কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : ৩১ আগস্ট, ২০২৬। হিমালয়ের বুকে নেমে এসেছে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মহাবিপর্যয় !
নেপাল ও চীন সীমান্তে প্রকৃতির এমন রুদ্ররূপ এর আগে বিশ্ব দেখেনি ! মাইলের পর মাইল পাহাড়ি উপত্যকা, সাজানো গ্রাম আর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র চোখের পলকে স্রেফ কাদা আর পাথরের নিচে সমাধিস্থ ! ধ্বংসস্তূপের নীচে ঠিক কত হাজার প্রাণ চাপা পড়েছে, তার হিসাব করার মতো পরিস্থিতিও আর অবশিষ্ট নেই !
নেপালে গণ কবর :
উপচে পড়ছে মর্গ ! থমকে গেছে চিতওয়ানের আকাশ!
কোথায় এই চিতওয়ান?
চিতওয়ান (Chitwan) হলো দক্ষিণ-মধ্য নেপালের তরাই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত বিখ্যাত উপত্যকা।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার বা বিহার সীমান্ত থেকে সড়কপথে এই উপত্যকা অনেকটাই কাছে।
মূলত জায়গাটি ঘন জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীর জন্য পরিচিত।
পাহাড়ি বিপর্যয়ের মূল কেন্দ্রস্থল ল্যাংটাং থেকে মৃতদেহগুলো এখন এই সমতল জেলাতেই নামিয়ে আনা হচ্ছে।
লাশের পাহাড়, ফুরিয়েছে জায়গা:
তীব্র গরমে এবং কাদাজলে উদ্ধার হওয়া শত শত নিথর দেহে পচন ধরতে শুরু করায় এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে !
পাহাড়ি মর্গগুলোতে লাশ রাখার তিলমাত্র জায়গা নেই।
চিতওয়ানের আকাশে চিতার ধোঁয়া:
সংক্রামক রোগ ছড়ানো রুখতে এবং পরিচয় শনাক্তকরণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই, নেপাল সেনা চিতওয়ানের বিস্তীর্ণ খোলা মাঠের ওপর বুলডোজার দিয়ে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে গণকবরের (Mass Burial) কাজ শুরু করেছে।
একই সঙ্গে নদীর তীরে সারিবদ্ধ চিতায় জ্বলছে চিতার আগুন ! কালো ধোঁয়ায় ঢাকা এখন গেছে চিতওয়ানের আকাশ !
প্রকৃতির নির্মম তাণ্ডব:
গত ২৬শে আগস্ট নেপালের ল্যাংটাং ন্যাশনাল পার্কে একটি বিশাল হিমবাহ ভেঙে পড়ার ফলে ভোটকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে ভয়ংকর হড়পা বান আছড়ে পড়ে।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ২০ কিমি গতিতে ধেয়ে আসা কাদা ও পাথরের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে একের পর এক পাহাড়ি গ্রাম ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র.
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান (The Disaster Data)
মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা:
নেপালের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের (NDRRMA) আজ সকালের রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৮ জন ছুঁয়েছে. এখনও ২,৫০২ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
হাইড্রো প্রজেক্টে হাহাকার:
নিখোঁজদের মধ্যে কয়েকশো মানুষ ত্রিশূলী-৩এ (Trishuli-3A) এবং চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী।
অন-গ্রাউন্ড অপারেশনে ভারতের বিশেষ টিম:
এই সংকটের মুখে নেপাল সেনাবাহিনীর আহ্বানে ভারতের পক্ষ থেকে একটি উচ্চ-প্রশিক্ষিত এবং বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দল (Specialised Tunnel Rescue Team) সরাসরি গ্রাউন্ড জিরোতে নেমেছে।
চিলিম ও লাংতাং অঞ্চলের পাহাড়ি সুড়ঙ্গগুলোর মুখ কেটে ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের বের করতে এই ভারতীয় দল বর্তমানে নেপাল সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথ অপারেশন চালাচ্ছে।
ভারতীয় নাগরিকদের সফল উদ্ধার:
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ওই এলাকাগুলো থেকে ইতিমধ্যেই ৪ জন ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিককে (রিপু কুমার, চনেশ্বর নার্জারি, কৃপা শঙ্কর এবং মহম্মদ মিনহাজুদ্দিন) অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া ওই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজেক্ট সাইটে আটকে পড়া মোট ১৪৯ জন ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে।
তার মধ্যে ত্রিশূলী প্রজেক্টের ৬৩ জন কর্মী আছেন ।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজ এখনো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
তবে আটকে থাকা বাকি মানুষদের খোঁজে তল্লাশি জারি আছে।
এখনও কতজন আটকে বা নিখোঁজ :
সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী, ওই পার্বত্য অঞ্চলে ২৮৭ জন ভারতীয় নাগরিক এখনো নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন (uncontactable) অবস্থায় আছেন।
এছাড়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত (Persons of Indian Origin) আরও ১২৮ জন মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার মধ্যে আছেন কৈলাশ থেকে ফেরা তামিলনাড়ুর ৪৯ জন।
টানেলের বর্তমান পরিস্থিতি ও উদ্ধারকাজ:
নেপাল-চীন সীমান্ত সংলগ্ন এই দুর্যোগপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে বা সুড়ঙ্গে অসংখ্য শ্রমিক আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের পর বিভিন্ন টানেল ও হাইড্রো-পাওয়ার সাইট থেকে প্রায় ২৭৯ জন শ্রমিককে সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তবে এখনও ৯৩৩ জন হাইড্রো-পাওয়ার কর্মী নিখোঁজ আছেন।।
তাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকে আছেন বলে ধারণা করছে নেপাল মন্ত্রণালয়।
এই সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবন বাঁচাতে মূল উদ্ধারকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ভারতের বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল (Specialised Technical Contingent)।
উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত সমস্ত আধুনিক অ্যাপারেটাস এবং অত্যাধুনিক সুড়ঙ্গ-উদ্ধার সরঞ্জাম মূলত ভারতের পক্ষ থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে।
ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের এই দল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সহায়তায় নেপালি সেনা ও প্রকৌশলীরা চিলিমে, লাংটাং এবং ত্রিশূলী বেসিনের অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সুড়ঙ্গ কেটে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন।
বর্তমানে ত্রিশূলী-৩এ (Trishuli 3A) জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি টানেলে কাদা ও পাথরের নীচে অন্তত ১০০ জন শ্রমিক আটকে আছেন বলে আশঙ্কা।
সম্প্রতি ভারতীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের সাহায্যে উদ্ধারকারীরা ওই অবরুদ্ধ টানেলের ভেতর ড্রিল করে ছোট পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছেন !
ইতিমধ্যেই তার মাধ্যমে ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের জন্য জরুরি বাতাস (Oxygen) সরবরাহ করা শুরু হয়েছে।
ভেঙে পড়েছে লাইফলাইন।
নতুন সতর্কতা
ধসে গেছে হাইওয়ে: হড়পা বানের তোড়ে নেপাল ও চীনের সংযোগকারী প্রধান হাইওয়ে এবং ‘Prithvi Highway’ সংলগ্ন চারাউডির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুলন্ত সেতু সম্পূর্ণ ধুয়ে মুছে গেছে. ফলে অনেক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা এখন হেলিকপ্টার।
নতুন বন্যা অ্যালার্ট: নদী অববাহিকার জলস্তর নতুন করে আবার বাড়তে শুরু করায় উপত্যকার সমস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এক লহমায় লণ্ডভণ্ড সাজানো হিমালয়—প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ কি মানুষের অনিয়মিত পাহাড়ি পরিকাঠামো নির্মাণেরই চরম মাশুল ?










Be First to Comment