Press "Enter" to skip to content

মাছে ভাতে বাঙালি…।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় :কলকাতা, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। মাছ শুধু মাছ নয়— জলের ভিতর জন্ম নেওয়া একটি রূপালি শব্দ, একটি নদীর স্মৃতি, ধানের শিষে লেগে থাকা বাংলার নরম গন্ধ, মায়ের হাঁড়িতে ফুটতে থাকা সরষের হলুদ দুপুর।

এই বাংলায় নদী মানে শুধু নদী নয়, নদী মানে জীবিকা, নদী মানে নৌকা, নদী মানে জাল, নদী মানে ভোরের বাজার, আর নদী মানেই— কোথাও না কোথাও একজন জেলে জীবনের সঙ্গে জাল ফেলছে।

তাই ঈশ্বর গুপ্তের পুরোনো পঙ্‌ক্তি আজও নদীর হাওয়ায় ভেসে আসে—

“ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল, ধান ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।”

দুটি পঙ্‌ক্তি, অথচ তার ভিতর একটি ভূগোল, একটি অর্থনীতি, একটি খাদ্যসংস্কৃতি, একটি জাতির দীর্ঘ আত্মপরিচয়।

ধানের সঙ্গে মাছ, মাটির সঙ্গে জল, কৃষকের সঙ্গে জেলে— বাংলার জীবন যেন দুই স্রোতের মিলন।

একদিকে সোনালি ধানের ক্ষেত, অন্যদিকে পুকুরের নীল জল; একদিকে লাঙলের দাগ, অন্যদিকে জালের ফাঁস— এই দুইয়ের মাঝখানেই বাঙালির ভাতের থালা।

পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলকেও মাছ কাটার, মাছ ঝুড়িতে তোলার সেই পুরোনো দৃশ্যের স্মৃতি— অর্থাৎ মাছের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো নতুন শহুরে রুচি নয়; তার শিকড় অনেক গভীরে, অনেক শতাব্দীর মাটির নিচে।

তারপর কত যুগ গেছে— চণ্ডীমঙ্গলের জনপদ, মনসামঙ্গলের নদী, বণিকের নৌকা, জেলের জাল, গ্রামের হাট, পুকুরঘাটের বিকেল— বাংলার লোকজীবন বারবার জলের কাছে ফিরে এসেছে।

মাছ কখনো আহার, কখনো পণ্য, কখনো পূজার আচার, কখনো অতিথির সম্মান, কখনো কন্যাদায়ের শুভ প্রতীক, কখনো নতুন সংসারের মঙ্গলকামনা।

বিয়ের বাড়িতে বড় কাতলা ওঠে, জামাইয়ের পাতে সাজে রুই; অন্নপ্রাশনে শিশুর সামনে জীবনের প্রথম ভাত, আর তাতে মাছের উপস্থিতি ঘরের প্রবীণদের আশীর্বাদের মতো।

মাছ দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন— এ শুধু রান্না নয়, বাঙালির প্রাচীন এক সামাজিক ভাষা।

“আর একটু নিন”— এই চারটি শব্দের ভিতর কত শত বছরের আতিথেয়তা!

তারপর আসে বর্ষা।

আকাশ কালো হলে, পুকুর উপচে গেলে, খালের জল বাড়লে মনে হয়— বাংলার শরীরের কোথাও আবার মাছেরা জেগে উঠেছে।

আর পদ্মার বুকে ইলিশের মরশুম এলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি মনে পড়ে।

রাতের পদ্মায় শত শত জেলে-নৌকার আলো— অন্ধকার জলের উপর জোনাকির মতো; কুবের আর গণেশ সারারাত জাল ফেলে, কারণ সেই মাছই তাদের সংসারের বেঁচে থাকার আশা।

ইলিশ সেখানে শুধু স্বাদের নাম নয়— ইলিশ মানে জেলের ঘামে ভেজা রাত, ঋণের বোঝা, বাজারের দর, নৌকার ঝুঁকি, সংসারের হাঁড়ি, শিশুর মুখ।

ইলিশের মরশুম শেষ হলে পদ্মাও যেন কৃপণ হয়ে যায়— মাছ কমে, আয় কমে, সংসারের ভাতের নিশ্চয়তাও কমে যায়।

এইখানেই মাছের গল্প রান্নাঘর ছাড়িয়ে অর্থনীতির গল্প হয়ে ওঠে।

মাছের বাজারে দাম ওঠে, দাম নামে; জেলের জালে আজ বেশি, কাল কম।

একটি ইলিশের দামে শহুরে মানুষের উৎসব হতে পারে, কিন্তু সেই ইলিশের পেছনে কোনো কুবেরের সারারাত জেগে থাকা শরীরটিও থাকে।

তাই মাছের চোখের দিকে একবার তাকাও— সেখানে শুধু রূপালি আঁশ নয়, একজন মানুষের শ্রমের প্রতিফলন আছে।

আর বাঙালির রান্নাঘর?

সে তো নিজেই এক মহাকাব্য।

সরষে-ইলিশ, ভাপা ইলিশ, পাতুরি— কলাপাতার ভিতর বাষ্পে পাকতে থাকে নদীর স্মৃতি।

রুইয়ের কালিয়া, কাতলার দোপেঁয়াজা, শোলের ঝোল, মাগুরের পাতলা রান্না, কৈয়ের ঝাল, পুঁটির চচ্চড়ি, টেংরার টক, কাঁচকির ভাজা—

আর চিংড়ি এলে নারকেলের দুধে উৎসব নামে।

বাঙালি মাছকে শুধু রান্না করেনি— তাকে দিয়েছে শত শত রূপ।

ভেজেছে, পুড়িয়েছে, সেঁকেছে, ভাপিয়েছে, ঝাল করেছে, ঝোল করেছে, অম্বল করেছে— মাছের শরীরে বাঙালি লিখেছে নিজের রসনার ইতিহাস।

মাছের মাথার মুড়িঘণ্ট, কাঁটায় চচ্চড়ি, ডিমে ভাজা— কিছুই ফেলা নয়।

অভাবের সংসার আমাদের শিখিয়েছে অপচয় না করার এক গভীর দর্শন।

যে জাতি মাছের কাঁটাতেও স্বাদ খুঁজে পায়, সে জাতি অল্পের ভিতরেও জীবন খুঁজে নিতে জানে।

কিন্তু আজ সেই বাংলার জল ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

যে পুকুরে পুঁটি-কৈ-মাগুর খেলত, সেখানে উঠছে বহুতলের ছায়া।

যে খালে বর্ষায় কিশোরেরা ছিপ ফেলত, সেখানে ভাসছে প্লাস্টিক।

যে বিলে শাপলা আর মাছ একসঙ্গে থাকত, সেখানে মাটি ফেলে তৈরি হচ্ছে রাস্তা।

নদীর জলে দূষণ বাড়ে, জলাশয় ভরে যায়, দেশি মাছের নাম শিশুর অভিধান থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায়।

মাছ হারানো মানে শুধু একটি খাদ্য হারানো নয়—

একটি পেশা হারানো, একটি লোকগান হারানো, একটি পুকুর হারানো, একটি রান্নার স্বাদ হারানো, একটি শৈশব হারানো, একটি নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হারানো।

তাই আজ মাছের কথা বলা মানে জলের কথাও বলা।

পুকুর বাঁচাও, খাল বাঁচাও, নদী বাঁচাও— কারণ মাছ বাঁচানো মানে বাংলার একটি জীবন্ত স্মৃতি বাঁচানো।

তবু কী আশ্চর্য— দেশ ছেড়ে বহু দূরে, লন্ডনের কুয়াশায়, নিউইয়র্কের তুষারে, দুবাইয়ের কাচের শহরে, প্রবাসী বাঙালি একদিন হঠাৎ ইলিশের গন্ধ পেলে চোখ বন্ধ করে।

সেই মুহূর্তে তার সামনে কোনো বিদেশি শহর থাকে না— থাকে মায়ের রান্নাঘর, বাবার বাজারের ব্যাগ, বর্ষার দুপুর, পুকুরঘাট, শৈশবের ছিপ, আর দূরে কোনো অদৃশ্য নদী।

এক টুকরো মাছ তখন আর মাছ থাকে না— হয়ে ওঠে এক টুকরো দেশ।

রাধাপ্রসাদ গুপ্তের মাছ আর বাঙালি যে দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে আমাদের তাকাতে শেখায়, সেখানে মাছ কেবল খাবারের তালিকায় নেই— আছে বাঙালির জীবনযাত্রা ও খাদ্যসংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনের ভিতর।

তাই আজ মাছের দিকে তাকিয়ে আমি শুধু বলি না— “কত দাম?”

আমি জিজ্ঞেস করি— কোন নদী থেকে এলে তুমি? কোন জেলে রাত জেগে ধরেছিল তোমায়? কোন জলাশয় তোমাকে জন্ম দিয়েছিল? কোন মায়ের হাত তোমাকে রান্না করবে? কোন শিশুর মুখে তুমি আজ দেশের স্বাদ হয়ে যাবে?

কারণ— মাছের আঁশে শুধু রূপালি আলো নেই; আছে নদীর ইতিহাস, জেলের ঘাম, কৃষকের ধান, মায়ের হাতের গন্ধ, অতিথির সম্মান, উৎসবের আনন্দ, অভাবের বুদ্ধি, বাজারের অর্থনীতি, আর বাঙালির অবিনশ্বর স্মৃতি।

মাছ তাই খাদ্য নয় শুধু।

মাছ একটি নদীর আত্মজীবনী, একটি সমাজের ইতিহাস, একটি রান্নাঘরের কবিতা, একটি জেলের সংসার, একটি শিশুর শৈশব, একটি প্রবাসীর নস্টালজিয়া, একটি ভূখণ্ডের জলজ আত্মপরিচয়।

তাই যতদিন বাংলার মাটিতে ধানের গন্ধ থাকবে, যতদিন বর্ষায় পুকুর উপচে উঠবে, যতদিন কোনো জেলে ভোরের আগে নৌকা ঠেলে নদীতে নামবে, যতদিন কোনো মা ভাতের পাশে মাছের ঝোল তুলে দেবেন—

ততদিন “মাছে-ভাতে বাঙালি” শুধু একটি প্রবাদ থাকবে না;

তা থাকবে একটি জাতির জল-মাটি-মানুষের জীবন্ত কবিতা হয়ে।

তাই এই কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তিতে আমি লিখে রাখি—

মাছকে বাঁচাও, জলকে বাঁচাও; কারণ মাছের ভিতরেই আজও একটু একটু করে বেঁচে আছে বাঙালি।

 

 

More from BooksMore posts in Books »
More from WorldMore posts in World »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *