কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ২ আগস্ট, ২০২৬।শুধু যাত্রী পরিবহণ নয়, এক মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিল বন্দে ভারত ! এতদিন এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স ছিল, এবার ট্রেন অ্যাম্বুল্যান্স ! সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা এই ট্রেনে নিয়ে যাওয়া হল এক দাতার ‘লাইভ’ হৃদপিণ্ড ! মাত্র দু’ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ পার হয়ে সেই হৃদপিণ্ড পৌঁছে গেল সুরাট থেকে আমেদাবাদে। সময়ের বিরুদ্ধে এই দৌড়ই শেষ পর্যন্ত নতুন জীবন দিল এক মুমূর্ষু রোগীকে। ভারতের চিকিৎসা ও রেল পরিষেবার ইতিহাসে তৈরি হল এক নতুন অধ্যায়।
এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দাতার শরীর থেকে হৃদপিণ্ড বার করার পর যত দ্রুত সেটি গ্রহীতার শরীরে স্থাপন করা যায়, অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশী। সেই কারণেই প্রতিটি মিনিটের মূল্য অমূল্য। সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ে হাত মেলায় ভারতীয় রেল, রেল সুরক্ষা বাহিনী (আরপিএফ) এবং গুজরাট পুলিশ। সকলের যৌথ চেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে এই নজিরবিহীন সাফল্য !
সকাল ঠিক ৮টা ৫৮ মিনিটে সুরাট স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ২০৯০১ মুম্বই সেন্ট্রাল গান্ধীনগর ক্যাপিটাল বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে ট্রেনে তোলা হয় দাতার জীবন্ত হৃদপিণ্ড। ট্রেনটি সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে আমেদাবাদ স্টেশনে পৌঁছে যায়। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ মাত্র দু’ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে অতিক্রম করে হৃদপিণ্ড নিরাপদে পৌঁছনো ছিল এই অভিযানের প্রথম ধাপ। কিন্তু লড়াই তখনও শেষ হয়নি। কারণ স্টেশন থেকে হাসপাতালেও সেই অমূল্য অঙ্গটিকে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া পরবর্তী লক্ষ্য।
আমেদাবাদ স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ইউ এন মেহতা ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার পর্যন্ত বিশেষভাবে তৈরি করা হয় ‘গ্রিন করিডর’। শহরের ব্যস্ত রাজপথে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবস্থা করা হয়েছিল ফলে অ্যাম্বুল্যান্স কোথাও এক মুহূর্তের জন্যও আটকায় নি। সবুজ সংকেতের সেই বিশেষ পথ ধরে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যায় হৃদপিণ্ড। নির্ধারিত সময়ে শুরু হয় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকদের দক্ষতা, প্রশাসনের তৎপরতা এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা যৌথ চেষ্টার ফলেই সফলভাবে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয় সেই হৃদপিণ্ড !
এই ঘটনাকে ভারতের চিকিৎসা এবং পরিবহণ ব্যবস্থার ইতিহাসে এক মাইলফলক বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ ভারতে এই প্রথম কোনও জীবন্ত হৃদপিণ্ড ট্রেনে করে এক শহর থেকে অন্য শহরে পরিবহণ করা হল। এতদিন মূলত বিমান বা বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সের মাধ্যমেই এই ধরনের অঙ্গ নিয়ে যাওয়া হত। এবার সেই তালিকায় যুক্ত বন্দে ভারত এক্সপ্রেসও।
এই অসাধারণ উদ্যোগের প্রশংসা করেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল। তিনি একে মানবসেবা ও প্রশাসনিক যৌথ উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ তাঁর। এই ঐতিহাসিক অভিযানে যুক্ত ভারতীয় রেল, আরপিএফ, গুজরাট পুলিশ, চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে তিনি অভিনন্দন জানান। অন্যদিকে আমেদাবাদের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) বেদ প্রকাশের কথায়, এই ঘটনা ভারতীয় রেলের গর্বের মুহূর্ত। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, “ভারতীয় রেল ইতিহাস গড়ল! প্রথমবারের মতো ২০৯০১ মুম্বই সেন্ট্রাল–গান্ধীনগর ক্যাপিটাল বন্দে ভারত এক্সপ্রেস সফলভাবে সুরাট থেকে আমেদাবাদে একটি জীবন্ত হৃদপিণ্ড পরিবহণ করেছে।”
আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিকতার সমন্বয়ের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, কখনও কখনও একটি ট্রেনও হয়ে উঠতে পারে জীবনরক্ষার সবচেয়ে বড় ভরসা।











Be First to Comment