এই বিশ্বকাপ কি মেসির ? অরূপ কি তাতিয়ে দিল !
🇦🇷 আর্জেন্টিনা ২ (মেসি)
🇦🇹 অস্ট্রিয়া ০
কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ২৩ জুন, ২০২৬। মেসি মেসি মেসি ! মেসিময় রাত ! লিওনেল মেসির নামের পাশে আরও এক অনন্য বিশ্বরেকর্ড। আর সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যাতেই অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি মিস ! তারপরেও জোড়া গোল করে সব আলো নিজের দিকে টেনে নিলেন এলএম টেন ! তাঁর দুই গোলেই জয় এল নীল-সাদা ব্রিগেডের, আর সেই সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসে যুক্ত হল নতুন এক অধ্যায় !
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সমর্থকদের প্রত্যাশা তুঙ্গে। সোমবার অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধেও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক লিওনেল মেসি, লওতারো মার্টিনেজরা। ম্যাচের প্রথম কয়েক মিনিটেই একাধিক আক্রমণ আর্জেন্টিনার ! অস্ট্রিয়ার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখার পাশাপাশি তারা গোলের সুযোগও তৈরি করে।
প্রথম ঝটকা পেনাল্টিতে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার লওতারো মার্টিনেজকে বক্সের ভিতরে একসঙ্গে ট্যাকল করেন অস্ট্রিয়ার দুই ডিফেন্ডার। প্রথমে রেফারি খেলা চালিয়ে দিলেও পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সাহায্যে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। রিপ্লেতে দেখা যায় ট্যাকলটি নিয়মবহির্ভূত ছিল। ফলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা।
পেনাল্টি স্পটে বল বসালেন লিওনেল মেসি। গোটা ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের ! মনে হচ্ছিল, এই গোলই তাঁকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতার আসনে বসিয়ে দেবে। কিন্তু অবিশ্বাস্য । সেই সুযোগ মিস মেসির । তাঁর নেওয়া শট লক্ষ্যভ্রষ্ট । বল জালের ধারেকাছেও পৌঁছয়নি। মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ স্টেডিয়াম। নাকি সারা বিশ্বও । মনে হচ্ছিল, আজ ভাগ্যদেবী কি তাহলে বিরূপ আর্জেন্টিনার ওপর!
কিন্তু, নাম তাঁর লিওনেল মেসি ! ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নায়ক তিনি ! তাই নিজেই নিজের গল্প লেখেন ! পেনাল্টি মিসের হতাশা ঝেড়ে ফেলতে সময় লাগল মাত্র আধ ঘণ্টা । ম্যাচের ৩৮ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে আসা একটি নিখুঁত মাইনাস অসাধারণ দক্ষতায় জালে জড়িয়ে দেন তিনি। বল জালে জড়াতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে স্টেডিয়াম। গ্যালারি থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মেসি-ভক্তের আনন্দধ্বনি যেন একসূত্রে বাঁধা পড়ে যায়।
গোলটি শুধু আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেয়নি, তৈরি করেছে এক নতুন ইতিহাসও। আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগে, ২২ জুন, বিশ্ব ফুটবল পেয়েছিল দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার সেই কিংবদন্তি ‘হ্যান্ড অব গড’-এর স্মৃতি। চার দশক পরে একই দিনে আরেক আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি নিজের নাম আরও গভীরভাবে খোদাই করে দিলেন ফুটবল ইতিহাসের পাতায়। বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় উঠে এলেন সবার শীর্ষে। হাফটাইম পর্যন্ত মেসির ওই একমাত্র গোলেই এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র কিছুটা বদলে যায় ! পালটা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা অস্ট্রিয়ার। মাঝেমধ্যে কয়েকটি সম্ভাবনাময় মুভও তৈরি হয়। যদিও আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে বড় কোনও পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারেনি তারা। একটি বিপজ্জনক ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত সেভ করতে হয় গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। সেটাই ছিল কার্যত অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুযোগ।
অন্যদিকে পালটা আক্রমণে আরও কয়েকবার গোলের কাছাকাছি পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ পাস কিংবা ফিনিশিংয়ের অভাবে ব্যবধান বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
অবশেষে যোগ করা সময়ের একেবারে শেষদিকে আসে দ্বিতীয় গোল। সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টায় তখন প্রায় গোটা অস্ট্রিয়া দলই উঠে এসেছে আক্রমণে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত পালটা আক্রমণে আর্জেন্টিনা। সেখানেই আবারও ঝলক লিওনেল মেসির ! নিখুঁত ফিনিশে বল জালে জড়িয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। বিশ্বকাপে এটি তাঁর ১৮তম গোল। সেই গোলেই ২-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার।
এই জয়ের ফলে টানা দুটি ম্যাচ জিতে নকআউট পর্বে জায়গা পাকা লিওনেল স্কালোনির দল। প্রথম ম্যাচের মতই দ্বিতীয় ম্যাচেও আর্জেন্টিনার সাফল্যের কেন্দ্রে মেসি ! বলা যায়, এই জয়ও সম্পূর্ণ মেসিময়। তবে মেসির জাদুকরী মুহূর্তগুলির বাইরে গোটা দল এদিন খুব একটা চোখধাঁধানো ফুটবল খেলতে পারেনি। মাঝমাঠে কিছুটা অসংগতি, আক্রমণে বেশ কয়েকটি সুযোগ নষ্ট করা এবং দ্বিতীয়ার্ধে অস্ট্রিয়াকে কিছুটা বেশি জায়গা দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিশ্চয়ই ভাবাবে কোচ লিওনেল স্কালোনিকে।
তবুও দিনের শেষে সব আলোচনা ছাপিয়ে উঠে আসে একটাই নাম—লিওনেল মেসি। পেনাল্টি মিসের হতাশা থেকে বিশ্বরেকর্ডের শিখরে ওঠার এই গল্প যেন তাঁর দীর্ঘ ফুটবল জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। বাধা আসে, ব্যর্থতা আসে, কিন্তু শেষ হাসি লিওনেল মেসিরই।
ফুটবলের যুবরাজ আর রাজপুত্র ইতিহাসে ঢুকে গেলেন একই দিনে ! ৮৬ র বিশ্বকাপ ছিল মারাডোনাময়, ২৬ কি তাহলে মেসির ?











Be First to Comment