Press "Enter" to skip to content

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার…। দাদা, তুমি কথা কিন্তু রাখলে না…।

প্রবীর রায় : প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। কলকাতা। ২৬ আগস্ট, ২০২৬। দেখতে দেখতে মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলাম আমরা। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়- বাংলা ছায়াছবির জগতের অবিসংবাদিত এবং নির্বিকল্প শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ১০০ বছরের জন্মদিন দেখার সৌভাগ্য হলো আমার।

কতো পুরনো স্মৃতি যে মনে পড়ে যায় !

উত্তমকুমারের জন্মশতবার্ষিকী আগামী ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। ১৯৭৪ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর অর্থাৎ উত্তমকুমারের ৪৮ বৎসর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটের নিচের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই পার্টিতে আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। বিখ্যাত পরিচালক শ্রী অজয় কর নিজের ৮ মিলিমিটার ক্যামেরাতে পুরো অনুষ্ঠান ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। ঠিক তার দিন কয়েক আগে আমি ঢাকা থেকে ফিরেছিলাম। সেবার রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার আলাপ হয় ঢাকা স্টুডিওতে। উত্তমদা প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেন- “ রাজ্জাক কেমন আছে?” আমি বললাম- “ ভালো আর তোমার খুব প্রশংসা করছিলেন।“ উত্তমদা বললেন- “রাজ্জাক খুব ভালো ছেলে, কলকাতায় খুব স্ট্রাগল করেছিল।“

উত্তমদার সঙ্গে ৮/৯ বছর খুব মিশেছি। বেণুদি, সোমা, ময়রা স্ট্রীটের একটা বিরাট অংশ আমার স্মৃতিতে আজও অম্লান। এমনকি যখন উত্তমদা একবার সমরেশ বসুর “বিবর” করার পরিকল্পনা করছেন, তাতে প্রধান চরিত্রে একবার অভিনয় করার কথাও হয়েছিল। সেই সময় পার্ক হোটেল ব্যাংকোয়েটে “রক্ততিলক” ফিল্মের একটা পার্টি ছিল, ফেরার সময় নিচে আমরা কার পার্কিংয়ে অপেক্ষা করছি, উত্তমদা এলেন। জিজ্ঞাসা করলাম “দাদা, বিবরের কথা মনে আছে তো? এখনও মনে আছে দাদা আমার গালটা টিপে বললেন “উত্তমকুমার কথা দিলে কথা রাখে”! এই হচ্ছেন উত্তমকুমার। এই ছবিতে আমার প্রধান চরিত্র ‘বীরেশ বোস”-এর ভূমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু “বিবর” হওয়ার আগেই দাদা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। অভিমান করে বলতে ইচ্ছে করে – ‘দাদা, তুমি কথা কিন্তু রাখলে না।“

লিখতে বসে আরেকটা চমকপ্রদ স্মৃতি ঝলসে উঠলো। জয়শ্রী (আমার প্রাক্তন স্ত্রী) তখন উত্তমদার সঙ্গে সব্যসাচী ছবিতে কাজ করছে। আমি ঠিক করলাম- উত্তমকুমার আর জয়শ্রীকে নিয়ে একটা ছবি প্রযোজনা করব। পরিচালনা করবেন পীযূষ বোস। কথা হল লেখক সুনীল দাসের সাথে। ওনার সঙ্গে পরিচয় ছিলই। ওঁর লেখা গল্প নিয়েই পরে আমি “কাল মধুমাস” ছবিটি করি। যাই হোক- গল্প নির্বাচিত হল। নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। দিন কয়েক আলোচনা হলো। ছবিতে বাঘের সঙ্গে হাতাহাতি করার একটি দৃশ্য ছিল। একদিন উত্তমদা বললেন- “শোন প্রবীর, আমার একটা প্রস্তাব আছে। এই দৃশ্যে আমি কিন্তু ডামি ব্যবহার করবো না। আমি নিজে কাজটা করব“ আমরা হতভম্ব… অনেক বোঝানো হল। কিন্তু উনি অনড়… “আমি ঘোড়ায় চড়া, তরোয়াল চালানো সব শিখেছি। অতএব এটাও পারব- আর তোমাদের এটা মানতে হবে।“ আমরা বললাম তুমি কি পাগল হয়ে গেলে উত্তমকুমার কে শেষে বাঘের মুখে। পরিচালক শেষ পর্য্যন্ত এ ছবি করা থেকে বিরত হলেন। এই রিস্ক তো নেওয়া যায় না !!

দাদা চলে যাওয়ার পরেও বেনুদি আর সোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। এমনকি বেনুদি চলে যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগেও ১৯শে জানুয়ারি পোস্টার ডিজাইনার একতা ভট্টাচার্যের অনুরোধে বেণুদির কাছে একতা ভট্টাচার্যকে আলাপ করাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। বেনুদি ছবি তোলেন নি কিন্তু অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন একতাকে। ওটাই বোধহয় বেনুদির দেওয়া শেষ অটোগ্রাফ। ২৬শে জানুয়ারি ২০১৮ বেনুদি চলে গেলেন। সকাল ৬টায় আমাকে সোমা ফোন করে খবর দেয়। এখনও মনে আছে সেদিন টাইমস অফ ইন্ডিয়ার রুমন গাঙ্গুলি আমাকে ফোন করে বেনুদির বাড়িতে সোমা ও শন এর একটা ইন্টারভিউ নিতে। আমি ফোনে ইন্টারভিউটা করিয়ে দি।

সোমা আর শনের সঙ্গে এখনও আমার আগের মতোই যোগাযোগ আছে।

এখনও এই শহরে কিছু প্রবীণ মানুষজন আছেন- যাঁরা উত্তমকুমারের সান্নিধ্যলাভ করেছিলেন। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বাইরের মানুষজনও আছেন কিছু। এই যে চারিদিকে সাজো সাজো রবে অনুষ্ঠানসূচী তৈরি হচ্ছে, নানা রকম কর্মসূচী গৃহীত হচ্ছে – সেখানে এই সব মানুষ কি আমন্ত্রিত? বরং উল্টোটা বেশি দেখতে পাচ্ছি। সোস্যাল মিডিয়ায় এতো অসংখ্য উত্তম বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি চোখে পড়ছে- যাঁদের জন্মই হয়েছে মহানায়কের মৃত্যুর অনেক পরে। পুরনো বই, পত্র পত্রিকার লেখা থেকে কপি করে, ভাষার ঈষৎ তারতম্য ঘটিয়ে নিজেদের নামে প্রকাশিত হয়েই চলেছে। সবাই নাকি তাঁকে দেখেছেন ! সম্প্রতি তাঁর পরিবারের একজন জানালেন- “উত্তমকুমারের গায়ের রঙ না কি কালো ছিলো ! ওনার কয়েক মাস বয়সে উত্তমকুমার চলে যান। কি ভাবে বললেন এ কথা ? প্রকৃতপক্ষে ওই পরিবারে সুমনা চট্টোপাধ্যায় এবং মহুয়া চট্টোপাধ্যায় ছাড়া উত্তমকুমারকে এই প্রজন্মের আর কেউ স্বচক্ষে দেখেন নি। তাও মহুয়া চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে ঢুকেছেন, উত্তমকুমার চলে যাওয়ার পর।

তার থেকে অনেক ভালো হতো না কি যদি পুরনো পত্র পত্রিকা, বইগুলি পুনঃপ্রকাশিত হতো, উত্তমকুমারের হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলো খুঁজে পাওয়া যেতো, খারাপ হয়ে যাওয়া প্রিন্টগুলোকে পুনরুদ্ধার করা যেত ? কিছু পুরনো মানুষের কাছে শোনা উত্তমকুমার সমন্ধে কিছু পুরনো ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রাখা।

সর্বোপরি উত্তমকুমার কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়- এটা মনে রাখা দরকার।

 

এমনকি উওমদা চলে যাওয়ার পর বেনুদি একদিন আমাকে আর বর্তমান স্ত্রী সোমাশ্রী (পপাই) কে ডিনারে ইনভাইট করেন ঘন্টার পর ঘণ্টা উত্তামদার আলোচনা আর “ছোটিসি মোলাকাত” দেখা। সেও পপাইর এক অভিজ্ঞতা।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *