Press "Enter" to skip to content

প্রবল চাপে শ্রীলেখা মিত্র…।

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৯ আগস্ট, ২০২৬। নিট কেলেঙ্কারি ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত ২৪ জুলাই কলকাতার ধর্মতলায় ছাত্রদের প্রতিবাদ মিছিল ঘিরে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও জটিল আকার নিচ্ছে। মিছিলকে কেন্দ্র করে হিংসা, সাংবাদিক নিগ্রহ, রাজনৈতিক তরজা সবকিছুর মাঝেই এবার নতুন করে আইনি চাপে পড়লেন টলিউড অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘কুরুচিকর’ ছবি সম্বলিত একটি পোস্টার হাতে নেওয়া এবং সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই একাধিক থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরও দুটি নতুন অভিযোগ।

 

ঘটনার সূত্রপাত ২৪ জুলাইয়ের প্রতিবাদ মিছিল থেকে। নিট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার উদ্দেশে ছাত্রদের একটি মিছিল বের হয়। সেই মিছিলেই শ্রীলেখা মিত্রকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি-সহ একটি বিতর্কিত পোস্টার হাতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই মুহূর্তের ছবি পরে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, দেশের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাহানি করার উদ্দেশ্যেই ওই পোস্টার প্রদর্শন করা হয়েছে।

 

এই ঘটনার পর প্রথমে রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র কেয়া ঘোষ আনন্দপুর থানায় শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একইসঙ্গে বিজেপির নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানাতেও পৃথক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। সেই আবহেই এবার আরও দু’টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যা নতুন করে এই মামলাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

 

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতার মুচিপাড়া থানায় এই ঘটনায় দুটি পৃথক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। অভিযোগকারী দু’জনই মালদহ জেলার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে একজন মালদহের হাবিবপুর এলাকার শ্রীরামপুরের বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, ২৪ জুলাই শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার উদ্দেশে বের হওয়া নিট-বিরোধী মিছিলে শ্রীলেখা মিত্র এবং অন্যান্য অভিযুক্তরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবিযুক্ত একটি ‘কুরুচিকর’ পোস্টার হাতে নিয়ে ছবি তোলেন। পরে সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অভিযোগকারীর দাবি, অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করেছেন এবং তাঁদের এই আচরণ জনশান্তি বিঘ্নিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই হাবিবপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

 

অন্যদিকে মালদহের বামনঘাটা থানাতেও একই ধরনের আরেকটি অভিযোগ দায়ের করেন শ্রীবিষ্ণুপুর গ্রামের এক বাসিন্দা। দুটি অভিযোগই প্রথমে ‘জিরো এফআইআর’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। পরে মালদহ জেলার পুলিশ সুপারের নির্দেশে সেই দুটি এফআইআর কলকাতার মুচিপাড়া থানায় পাঠানো হয়। কারণ, যে শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরের বাইরে থেকে মিছিল শুরু হয়েছিল, তার একটি অংশ মুচিপাড়া থানার অধীনস্থ এলাকায় পড়ে। ফলে তদন্তের দায়িত্বও সেই থানার উপর বর্তায়।

 

সূত্রের খবর, মুচিপাড়া থানায় অভিযোগ পৌঁছনোর পর ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে খুব শীঘ্রই অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে বলেও জানা যাচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনও মন্তব্য করা হয়নি।

 

এই ঘটনার পর থেকেই বিজেপি শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সরব। রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র কেয়া ঘোষ অভিযোগ করেন, শ্রীলেখা তথাকথিত ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করার রাজনীতিতে শামিল হয়েছেন। শুধু অভিযোগ দায়েরেই থেমে থাকেনি বিজেপি। তাঁদের দাবি, শ্রীলেখার বিরুদ্ধে একাধিক থানায় এফআইআর হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা উচিত। তা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়েছে গেরুয়া শিবির। ফলে বিষয়টি এখন শুধুমাত্র একটি পোস্টার বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনৈতিক সংঘাতের অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

 

এই মামলায় যে আইনগত ধারাগুলির উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস), ২০২৩-এর ৩৫২ ধারা, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে কারও ভাবমূর্তি বা মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে জনশান্তি বিঘ্নিত করার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ৩৫৩ ধারায় প্রকাশ্যে উসকানিমূলক তথ্য, ছবি বা আচরণের মাধ্যমে জনরোষ সৃষ্টি করার অভিযোগের বিধান রয়েছে। সংবিধানের ১৯(১)(২)-এর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও তা নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে। পাশাপাশি ৩৫৬ ধারায় ইচ্ছাকৃত মানহানির অভিযোগের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, এই ধারাগুলির আওতায় শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

তবে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শ্রীলেখা মিত্র। অভিনেত্রীর দাবি, তিনি বিজেপি বা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক বিরোধী হতে পারেন, কিন্তু তাই বলে তাঁকে দেশদ্রোহী বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাঁর কথায়, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও বিতর্কিত পোস্টার হাতে নেননি। সেই সময় তাঁর চোখে রোদচশমা ছিল এবং চারদিকে পুলিশের লাঠিচার্জ চলছিল। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে তিনি কোনওভাবে পোস্টারটি হাতে তুলেছিলেন মাত্র। পোস্টারটি ছোট হওয়ায় তিনি তাতে কী ধরনের ছবি ছিল, তা বুঝতেই পারেননি। এমনকি পোস্টারটি ঘুরিয়ে দেখারও সুযোগ হয়নি বলে তাঁর দাবি। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তিনি জেনেশুনে এমন কাজ করার কথা ভাবতেই পারেন না।

শ্রীলেখা আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের ভয় তাঁকে বিচলিত করছে না। বরং গোটা ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছেন তিনি। পাল্টা সুরে তিনি শাসকদল এবং তাঁর সমালোচকদেরও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ফলে একদিকে যেমন আইনি তদন্ত এগোচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপানউতোরও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।

এই মুহূর্তে মামলার তদন্ত চলছে। মুচিপাড়া থানার তদন্ত কোন দিকে এগোয়, অভিনেত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করা হয় কি না এবং অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।

 

 

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *