Press "Enter" to skip to content

নবান্নর নির্দেশে পুলিশে ব্যাপক রদবদল…। 

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৪ জুলাই, ২০২৬। রাজ্য পুলিশ প্রশাসনে বড়সড় রদবদল নবান্নর। একসঙ্গে রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের মোট ৩৩ জন পদস্থ আইপিএস ও ডব্লিউবিপিএস আধিকারিকের বদলির নির্দেশ জারি। প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে জেলা পুলিশ, কলকাতা পুলিশ, সিআইডি, গোয়েন্দা শাখা, এসটিএফ, ট্রাফিক, উত্তরবঙ্গ, প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হল। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলতেই এই রদবদল বলে ধারণা। তবে এই দীর্ঘ বদলি তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা সিআইডি-র শীর্ষ পদে পরিবর্তন নিয়ে।

এতদিন সিআইডি-র এডিজি ও আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন সুপ্রতিম সরকার। তাঁর হাতেই ছিল রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের (আইবি) কাজও দেখছিলেন। এবার তাঁকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাজ্য পুলিশের টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের এডিজি পদে পাঠানো হল ! প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বদলি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলেও তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা !

এই মুহূর্তে সিআইডি-র হাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত। তার মধ্যে অন্যতম নির্বাচনের সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা জোড়া অভিযোগ। সেই মামলার সূত্র ধরেই একসময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদও করেন সুপ্রতিম সরকার। ফলে এই সময় তাঁকে সিআইডি থেকে সরিয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ টেলিকমিউনিকেশন বিভাগে পাঠানোকে ঘিরে নানা জল্পনা ! সরকারিভাবে এই বদলিকে রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সুপ্রতিম সরকারের জায়গায় রাজ্যের অপরাধ দমন শাখা তথা সিআইডি-র নতুন ডিজি ও আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসার নটরাজন রমেশ বাবু। তিনি এতদিন সংশোধনাগার দফতরের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি সংশোধনাগার দফতরের দায়িত্বও অতিরিক্তভাবে সামলাবেন তিনি। অর্থাৎ রাজ্যের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব একসঙ্গেই বহন করবেন এই অভিজ্ঞ পুলিশকর্তা।

রদবদলের প্রভাব রাজ্যের গোয়েন্দা শাখাতেও। পশ্চিমাঞ্চলের বর্তমান এডিজি ও আইজিপি বিশাল গর্গকে রাজ্য ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের এডিজি ও আইজিপি করা হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর জায়গায় পশ্চিমাঞ্চলের নতুন এডিজি ও আইজিপির দায়িত্ব আনন্দ কুমারের। এতদিন তিনি রাজ্য পুলিশের লিগ্যাল শাখার এডিজি ছিলেন। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গ রেঞ্জের এডিজি ও আইজিপি কে. জয়রামনকে বদলি করে রাজ্যের ডিরেক্টরেট অফ ইকোনমিক অফেন্সেস-এর ডিরেক্টর করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন সুকেশ কুমার জৈন, যিনি উত্তরবঙ্গ রেঞ্জের নতুন আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন।

স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ-এও এসেছে বড় পরিবর্তন। বর্তমান আইজিপি প্রবীণ কুমার ত্রিপাঠীকে হোম গার্ডের আইজি করা হল। তাঁর জায়গায় এসটিএফ-এর নতুন আইজি হিসেবে দায়িত্ব সুধীর কুমার নীলকান্তমের, এতদিন তিনি সিআইএফ-এর আইজিপি ছিলেন। প্রশাসনের মতে, রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এই পুনর্বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

কলকাতা লাগোয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিশনারেট বিধাননগরেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান পুলিশ কমিশনার ত্রিপুরারি অথর্বকে সরিয়ে রাজ্য পুলিশের ট্রাফিক অ্যান্ড রোড সেফটির এডিজি পদে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জায়গায় বিধাননগরের নতুন পুলিশ কমিশনার হচ্ছেন রাঠোর অমিতকুমার ভারত। তিনি এতদিন রায়গঞ্জ রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি হাব ও দ্রুত বিস্তৃত হওয়া এই কমিশনারেটের দায়িত্ব এবার তাঁর কাঁধে।

জেলা পুলিশ প্রশাসনেও বদলের ছোঁয়া স্পষ্ট। দার্জিলিং জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার প্রতীক্ষা ঝাড়খড়িয়াকে কলকাতা আনা হয়েছে। তাঁকে কলকাতা আর্মড পুলিশের প্রথম ব্যাটালিয়নের ডিসি করা হয়েছে। পাহাড়ের নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রাক্তন ডিসি ইয়েলওয়াদ শ্রীকান্ত জগন্নাথরাও। পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবার তাঁর হাতে।

কোচবিহারে বর্তমান এসপি জসপ্রীত সিংকে রাজ্য পুলিশের সিসিডব্লিউ-র এসপি পদে পাঠানো হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে কোচবিহারের নতুন পুলিশ সুপার হচ্ছেন কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মণীশ জোশী।

কলকাতা পুলিশের অন্দরেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল। সাইবার ক্রাইম বিভাগের নতুন ডেপুটি কমিশনার হচ্ছেন প্রদীপ কুমার যাদব। ইস্টার্ন ডিভিশনের নতুন ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব পাচ্ছেন অরিন্দম সরকার। এছাড়া স্টেট আর্মড পুলিশের প্রথম ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার রাজীব কুমারকে কলকাতা পুলিশের ডিসি, এসটিএফ হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।

ডব্লিউবিপিএস আধিকারিকদের মধ্যেও একাধিক বদলি হয়েছে। বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জোনাল) পিনাকী দত্তকে ওই জেলারই ডিআইবি-র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার করা হল। তাঁর জায়গায় আসছেন অতীশ বিশ্বাস, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার প্রাক্তন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এছাড়াও পূর্ব মেদিনীপুরের গ্রামীণ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মণ্ডল এবং সুন্দরবনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জোনাল) অগ্নিশ্বর চৌধুরীরও দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নবান্নর এই রদবদলকে রুটিন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ বলেই ব্যাখ্যা। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, শুধু নিয়মমাফিক বদলি নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা, তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে আরও কার্যকর করা এবং গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলিতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সুপ্রতিম সরকারের সিআইডি থেকে সরে যাওয়া, বিধাননগর কমিশনারেটের নেতৃত্বে পরিবর্তন, দার্জিলিং ও কোচবিহারের মতো স্পর্শকাতর জেলায় নতুন পুলিশ সুপার নিয়োগ—সব মিলিয়ে এই রদবদল আগামী দিনে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের কাজের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, তা বলাই যায়।

আপনাদের কি মনে হয়, এই পরিবর্তন আইন শৃঙ্খলায় প্রভাব ফেলবে!

 

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *