পর্তুগাল: ২ (রোনাল্ডো-পেনাল্টি, র্যামোস)
ক্রোয়েশিয়া: ১ (পেরিসিচ)
কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৩ জুলাই, ২০২৬। দুজনে অভিন্নহৃদয় বন্ধু। কিংবদন্তিও ! ফুটবলের প্রায় সব ট্রফিই তাঁদের শোকেসে, শুধু একটিমাত্র স্বপ্ন এখনও অধরা—ফিফা বিশ্বকাপ। সেই স্বপ্ন নিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও লুকা মদ্রিচ। দু’জনেই জানতেন, হয়তো এটাই শেষ সুযোগ। একজনের পথ এগোবে, অন্যজনের নাচ শেষ। আবেগ, প্রত্যাশা আর অনিশ্চয়তার সাক্ষী থাকতে শুক্রবার ভোরে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছিলেন বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক পর্তুগাল। প্রথম দশ মিনিট কার্যত বলের দখল, গতি ও আক্রমণের ধার সবকিছুতেই এগিয়ে রবার্তো মার্টিনেজের ছেলেরা। সেই সময়ে ক্রোয়েশিয়াকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না ! রাফায়েল লিয়াওদের সামনে একের পর এক সুযোগ, শুধু গোলের দেখা মিলছিল না। এদিন মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন ইতিহাস ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি বয়সে মাঠে নামা ফুটবলার হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেন তিনি। তবে প্রথমার্ধে তাঁর খেলায় বয়সের ছাপ কিছুটা স্পষ্ট। উড়ে আসা একটি দুর্দান্ত ক্রসে ঠিক সময়ে মাথা ছোঁয়াতে না পারায় সহজ সুযোগ হাতছাড়া ! বিশ্বকাপের নকআউটে প্রথম গোল করার সুবর্ণ সুযোগ তখনই নষ্ট হয়ে যায় তাঁর।
শুধু রোনাল্ডো নন, গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ব্রুনো ফার্নান্ডেজও। সেই সুযোগে ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে ক্রোয়েশিয়া। প্রথমদিকে আক্রমণে খুব একটা দেখা না গেলেও রক্ষণভাগকে অসাধারণভাবে সংগঠিত করে রাখেন জসিপ সুতালোরা। পর্তুগালের একের পর এক আক্রমণ, তাঁদের দৃঢ় রক্ষণে আটকে গেল। প্রথমার্ধের শেষে স্কোরলাইন গোলশূন্য, কিন্তু ম্যাচ পুরোপুরি সমানে সমানে !
বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের গতি। দুই দলই আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল। ৫৩ মিনিটে দুর্দান্ত দলগত আক্রমণ, এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। ইভান পেরিসিচের গোলে বড় ভূমিকা স্ট্যানিসিচের বুদ্ধিদীপ্ত দৌড় ও নিখুঁত ক্রসের। ডিফেন্ডারদের টেনে এনে তৈরি করা সেই ফাঁকেই গোলের রাস্তা খুলে যায়। গোল করার মাত্র দু’মিনিট পরই আবার বল জালে জড়িয়েছিল ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল।
এই ধাক্কার পর ৬৩ মিনিটে একসঙ্গে চারটি পরিবর্তন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজের। সেই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নতুন ছন্দে পর্তুগাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রোনাল্ডো দুর্দান্ত এক গোল করলেও সামান্য অফসাইডের জন্য সেটি বাতিল।
৬৮ মিনিটে এল ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। পর্তুগাল পায় পেনাল্টি। চারদিকে তখন তীব্র চাপ। ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে বল হাতে তুলে নেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। গোলে শট মারতে বিশ্বের সেরা ফুটবলাররাও ভুল করেন, কিন্তু করেননি। নিখুঁত শট, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজের প্রথম গোল। দল সমতায়। সেই গোলের সঙ্গে আরও একটি ইতিহাসও গড়ে ওঠে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেন সিআর সেভেন !
গোল করার পর দলের স্বার্থে মাঠ ছেড়ে দেন রোনাল্ডো। তাঁর পরিবর্তে নামেন গন্সালো রামোস। অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে সেই রামোসই করেন ম্যাচের নির্ণায়ক গোল। ৯৪ মিনিটের সেই আঘাতেই কার্যত শেষ হয়ে যায় লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ যাত্রা। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এতদিন ধরে বুকে লালন করেছিলেন, তা পূরণ হল না ক্রোয়েশিয়ার এই মহানায়কের।
তবে নাটক তখনও বাকি ! ১০ মিনিটের সংযুক্ত সময় শেষ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে বল আবার পর্তুগালের জালে। ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে সেই গোলও অফসাইডের কারণে বাতিল ! সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সেটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
এই জয়ের আরও একটি আবেগঘন দিক ছিল। দিনটি ছিল পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোটার মৃত্যুবার্ষিকী। প্রয়াত সতীর্থের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে জয় ছিনিয়ে আনাই যেন ছিল পুরো পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধার্ঘ্য।
চল্লিশ পেরোলেই মানুষের সেরা সময় শেষ, এই প্রচলিত ধারণাকে বারবার ভুল প্রমাণ করে চলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ! বরং তাঁর জীবন যেন নতুন করে প্রমাণ করছে, ‘লাইফ বিগিনস অ্যাট ফোর্টি’ শুধুই প্রবাদ নয়, বাস্তবও হতে পারে। একচল্লিশ বছর বয়সেও নতুন নতুন ইতিহাস তাঁর !
এই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স হতাশাজনক। সমালোচনার ঝড় ! ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত লিখেছিল, পর্তুগালের প্রথম একাদশে খেলছেন দশজন ফুটবলার আর একজন মূর্তি ! অনেক ফুটবল বিশ্লেষক দাবি তুলেছিলেন, তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর ওপর আস্থা হারাননি। প্রথম দিন থেকেই তিনি রোনাল্ডোর পাশে, সেই বিশ্বাসের মর্যাদাই দিলেন অধিনায়ক।
সমালোচনার আরেকটি বড় বিষয়, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে রোনাল্ডোর গোলশূন্যতা। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে প্রতিটি আসরে গোল করার বিরল কীর্তি থাকলেও নকআউটে গোল করতে না পারার জন্য তাঁকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। অনেকেই বলেছিলেন, মরণবাঁচন ম্যাচে তিনি দলের কাজে আসেন না। সেই সমস্ত অভিযোগের জবাবই এক ম্যাচে দিয়ে দিলেন সিআর সেভেন। রেকর্ড গড়লেন, গোল করলেন, দলকে উদ্ধার করলেন এবং পর্তুগাল পরের ধাপে।
অন্যদিকে, লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ স্বপ্নের ইতি ঘটল বেদনায়। অসাধারণ ক্যারিয়ারে অগণিত সাফল্য থাকলেও বিশ্বকাপ ট্রফি আর ছোঁয়া হল না তাঁর। ফুটবলের দুই মহাতারকার এই আবেগঘন লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে রইলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বিশ্বকাপ জয়ের সেই বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন এখনও তাঁর নাগালে। আর মদ্রিচ ? তিনি বিদায় নিলেন মাথা উঁচু করেই, একজন কিংবদন্তির মতো, তাঁর গল্প ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বহুদিন বেঁচে থাকবে।











Be First to Comment