কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৩০ জুন, ২০২৬। জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথি। এই একটি দিনে অদৃশ্য এক সেতুবন্ধন, ভারতের দুই মহাতীর্থের মধ্যে ! পুরীর শ্রীক্ষেত্র এবং কলকাতার কালীক্ষেত্র ! ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক, উপাসনার রীতিও সম্পূর্ণ আলাদা ! একদিকে পুরীর জগন্নাথদেব বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রধান আরাধ্য, অন্যদিকে কালীঘাট শক্তি উপাসনার এক মহাপীঠ। কিন্তু ধর্মের মূল সুর তো মিলনেরই কথা বলে। তাই এই বিশেষ তিথিতে শাক্ত ও বৈষ্ণব—দুই ধারাই যেন একাকার, ভক্তির স্রোতে ! পুরীতে জাঁকজমকপূর্ণ স্নানযাত্রা, কালীঘাটেও এই দিন পালিত হয় দেবীর আবির্ভাব তিথি ও স্নানযাত্রা ! তবে কালীঘাটের এই উৎসব অনেকটাই গোপন, আচারনিষ্ঠ এবং সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে !
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার দিনই পুরীর জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রার দারুবিগ্রহে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেই কারণেই প্রতি বছর এই তিথিতে রত্নবেদী থেকে মহাপ্রভুকে স্নানমণ্ডপে নিয়ে গিয়ে ১০৮টি পবিত্র কলসের জল দিয়ে মহাস্নান করানো হয়। এই মহাস্নান দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ ভক্ত দেশ-বিদেশ থেকে পুরীতে ভিড় জমান। স্নানযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, হিন্দু ধর্মীয় অনুভূতিতে অন্যতম প্রধান উৎসবও।
অন্যদিকে, একই দিনে কলকাতার কালীঘাটেও পালিত হয় দেবী দক্ষিণাকালীর আবির্ভাব তিথি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বহু শতাব্দী আগে দুই সাধক—ব্রহ্মানন্দ গিরি এবং আত্মারাম ব্রহ্মচারী, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার দিন একটি পবিত্র হ্রদ থেকে সতী দেবীর প্রস্তরীভূত পদাঙ্গুলি উদ্ধার করেন। এরপর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সেই সতী-অংশে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকেই এই দিনটি কালীঘাট মন্দিরে দেবীর আবির্ভাব দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তাই পুরীর স্নানযাত্রার মতো কালীঘাটেও এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে দুই তীর্থের স্নানযাত্রার রীতিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। পুরীর মহাস্নান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হলেও কালীঘাটের স্নানযাত্রা সম্পূর্ণ গোপনীয় এবং কঠোর নিয়মে পরিচালিত। বর্তমানে সতী দেবীর পদাঙ্গুলি, দেবী দক্ষিণাকালীর মূর্তির নিচে একটি রুপোর সিন্দুকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত থাকে। স্নানযাত্রার দিন ভোরে নির্দিষ্ট সেবায়েতরা শুদ্ধবস্ত্র পরে, চোখে কালো কাপড় বেঁধে গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন। তাঁদের চোখ সম্পূর্ণ ঢাকা থাকে, যাতে তাঁরা দেবীর পবিত্র অঙ্গ দর্শন করতে না পারেন। শুধুমাত্র স্পর্শের অনুভূতির মাধ্যমে তাঁরা স্নানের সমস্ত আচার সম্পন্ন করেন। গঙ্গাজল, গোলাপ জল, সুগন্ধি আতর, অগুরু এবং জবাকুসুম তেলের মিশ্রণে সতী-অংশকে স্নান করানো হয়। এরপর দেবীকে সোনার সুতোয় বোনা নতুন বেনারসি শাড়ি পরানো হয় এবং পুনরায় সেই পবিত্র অঙ্গটি রুপোর সিন্দুকে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়। এই সমস্ত আচার সম্পন্ন হওয়ার পরই মন্দিরের দরজা সাধারণ ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। শাক্ত ও বৈষ্ণব উভয় দর্শনেই বলা হয়, কলিযুগে কৃষ্ণ ও কালী অভিন্ন তত্ত্বের প্রকাশ। অর্থাৎ রূপ আলাদা হলেও পরম সত্তা এক। সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনও দেখা যায় কালীঘাটের স্নানযাত্রায়। জনশ্রুতি অনুসারে, সেবায়েত ভবানীদাস চক্রবর্তী একসময় স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার দিন দেবীকে বৈষ্ণবী রূপে সাজাতে হবে। সেই প্রথা আজও অক্ষুণ্ণ ! প্রতি বছর উষালগ্নে দেবীর নাসিকাগ্রে এবং কপালে শ্বেতচন্দনের বৈষ্ণব তিলক আঁকা হয়। শক্তির আরাধ্যা মা কালী তখন বৈষ্ণব ভাবের স্নিগ্ধতায় নতুন এক রূপে ! এই বিরল দর্শনের সাক্ষী হতে বহু ভক্ত কালীঘাটে উপস্থিত হন। তাঁদের বিশ্বাস, এই দিনে দেবীর বৈষ্ণবী রূপ দর্শন করলে বিশেষ পুণ্য লাভ হয়।
একদিকে পুরীর জগন্নাথ, অন্যদিকে কালীঘাটের দক্ষিণাকালী—দুই তীর্থ, দুই উপাসনা, দুই ভিন্ন ধর্মীয় ধারা। কিন্তু জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার এই পবিত্র তিথিতে সব ভেদাভেদ যেন মিলিয়ে যায় এক অভিন্ন চেতনায়। শ্রীক্ষেত্র ও কালীক্ষেত্র তখন একই বিশ্বাস, একই ভক্তি এবং একই ঈশ্বরতত্ত্বের দুই উজ্জ্বল প্রতীক ! এই অনন্য মিলন শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্যের নয়, ভারতীয় সংস্কৃতির সেই চিরন্তন বার্তাও বহন করে, নানা মত, নানা পথ !















Be First to Comment