Press "Enter" to skip to content

এক দেশ, এক আইন ! সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ…।

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১১ জুলাই, ২০২৬। আগস্ট মাসেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) সংক্রান্ত বিল পেশ করার ভাবনা শুরু রাজ্য সরকারের। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনওরকম তাড়াহুড়ো নয়, বরং অত্যন্ত সতর্ক ও সুপরিকল্পিতভাবেই এগোতে চাইছে সরকার। সেই লক্ষ্যেই ইউসিসি কার্যকর করার প্রস্তুতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রসাদ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের ৯ সদস্যের কমিটি। রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়াল এই সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন। এই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার খসড়া বিল তৈরী করেছে। তবু আগস্ট মাসে বিধানসভার অধিবেশনে পেশের আগে রাজ্যর সব ধর্মের মানুষের মতামত সরকারের অগ্রাধিকার !

কমিটির চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাই। তাঁর সঙ্গে সদস্য হিসেবে থাকছেন মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, আইএএস অফিসার তথা রেসিডেন্ট কমিশনার দ্যুষ্মন্ত নারিয়ালা, অবসরপ্রাপ্ত আইএএস শত্রুঘ্ন সিং, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সংঘমিত্রা ঘোষ, বঙ্গবাসী কলেজের নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ডঃ রত্না ভট্টাচার্য, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহ-উপাচার্য গোপালচাঁদ মিশ্র, কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী ওসমান গনি মল্লিক এবং বেঙ্গল সম্ভাগের প্রাক্তন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নির্মাল্য ভট্টাচার্য। প্রশাসন, আইন, শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞান এবং জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়েই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে সমাজের নানা স্তরের মতামত এবং বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হয়।

বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের অভিজ্ঞতার উপর আগে আস্থা রেখেছিল উত্তরাখণ্ড সরকার। দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার আগে খুঁটিনাটি বিষয় পর্যালোচনা এবং সুপারিশ তৈরির দায়িত্বও তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটিকেই দেওয়া হয়। সেই অভিজ্ঞতাকেই এবার কাজে লাগাতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তবে বাংলার সামাজিক কাঠামো, জনবিন্যাস, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উত্তরাখণ্ডের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। তাই একই ছাঁচে আইন তৈরি না করে, বাংলার বাস্তব পরিস্থিতি এবং মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই উপযোগী বিল তৈরির পথে হাঁটতে চাইছে সরকার।

সূত্রের খবর, ইউসিসি বিল তৈরির ক্ষেত্রে রাজ্যের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ থাকার সম্ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গ বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের রাজ্য। তাই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করতে চায় সরকার। সেই কারণেই এই কমিটির দায়িত্ব শুধু আইনি মতামত দেওয়া নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মতামত সংগ্রহ করা। সবার মতামতের ভিত্তিতেই তৈরি হবে চূড়ান্ত খসড়া। পরে তা বিধানসভায় বিল আকারে পেশ করা হতে পারে।

কমিটির সদস্যদের ন’টি বিষয় নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের মতামত গ্রহণ করা। পাশাপাশি বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি বণ্টন, পারিবারিক অধিকার-সহ দেওয়ানি আইনের একাধিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হবে। কোন ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যক্তিগত আইন বহাল থাকবে, কোথায় পরিবর্তনের প্রয়োজন এবং কীভাবে একটি অভিন্ন আইন কার্যকর করা সম্ভব, সব দিক খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে ধর্মভেদে আলাদা ব্যক্তিগত ধর্মীয় দেওয়ানি আইনের পরিবর্তে দেশের সব নাগরিকের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার কিংবা সম্পত্তি বণ্টনের মতো বিষয়ে ধর্মভিত্তিক পৃথক আইন আর থাকবে না। শরিয়ত আইন বা হিন্দু বিবাহ আইন এর পরিবর্তে একক দেওয়ানি আইন। তবে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না বলেই জানা গিয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইউসিসি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন প্রস্তুতির দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছে গিয়েছে। আইন প্রণয়নের আগে মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে, সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই এগোতে চাইছে প্রশাসন। তাই আগামী আগস্টে বিধানসভায় বিল পেশের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, তার আগে এই কমিটির সুপারিশই নির্ধারণ করবে বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ভবিষ্যৎ পথচলার রূপরেখা।

বর্তমানে ভারতের চারটি রাজ্যে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল পাশ করা হয়েছে। গোয়া, উত্তরাখন্ড, গুজরাট এবং আসাম। এবার পশ্চিমবঙ্গও ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ বিল আনার পথে। ‘ইউনিফর্ম কোড বিল, ওয়েস্ট বেঙ্গল ২০২৬’। ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’, হলেও আমরা প্রথমে ভারতবাসী। তারপর ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার বিচার ! তাই ধর্মমত নির্বিশেষে ‘এক দেশ, এক আইন’ কি লাগু হওয়া উচিৎ কি উচিৎ নয় ?

 

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *