প্রবীর রায়: প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা, কলকাতা, ১৪ জুন, ২০২৬। মূল বিষয়ে যাবার আগে একটা ছোট অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। এ কথা অনস্বীকার্য- যে কোনো সময়েই ক্ষমতাশীল শাসকদল সব ক্ষেত্রেই ছড়ি ঘুরিয়ে দাপট দেখাতে চায়। কিন্তু অতীতে শাসকদল অভিভাবকের মতো ইন্ডাস্ট্রির পাশেও দাঁড়িয়েছে। ৮৫/৮৬ সালের কথা। দূরদর্শনে “গৃহদাহ” ধারাবাহিকের প্রযোজনার কাজে হাত দিয়েছি। ওই ধারাবাহিকে কাজ করেছিলেন- মুনমুন সেন, শৈলেন মুখার্জী, রঞ্জিত মল্লিক, শমিত ভঞ্জ, পাপিয়া অধিকারী প্রমুখ।
পাশাপাশি চিন্ময় রায়ের “রাম শ্যাম যদু” ধারাবাহিকে প্রযোজনার কাজ শুরু করি। এই সিরিয়াল নিয়ে চিনুদার সঙ্গে আমার একটু ভুল বোঝাবুঝি শুরু হলো।
তখন বামফ্রন্টের আমল। চিনুদা নিজেও বাম ঘেঁষা । সে সময়ে ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট অজিত লাহিড়ী, সেক্রেটারি প্রণব চৌধুরী (বাবলু) , এমন কি বুবুও (শমিত ভাঞ্জ) বেশ সক্রিয়। এঁরা প্রত্যেকেই বাম মনস্ক ছিলেন। সকলের কাছ থেকেই অনেক সাহায্য পেয়েছিলাম।
সেই সময় একদিন টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে “গৃহদাহ”র শুট চলছে, হঠাৎ স্টুডিও অফিস থেকে একজন এসে বলল প্রবীরদা, আপনার ফোন এসেছিল চিনুদার কাছ থেকে। বলেছেন “উনি কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন”, আপনাকে বলে দিতে বললেন। সেদিন গেস্ট হিসেবে সুব্রতদা (সুব্রত মুখার্জি) এসেছিলেন শুটে। সুব্রতদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “ওনাকে বলুন , উনি কোন কংগ্রেস নিয়ে আসতে চান !! এখানে তো কংগ্রেস বসে আছে”। বলেই হাসতে শুরু করলেন। এইটুকুই ছিল পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট। বাম জমানাতে এতো মারাত্মক ভাবে রাজনৈতিক খবরদারি ছিল না, যা আমরা দেখেছি শেষ ১৫ বছরে।
অবশেষে ৪ঠা মে ২০২৬-এ বাংলা সিনে ইন্ডাস্ট্রির উপর থেকে একটা কালো ছায়া সরলো। বিগত ১২/১৩ বছর ধরে টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’ (FCTWEI)-এর চেয়ারম্যান পদে আসীন স্বরূপ বিশ্বাসের ভূমিকায় ইন্ডাস্ট্রি প্রায় শেষ হতে বসেছিল। ছায়াছবি নির্মাণে প্রতিটি বিভাগে তাঁর ক্ষমতাপ্রয়োগ, নিয়ন্ত্রণ, চূড়ান্ত দুর্নীতি, ব্যান কালচার, হল রিলিজ- সব মিলিয়ে প্রভূত স্বৈরাচারী দাপট রাজ্যের বড় আর ছোট পর্দার শিল্পকে একেবারে পথে বসিয়ে ছেড়েছে।
নতুন সরকার আসার পর পরিচালক, শিল্পী, কলাকুশলী- সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু নতুন অশনি সঙ্কেত দেখা যাচ্ছে। টালিগঞ্জের নব নির্বাচিত বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর ঘোষণায় প্রশ্ন উঠছে- বাংলা বিনোদন জগতের ক্ষমতার কাঠামো কি বদলাতে চলেছে? উনি টলিপাড়ার ‘ফেডারেশন’ ও ২৬টি গিল্ড ভেঙে ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যান্ড কালচারাল কনফেডারেশন’ (EIMPCC) নামে নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছেন। প্রশ্ন উঠছে- উনি একক ভাবে এই সিদ্ধান্ত কিভাবে নিতে পারেন? ‘কনফেডারেশন’ কিভাবে, কোন আইনে, কোন বৈঠকে তৈরি হল? কেন ‘ডিরেক্টারস গিল্ড’ কনফেডারেশানের আনুগত্য স্বীকার করবে? উনি এ কথাও বলেছেন- ‘ যারা নিয়ম মানবে না- তারা কাজ করতে পারবে না’। মানে ??? উনি কি নতুন করে ব্যান কালচার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন? কনফেডারেশানের সদস্য হতে গেলে নতুন করে কার্ড তৈরি করতে হবে। এই কার্ডে সারা দেশে কাজ করার সূযোগ না-ও থাকতে পারে।
বিগত সরকারের সময় ফেডারেশান এবং ইমপা- দুটি সংগঠনই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাববলয়ে চলে গিয়েছিল। তার কারণ মুষ্টিমেয় কয়েক জনের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি। এবারেও শিল্প জগতের কারোর সংগে আলোচনা না করে নবান্নের সভাঘরে কয়েকজন সরকারী আধিকারিকের সঙ্গে বৈঠক করেই এই ঘোষণা – নতুন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিকে হতে হবে “ All Inclusive”- তার জন্য আলাপ আলোচনা না করে কোনো একজন একপাক্ষিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না বলেই আমি বিশ্বাস করি।













Be First to Comment