কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার ,কলকাতা, তিন আগস্ট। ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জামশেদপুর এফসির ! প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, নেপথ্যের কারণ হয়ত আর্থিক সমস্যা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন !
জামশেদপুর এফসির মালিক টাটা গোষ্ঠীর কাছে আইএসএলে একটি দল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোনও বড় বাধা নয়। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র ! ফুটবল স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (এফএসডিএল) সরে যাওয়ার পর ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষ লিগকে সীমিত পরিসরে, কোনওমতে আয়োজনের পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হতে পারেনি টাটা কর্তৃপক্ষ। নতুন বোর্ড সদস্যদের আলোচনার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, দেশের সর্বোচ্চ লিগে আর দল নামানো হবে না। তবে তারা জানিয়েছে, জুনিয়র ফুটবল উন্নয়নের কাজে আগের মতোই বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে।
টাটা গোষ্ঠী বহু বছর ধরেই ভারতীয় ফুটবলের জুনিয়র ডেভেলপমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিভাবান কিশোর ফুটবলারদের খুঁজে বার করা, তাঁদের প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এই সংস্থার অবদান দীর্ঘদিনের। তাই এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় ফুটবলের মূল স্রোত থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ। শুধু জামশেদপুর এফসির ফুটবলাররাই নন, দেশের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীও এই সিদ্ধান্তে হতাশ। সেই হতাশা নাড়া দিয়েছে সুনীল ছেত্রীকেও।
আইএসএলের নতুন মরশুম অক্টোবর মাসে শুরু হওয়ার কথা। তার আগে ডুরান্ড কাপ চলাকালীনই জামশেদপুর এফসি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়, তারা এবারের আইএসএলে অংশ নেবে না। এই ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা খান দলের কোচ, সাপোর্ট স্টাফ এবং ফুটবলাররা। একটি ক্লাব হঠাৎ করে প্রতিযোগিতা থেকে সরে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। কোথায় খেলবেন, কীভাবে পেশাদার জীবন এগোবে, সেই প্রশ্ন এখন তাঁদের সামনে।
এই পরিস্থিতিতে প্রণয় হালদার, প্রতীক চৌধুরি, সার্থক গোলুই সহ দলের একাধিক ফুটবলার ড্রেসিংরুম থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা টাটা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান, আইএসএল থেকে দল তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য। তাঁদের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে ফুটবলার, কোচিং স্টাফ এবং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের জীবনে।
ফুটবলারদের সেই আবেদন স্পর্শ করে সুনীল ছেত্রীর মনকেও। ভারতীয় ফুটবলের এই তারকাও নিজের ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে টাটা কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানান, তাঁরা যেন সিদ্ধান্ত বদলে জামশেদপুর এফসিকে আইএসএলে রাখেন। তিনি এই ঘটনাকে ভারতীয় ফুটবলের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং হৃদয়বিদারক মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন।
সুনীল বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের ফুটবল পরিকাঠামোকে শক্তিশালী রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। আর সেই জায়গায় টাটার মতো সংস্থাগুলি বহু বছর ধরে ভারতীয় ফুটবলের মেরুদণ্ড। জুনিয়র ফুটবলার তৈরির কাজ থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ লিগে একটি পেশাদার দল পরিচালনা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই টাটা গোষ্ঠীর অবদান অনস্বীকার্য।
তবে সুনীল স্বীকার করেছেন, ভারতীয় ফুটবলে বিনিয়োগ করে কোনও কর্পোরেট সংস্থাই উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভের মুখ দেখে না। তবুও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফুটবল শুধু লাভ-লোকসানের অঙ্ক নয়, কোটি মানুষের আবেগ। তাই এমন সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, হৃদয়ের জায়গা থেকেও বিবেচনা করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, জামশেদপুর এফসি সরে গেলে হয়তো একটি দল কম নিয়েও আইএসএল আয়োজন করা সম্ভব। আবার চাইলে অন্য কোনও দলকে নিয়েও লিগ চালানো যেতে পারে। কিন্তু টাটা গোষ্ঠীর মত একটি প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় ফুটবল থেকে সরে যাওয়া গোটা দেশের ফুটবল কাঠামোর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাই তাঁর আন্তরিক অনুরোধ টাটা কর্তৃপক্ষকে, ভারতীয় ফুটবলের স্বার্থে জামশেদপুর এফসিকে আইএসএল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার।
এখন গোটা ভারতীয় ফুটবল মহলের অপেক্ষা, সুনীলের আবেদনে টাটা কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয় কিনা ? নাকি ভারতীয় ফুটবল হারাতে চলেছে তার অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভকে ? আমাদের তরফ থেকেও টাটা কতৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার।










Be First to Comment