Press "Enter" to skip to content

১৯৮২ থেকে ২০১১ সাল। দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে সাড়া দুনিয়ায় ছয় লক্ষ কিলোমিটারের বেশি পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়েছিলেন রামচন্দ্র…..।

চন্দন রুদ্র : কলকাতা, ৩ জুন, ২০২৬। সাইকেল। এই নামটা শুনলেই কেমন যেন নিজের স্কুল জীবনের কথা মনে পড়ে যায়। পাড়ার এক দাদার কাছে সাইকেল শেখার দিনগুলি আজও ভুলিনি। শুরুতে হাফ প্যাডেল তারপরে ফুল প্যাডেল। ব্যালান্স ঠিক না রাখতে পারলেই একেবারে ধপাস।

আমাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে সাইকেলের যেমন একটা মিল খুঁজে পাই। দেখবেন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই আমাদের ব্যালান্স বা ভারসাম্য রেখে চলতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই সমূহ বিপদ। একেবার মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা।

আজ ৩ জুন বিশ্ব সাইকেল দিবস। একটা সময় পাড়ার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সাইকেল থাকতো। আজকের মতো ওই সময় অটো কিংবা টুহুইলারের এত দাপট ছিল না। হারকিউলিস, হিরো, অ্যাভন। তখন এমন নানা কোম্পানির সাইকেল পাওয়া যেত। জানি না এখনও ওই সব কোম্পানির সাইকেল বাজারে পাওয়া যায় কিনা! সেদিন আর নেই। বাজারে মোটর চালিত সাইকেল নানান ধরনের পাওয়া যায়। তবে মানুষের বহু কাজে সাইকেল আজও গুরুত্বপূর্ণ যান।

তখন অনেকটাই ছোট। বর্ধমান জেলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। ওখানকার বিখ্যাত কার্জন গেটের কাছে গিয়ে দেখি রাস্তার সাইকেল আর রিক্সা সামলাতেই ট্রাফিক পুলিশ বাবাজি হিমসিম খাচ্ছেন। কলকাতা শহরে তেমনটা চোখে না পড়লেও ওখানে গিয়েই প্রথম বহু মেয়েকে সাইকেলে সওয়ারী হতে দেখেছিলাম।

আমাদের দেশের বহু সিনেমা, গল্পেও বারে বারে এসেছে সাইকেল। এখন অবশ্য তেমনটা দেখা যায় না। বিয়ের যৌতুক হিসেবেও একটা সময় এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঘড়ি, আংটি আর সোনার বোতামের সঙ্গে নতুন জামাইকে সাইকেল উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। আজকাল তেমন রেওয়াজ চালু আছে কিনা জানি না!

পুরনো গাড়ির মতো পুরনো সাইকেলও বিক্রি হয়। কিন্তু পুরনো সাইকেল বেচা-কেনার জন্য একটা মস্ত হাট! হ্যাঁ, বাংলাদেশের খুলনা জেলার শাহপুরে আজও নাকি প্রতি বৃহস্পতিবার করে বসে এই পুরনো সাইকেলের হাট।

ছেলেবেলায় দেখেছি বহু এলাকায় তরুণ যুবকেরা অর্থ উপার্জনের জন্য সাইকেল নিয়ে নানা ব্যালান্সের খেলা দেখাতে আসতেন। প্রচুর মানুষ সেই খেলা দেখতে ভিড় জমাতেন। খেলা দেখিয়ে ভাল আয়ও হত। আজকাল নেট যুগে এ সব আর দেখা যায় না। শরীর স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য সাইকেল চালানো খুবই উপকারী। একদিকে যেমন অর্থ সাশ্রয় হয় অন্যদিকে পরিবেশ বান্ধব এই সাইকেল।

সাইক্লিং একটা ভাল ব্যায়ামও। শরীর সুস্থ রাখতে চিকিৎসকেরা অনেক সময়ই সাঁতার কিংবা নিয়মিত সাইকেল চালানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সবচেয়ে বড় কথা সাইকেল আবার একটি পরিবেশবান্ধব যানও। সাইকেল চালাতে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় না। তাই দূষণেরও বালাই নেই।

পরিবেশবান্ধব ট্রাম বাঁচানোর জন্য যেমন কলকাতা শহরে ‘ট্রাম ইউজার অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি হয়েছে। তেমনি এই শহরে বেশি করে সাইকেল চলাচলের রাস্তার দাবিতে গড়ে উঠেছে ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ।’

সাইকেলে সওয়ার হয়ে সারা দুনিয়া ঘুরেছিলেন বিমল মুখার্জি। এই বাঙালি ভূপর্যটকের লেখা ‘দু’চাকায় দুনিয়া’ বইটি আমাদের অনেকেরই পড়া। বিমলবাবু’র নামটা উঠতেই মনে পড়ে যাচ্ছে আর এক বাঙালি ভূপর্যটকের কথা। তিনি রামচন্দ্র বিশ্বাস।

উত্তরপাড়ার এই মানুষটি শান্তির বার্তা নিয়ে সাইকেল আর হাজার পাঁচেক টাকাকে সম্বল করে বেরিয়ে পড়েছিলেন বিশ্ব পরিক্রমায়। অনেক বছর আগের কথা। প্রাথমিক ভাবে ১৩৪টি দেশ ভ্রমণের পর অল্পদিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন তিনি। ওই সময় তাঁর বিশ্বভ্রমণের অবিশ্বাস্য সব অভিজ্ঞতা নিয়ে আনন্দমেলা পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলাম।

১৯৮২ থেকে ২০১১ সাল। দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে সাড়া দুনিয়ায় ছয় লক্ষ কিলোমিটারের বেশি পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়েছিলেন রামচন্দ্র। ২৯ বছরের এই পথ পরিক্রমায় ১৫৬টি দেশের তিন হাজারের বেশি শহর ছুঁয়ে নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে অবশেষে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ‘সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ’ নামে একটি বইও লিখেছেন রামচন্দ্র।

সত্যি, কত বিচিত্র স্বপ্নপূরণেও বন্ধু হয়ে উঠতে পারে সাইকেল। তাই না! এই ডিজিটাল যুগেও সাইকেল নামক যানটি আজও বহু মানুষের জীবন-জীবিকার বড় সহায়!

 

More from GeneralMore posts in General »
More from SocialMore posts in Social »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *