কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : সবং, ১৬ আগস্ট, ২০২৬। জলমগ্ন স্কুল চত্বর। চারদিকে শুধু থইথই জল। হাঁটতে গেলেই হাঁটুর ওপর জল, ফলে স্কুলে পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব ! কিন্তু প্রকৃতির এই প্রতিকূল পরিস্থিতিও থামাতে পারেনি একদল খুদে পড়ুয়ার দেশপ্রেমকে ! স্বাধীনতা দিবসের সকালে জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং দেশের গৌরবের এই বিশেষ দিনে অংশ নিতে তাঁরা বেছে নেয় এক অভিনব পথ।
নৌকায় চেপেই তাঁরা পৌঁছে যায় স্কুলে। হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে দেশাত্মবোধক স্লোগান আর হৃদয়ে অদম্য দেশপ্রেম এই দৃশ্যই যেন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
শনিবার সারা দেশজুড়ে পালিত হয় ৮০তম স্বাধীনতা দিবস। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মতো পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়েও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সকাল থেকেই দেখা যায়, টানা বৃষ্টির জেরে স্কুল চত্বর সম্পূর্ণ জলমগ্ন। চারদিকে জমে থাকা হাঁটুরও বেশি জল অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন উঠেছিল, এমন পরিস্থিতিতে পতাকা উত্তোলন হবে কীভাবে ? ছোট ছোট পড়ুয়ারাই বা কীভাবে অনুষ্ঠানে অংশ নেবে?
ইচ্ছাশক্তি প্রবল তাদের। খুদে পড়ুয়াদের উৎসাহ ও দেশপ্রেম দেখে এগিয়ে আসেন এলাকার বাসিন্দা এবং অভিভাবকেরা। তাঁদের উদ্যোগেই নৌকার ব্যবস্থা ! সেই নৌকাতেই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে ও বসে স্কুলের সামনে পৌঁছয় পড়ুয়ারা। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময়ও তারা নৌকাতেই ! জলমগ্ন স্কুল চত্বরে নৌকায় বসেই তারা শ্রদ্ধা জানায় দেশের তেরঙ্গাকে !
একদিকে প্রকৃতির প্রতিকূলতা, অন্যদিকে শিশুদের অদম্য দেশপ্রেম, দুটি বিপরীত ছবি ! অথচ দুয়ের মিলনে তৈরি হল এক বিরল হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত।
পতাকা উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি অনুষ্ঠান। নৌকায় বসেই খুদেদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘বন্দে মাতরম’। সেই ধ্বনির প্রতিধ্বনি যেন জল পেরিয়ে চারদিকে। পাশাপাশি তাঁদের কণ্ঠে শোনা যায় মহাত্মা গান্ধী ও শহিদ ভগৎ সিংয়ের জয়ধ্বনি ! ছোট ছোট কণ্ঠের সেই দেশাত্মবোধক স্লোগান উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে যায়।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের প্রতি ভালোবাসা যে কোনও বাধার চেয়ে অনেক বড় তারই এক অনন্য বার্তা দিল এই দৃশ্য।
এই ব্যতিক্রমী মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে স্কুল চত্বরের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। জলমগ্ন পরিবেশে নৌকায় ভেসে স্বাধীনতা দিবস পালনের দৃশ্যে তাঁরাও আবেগাপ্লুত ! অনেকেই বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বরং দেশের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং অংশগ্রহণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই খুদে পড়ুয়ারা সেই শিক্ষাই যেন বাস্তবে তুলে ধরল।
প্রতিকূল পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, দেশের প্রতি ভালোবাসা কখনও থেমে থাকে না। হাঁটতে না পারলেও নৌকায় চেপে জাতীয় পতাকার সামনে উপস্থিত হওয়ার এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা দিবসের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক ছবি হয়ে থাকবে। সবংয়ের চাঁদাগোবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই অভিনব উদ্যোগ ও খুদেদের অদম্য দেশপ্রেম প্রমাণ করে দিল, সত্যিকারের দেশপ্রেম কোনও বাধাই মানে না।
















Be First to Comment