয়া।

স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে উদ্ধারকাজে হাত লাগান। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, রেল কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের আধিকারিকরা। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রথমদিকে মৃতের সংখ্যা কম থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট দুর্ঘটনার ভয়াবহতা। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় চারজন। আহতদের মধ্যে একাধিক শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ঘটনাটি ঘটে বহরমপুর থানার অন্তর্গত কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝের ২৪এ/২ নম্বর রেলগেটে। শুক্রবার সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ ট্রেন যাওয়ার জন্য লেভেল ক্রসিংয়ের গেট বন্ধ করা হয়। ট্রেন চলে যাওয়ার পর গেট খুলেও দেওয়া হয়। অপেক্ষায় থাকা যানবাহন ও পথচারীরা রেললাইন পার হতে শুরু করেন। ঠিক সেই সময় আচমকাই দ্রুতগতিতে এসে পড়ে নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ! সেটি ধাক্কা মারে একটি স্কুল পুলকার ও এক সাইকেল আরোহীকে। পড়ূয়ারা সবাই যদুপুর রয়্যাল অ্যাকাডেমির।

দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিন শিশু-সহ মোট চারজন। মৃতদের নাম জেসিকা ইয়াসমিন (৯), ফারহানা সুলতানা (৬), জামশেদ আলি (৬৫) এবং আরও এক শিশু। গুরুতর আহত বছর পাঁচেকের ইশানুর রহমান, অনিশা খাতুন, তামান্না খাতুন, মোশারফ মোল্লা, শামিমা খাতুন ও বিশ্বেশ্বর মণ্ডল-সহ আরও কয়েকজন। তাঁদের সকলকেই মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকজনের অবস্থা সংকটজনক, চিকিৎসকরা জানান।

আহত স্কুলছাত্র ইশানুর রহমানের ঠাকুমা বদরুন্নেসা বিবি বলেন, “ছোট ছেলে। স্কুলে যাচ্ছিল। কীভাবে যে দুর্ঘটনা হয়ে গেল! ওর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।” তাঁর অসহায়তা হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি পরিবারের।

দুর্ঘটনার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, লেভেল ক্রসিং খোলা থাকায় এই দুর্ঘটনা। গেটম্যানের চরম উদাসীনতা এবং গাফিলতিই এতগুলো প্রাণহানির কারণ, দাবি তাঁদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত গেটম্যান দীর্ঘদিন ধরেই মদ ও গাঁজা খেয়ে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতেন ! দিনের অধিকাংশ সময়ই কেবিনে নেশার ঘোরে বসা ! অনেক সময় গেট বন্ধ করার পর খুলতে ভুলে যেতেন। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ! এই নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও দাবি এলাকাবাসীর। তাঁদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার দিনও তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন এবং তাই সময়মতো গেট বন্ধ করেননি।

দুর্ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা গেটম্যানকে তাঁর কেবিনে তালাবন্ধ করে দেয়। তাঁদের দাবি, কঠোর শাস্তির আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত ছাড়া হবে না। পরে বহরমপুর থানার পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয়দের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় তাঁর শরীরী ভাষাতেই স্পষ্ট, তিনি নেশাগ্রস্ত। গেট খোলা থাকার কারণ জানতে একাধিক প্রশ্ন করা হলেও তিনি নিরুত্তর !

ঘটনার পরই রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। পরে পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানান, প্রাথমিক তদন্তে সিগন্যালিং ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি পাওয়া যায়নি। নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি নির্ধারিত সিগন্যাল মেনেই চলছিল। ইন্টারলকিং গেটের গেটম্যান এবং তাঁর সুপারভাইজারের গাফিলতির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সেই কারণেই দু’জনকেই অবিলম্বে সাসপেন্ড করা হয়।

প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী অধীররঞ্জন চৌধুরীও রেল পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তিনি বলেন, গেটম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি তিনি জানতে চান, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থায়ী সরকারি কর্মী, নাকি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়। তিনি যথাযথ প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি না এবং দীর্ঘদিন ধরে রেল পরিকাঠামোর উন্নয়নের দাবি ওঠার পরও কেন তার বাস্তবায়ন হয়নি, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এক্স হ্যান্ডেলে শোকপ্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি লেখেন, “কোনও প্রকার গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।” তিনি জানান, রাজ্যের পুলিশ রেলওয়ের গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও তাঁর। পাশাপাশি প্রশাসনকে আহত ও মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান। মন্ত্রী গৌরীশংকর ঘোষ ইতিমধ্যেই হাসপাতালের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে। আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় নিজে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন।

দুর্ঘটনার তদন্তের জন্য রেল ১০ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ভারতীয় রেলের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের আড়াই লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ৫ লক্ষ টাকা ঘোষণা করেছে মৃতদের পরিবারের জন্য। আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। এক মুহূর্তের গাফিলতি কতগুলো পরিবারের জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিতে পারে, মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণের এই দুর্ঘটনা তারই এক নির্মম উদাহরণ।

আমাদের তরফ থেকে প্রতিটি পরিবারকে জানাই সমবেদনা। একই সঙ্গে দাবী, তদন্ত তাড়াতাড়ি শেষ করার। তদন্তের দীর্ঘসূত্রতায় অনেক রিপোর্ট চাপা পড়ে যায় কিনা !

 

 

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *