ভাস্কর ভট্টাচার্য্য : কলকাতা, ২ জুলাই, ২০২৬। গত ২৯ জুন মহাজাতি সদনে পালাবদলের সংস্কৃতির এক আবহে পাঠক-হৃদয়জয়ী জনপ্রিয় লেখক বুদ্ধদেব গুহর জন্মদিন পালিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে পালাবদলের হাওয়াও যে বইপাড়ায় ঝাপটা দিচ্ছে, তার আঁচ পাওয়া গেল।
উল্লেখ্য, আগামী বছরের বইমেলা ৫০ বছরে পড়বে। স্বাভাবিক, বাঙালির এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বইমেলাকে ঘিরে প্রবল উৎসাহ জারিত।
এত দিন সেই বইমেলারই দায়িত্ব বহন করে এসেছে গিল্ড। সেই গিল্ডের হাত থেকেই নাকি সদ্যোজাত তৈরি হওয়া এক সংস্থা যাঁরা নাকি বইমেলা পরিচালন করবেন। এই বার্তা ইতিমধ্যে রটে গেছে।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে তা হলে গিল্ডের হাত থেকে বইমেলার ভার কেড়ে নেওয়া হবে ? বকলমে বলতে হয়, হল। কারণ এদিন মহাজাতি সদনে তারই আভাস ইঙ্গিত কিছুটা পাওয়া গেল।
এই সভায় মুনি ঋষি সন্ন্যাসীদের সঙ্গে বিদ্যার সম্পর্ক বা প্রাচীন বিদ্যাভাসের কথা শোনালেন গেরুয়াবসনধারী এক প্রাজ্ঞ। নামটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। চমৎকার বললেন আমাদের প্রাচীন পড়াশোনার বিষয়ে।
এ দিনের মহাজাতি সদনের অঙ্গন ছিল বুদ্ধদেব গুহময়। এ দিন তাঁর জন্মদিন। সেই উপলক্ষেই এই সমাগম। সেই সঙ্গে বইমেলার নতুন কমিটির তূণে ছিলা পরাবার দিন। আগে জানতাম না, জানলাম, বুদ্ধদেববাবু বিজেপির ওতপ্রোত অনুগামী ছিলেন। তা-ই বিজেপির রাজ্য সভাপতির উপস্থিতিতে এবং মেয়ে মালিনী বসুর স্মৃতিচারণে বুদ্ধদেববাবু বার বার লেখা ও সাহিত্যের গুণে ভাসমান হয়ে উঠছিলেন। বার বার বুদ্ধদেব বাবু লিখছি এই কারণে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সময় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
চমৎকার বললেন শমীক ভট্টাচার্য মশাই। কেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং বুদ্ধদেব গুহরা অমর থাকেন। তিনি বললেন, লেখকদের মৃত্যু হয় না। বুদ্ধদেব গুহ যেমন বন জঙ্গল, নদী, উদ্ভিদ পাতার মধ্যে দিয়ে পাঠকের মনে জীবিত থাকবেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও বেঁচে থাকবেন তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। এ হেন বক্তব্যে বেশি থমথমে হয়ে উঠেছিল মহাজাতি সদন। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, লেখিকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে কোনো শব্দ খরচ করেননি শমীকবাবু। যদিও মঞ্চে সকলেই গত পনেরো বছরের বাংলা সংস্কৃতির রুদ্ধ দুয়ার এবং স্বজনপোষণের কথায় বার বার অবক্ষয়ের কথাই তুলে ধরেছেন।
শমীক বাবু চলে যেতেই ভরতি মহাজাতি সদনের হল ফাঁকা হয়ে গেল এবং গুটিকয় মানুষ তখনও শুনছিলেন। সদ্য ভেসে ওঠা বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বুদ্ধদেব গুহকে নিয়ে লিখে আনা রচনা পাঠ। কেউ কি আদৌ শুনেছেন? এই হতভাগ্য ছাড়া। শোনার কথাও নয়। ঝড়ের বেগে ‘গুগল সাহিত্য পাঠ’ আর কারই -বা ভাল লাগে ?
যে কথা না বললেই নয়, নব্য সভা পরিচালক বার বারই গুহ আর ভট্টাচার্য পদবি গুলিয়ে ফেলছিলেন। উপস্থিত পরিচিত বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার আগামী বইমেলা যে তাঁদেরই করায়ত্ত হবে তারই আভাস দিলেন।
সব থেকে অবাক লাগল কলকাতার স্বনামধন্য যে প্রকাশক বুদ্ধদেব গুহর বই সবথেকে বেশি প্রকাশ করেছেন তিনি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেউ তাঁকে একবারও আমন্ত্রণ জানালেন না। সেই দে’জ পাবলিশিং এর কর্ণধার সুধাংশু দে-ই সখেদে বললেন, আমরাই গত বছর বুদ্ধদেব গুহকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মানে ভূষিত করেছি। সে যাই হোক।
খবর পাওয়া গেল গিল্ড বর্তমান সরকারকে সম্মিলিত ভাবে বইমেলা করার ব্যাপারে চিঠি দিলেও সরকারি তরফে এখনও কোনো উত্তর আসেনি।
এ সব থেকেই অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, বাঙালির বইমেলা এক বড় প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, গিল্ড কিন্তু অনেক ভাল কাজের পাশাপাশি, অনেক সমালোচনার রাস্তা নিজেরাই তৈরি করেছেন। বহু প্রকাশকের ক্ষোভ গিল্ডের কোনো কোনো কর্তার আচার-আচরণের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে। সে সব পেরিয়ে একটা সুষ্ঠু পথে বইমেলার জট খুলুক একজন বাংলাভাষী পাঠক হিসাবে এটাই কাম্য। এক হাজারেরও বেশি প্রকাশক, এত বড় মেলা পরিচালনাতে গিল্ডের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালে মনে হয় ভালই হবে। কারণ গিল্ড কোনো রাজনৈতিক সংস্থা নয়, যখন যে সরকার এসেছে সেই সরকারেরই গা-ঘেঁষাঘেঁষি করেই থেকেছে। উপায় নেই। পুলিশ, দমকল, পুরসভা, পরিবহণ প্রভৃতির সহযোগিতা ছাড়া এত বড় মেলা উদ্ধার করা অসম্ভবই।











Be First to Comment