Press "Enter" to skip to content

পশ্চিমবঙ্গেও কি এখন থেকে এনকাউন্টার !….

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৮ জুলাই, ২০২৬। বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘিরে গোটা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, ঠিক তখনই ঘটল ! সেই মামলায় পুলিশের পদক্ষেপে নতুন করে বিতর্ক ! গ্রেপ্তারের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের গুলিতে মৃত্যু, মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। পুলিশের দাবি, পরিকল্পিত অভিযান ছিল না, বরং আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালাতে বাধ্য হন অফিসাররা। অন্যদিকে, বিরোধীরা এই ঘটনাকে উত্তরপ্রদেশের তথাকথিত “এনকাউন্টার মডেল”-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। ফলে একটি নৃশংস অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পুলিশের ভূমিকা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আইন প্রয়োগের প্রশ্ন !

পশ্চিমবঙ্গে অতীতেও একাধিক ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে। নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা শাস্তি এড়িয়ে গিয়েছে কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। সেই আবহেই নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ধর্ষকদের আদালতে পাঠানো হবে না, “সকালে জমা নেব, বিকেলে খরচ করব।” বারুইপুরের এই ঘটনার পর সেই মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

বারুইপুরের এই ঘটনার সূত্রপাত একটি নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনকে ঘিরে। তদন্তে নেমে প্রথমেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে প্রভাস মণ্ডলকে। পুলিশি জেরার ভিত্তিতেই উদ্ধার হয় নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ। তদন্ত এগোতে থাকলেও এলাকার ক্ষোভ দ্রুত বিস্ফোরণের আকার নেয়। রাস্তায় নামে মানুষ। অবরোধ হয় রাস্তা, উপড়ে ফেলা হয় রেললাইন, ট্রেন চলাচল ব্যাহত ! সরকারি সম্পত্তি ভাঙ্গচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিতে হয়।

ঘটনার পরদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বারুইপুরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। কড়া বার্তা দেন প্রশাসনকেও ! তিনি জানান, অশান্তি সৃষ্টিকারী, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা কিংবা পুলিশের উপর হামলা চালানো কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না ! তাঁর অভিযোগ, এলাকায় মৌলবাদী ও দেশবিরোধী শক্তি সক্রিয় ছিল এবং ভোটে পরাজিত কিছু রাজনৈতিক শক্তির উসকানিতেই এই অশান্তি ছড়ায়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, চিহ্নিত করা প্রায় ২০০জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সন্দেহভাজন ভেবে গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে নির্দোষ বলে প্রমাণিত। সেই হত্যারও বিচার হবে এবং প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর ওই বার্তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ অভিযানে নামে। সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, পুলিশের উপর হামলা এবং অশান্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার সকালে তাঁদের তোলা হয় বারুইপুর আদালতে। ধৃতদের দাবি, তাঁরা কোনও ভাঙ্গচুর বা হামলার সঙ্গে যুক্ত নন। আদালত চত্বরে ধৃতদের পরিবারের সদস্যরাও হাজির। নতুন করে উত্তেজনা ছড়াতে পারে, তাই আদালত চত্বরে বিপুল সংখ্যক পুলিশও মোতায়েন করা হয়।

এরই মধ্যে তদন্তে নাটকীয় মোড় ! পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম ! মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে যাওয়া হয় বারুইপুরের সূর্যপুরে, ঘটনার ঘটনাস্থল বলে তদন্তকারীদের দাবি। তদন্তের নিয়ম অনুযায়ী অভিযুক্তর দেওয়া তথ্য ঘটনাস্থলে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন।

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত প্রায় পৌনে একটা নাগাদ পুনর্নির্মাণের কাজ চলাকালীন আচমকা প্রভাস সিটের সদস্য রনি সরকারের কোমরে থাকা সার্ভিস পিস্তল ছিনিয়ে নেয়। পরিস্থিতি বোঝার আগেই সে একটি গুলি চালায় বলে দাবি পুলিশের। মুহূর্তের মধ্যে গোটা এলাকায় উত্তেজনা। তদন্তকারী অফিসারদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে। সেই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালান বারুইপুর থানার গুন্ডাদমন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল। গুলি লাগে প্রভাসের শরীরে। গুরুতর জখম অবস্থায় তাকে দ্রুত বারুইপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দুই পুলিশ অফিসারের—অর্ঘ্য মণ্ডল এবং রনি সরকারের। অর্ঘ্য মণ্ডল ২০১৪ ব্যাচের অফিসার। বর্তমানে তিনি বারুইপুর থানার গুন্ডাদমন শাখার দায়িত্বে রয়েছেন। সোনারপুর, কুলতলি ও জয়নগর থানা ঘুরে এখানে। বারুইপুর এসওজি-র ইনচার্জ হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।

অন্যদিকে রনি সরকার বর্তমানে ক্যানিং থানার গুন্ডাদমন শাখার দায়িত্বে। নরেন্দ্রপুর, বারুইপুর, জয়নগর, বকুলতলা-সহ একাধিক থানায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর। তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করার সময় এই দুই অফিসারের ওপরই বিশেষ ভরসা করা হয়।

প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর খবর বুধবার সকালে তার পরিবারকে জানায় পুলিশ। প্রথম প্রতিক্রিয়াতেই প্রভাসের মা সন্ধ্যা মণ্ডল বলেন, “যা হয়েছে, ঠিক হয়েছে। আমরা দেহ নিতে যাব না।” পরে অবশ্য থানার তরফে যোগাযোগ করার পর পরিবারের সদস্যরা যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রভাসের স্ত্রীর ! তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ও বরাবরই নোংরা ! তাই এই কাজ ও করেনি, এমন দাবি আমি করতে পারব না। বিয়ের পর আমার ওপরও অনেক অত্যাচার করেছে। সব সহ্য করে সংসার করেছি। দোষ করেছে, তাই গুলি খেয়েছে।” তবে তিনি জানান, পরিবারের সকলে রাজি হলে তিনি মৃতদেহ গ্রহণ করতে যাবেন। পরে জানা যায়, মা ও স্ত্রী থানার পথে।

প্রতিবেশীদের মধ্যেও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে সন্তোষের সুর। তাঁদের অনেকেই বলেন, এত ভয়ংকর অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অভিযুক্তের অপরাধ গুরুতর হলেও বিচার আদালতেই হওয়া উচিৎ। ফলে এই এনকাউন্টারকে ঘিরে আইন, ন্যায়বিচার এবং পুলিশের ক্ষমতার সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক !

বারুইপুরের এই ঘটনা এখন শুধুমাত্র একটি অপরাধের তদন্ত নয়। এটি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনের কঠোরতা, রাজনৈতিক অবস্থান, জনরোষ এবং বিচারব্যবস্থা—সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে নৃশংস অপরাধে ক্ষুব্ধ মানুষের একাংশ পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন, অন্যদিকে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন বিচারিক প্রক্রিয়ার আগে অভিযুক্তের মৃত্যু নিয়ে। ফলে বারুইপুরের এই অধ্যায় আগামী দিনেও রাজ্যের রাজনীতি, প্রশাসন এবং আইনি মহলে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

আসলে বাংলা এবং বাঙ্গালী ইদানিংয়ের মধ্যে এনকাউন্টার দেখেনি। তবে নকশাল আমলে নাকি এনকাউন্টার করা হত অনেক সময়, শোনা কথা। ইদানিং তো অনেক সময়, আগেও তাই, ধরাই পড়তনা আসল অভিযুক্ত ! অনেক সময় আবার রাঘববোয়ালদের বাঁচানোর জন্য চুনোপুঁটি গ্রেফতার ! তারপর আইনের কচকচিতে বছরের পর বছর কোর্টে চক্কর কাটা ! অনেক সময় কেস হাল্কা করে দেখানো ! ফলে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে !

 

 

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *