ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৯ জুন, ২০২৬। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সংসারের সব কাজ সামলানো সেই সময়ের এক গৃহবধূ হয়েও লেখক জীবনের ৭০ বছরে ২৫০ মতো বই লেখা ” আশাপূর্ণা দেবী ” শুধু বাংলা নয় বিশ্ব সাহিত্যে এক অনন্য নাম।তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মে “নারীমন বনাম পুরুষমন” একটি প্রধান বিষয়। তবে এটি কোনও তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; চরিত্রের মুখে, সংসারের ঘটনায়, সামাজিক রীতিনীতির সংঘাতে এবং ব্যক্তিগত স্বপ্নভঙ্গের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশিত হয়েছে।
আশাপূর্ণা দেবীর লেখায় নারীমন বনাম পুরুষমন
১. ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’-তে
প্রথম প্রতিশ্রুতি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সত্যবতী।
এখানে নারীমন ও পুরুষমনের দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকটভাবে দেখা যায়।
নারীমন (সত্যবতী):
শিক্ষা চাই।
স্বাধীনতা চাই।
প্রশ্ন করার অধিকার চাই।
সমাজের অন্যায় নিয়ম মানতে চায় না।
পুরুষমন (সমাজের পুরুষেরা):
নারী ঘরের মধ্যে থাকবে।
লেখাপড়া শিখলে নারী বেপরোয়া হবে।
সংসারই নারীর একমাত্র কাজ।
সত্যবতীর প্রতিবাদী কণ্ঠে আশাপূর্ণা দেবী দেখিয়েছেন যে নারীর মনও যুক্তিবাদী, অনুসন্ধিৎসু ও স্বাধীন হতে পারে।
এখানে “নারীমন বনাম পুরুষমন” মূলত স্বাধীনতা বনাম নিয়ন্ত্রণের লড়াই।
২. ‘সুবর্ণলতা’-তে
সুবর্ণলতা-এর সুবর্ণলতা মায়ের আদর্শে বড় হলেও শ্বশুরবাড়ির প্রাচীরের মধ্যে বন্দি।
সুবর্ণলতার মন চায়—
সাহিত্যচর্চা, সমাজচিন্তা ও আত্মপ্রকাশ।
কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক পরিবার চায়—
বাধ্য বউ, নীরব স্ত্রী ও অনুগত গৃহিণী।
স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে আশাপূর্ণা দেবী দেখিয়েছেন যে ভালোবাসা থাকলেও মানসিক সমতা না থাকলে দূরত্ব তৈরি হয়।
৩. ‘বকুলকথা’-তে
বকুলকথা-এর বকুল একজন লেখিকা।
এখানে নারীমন আর শুধু প্রতিবাদী নয়, আত্মপ্রতিষ্ঠিত।
বকুল বুঝতে শেখে— পুরুষ শুধু শাসক নয়, অনেক সময় সেও সমাজব্যবস্থার বন্দি।
এই উপন্যাসে আশাপূর্ণা দেবীর দৃষ্টিভঙ্গি আরও পরিণত।
নারীমন বনাম পুরুষমন এখানে পরিণত হয়েছে— মানুষের মন বনাম সামাজিক সংস্কার।
ছোটগল্পে নারীমন বনাম পুরুষমন
আশাপূর্ণা দেবীর অসংখ্য ছোটগল্পে এই বিষয়টি বিচিত্রভাবে এসেছে।
‘ছাড়পত্র’
ছাড়পত্র-এ দেখা যায় স্ত্রী দীর্ঘদিন সংসারের জন্য আত্মত্যাগ করে।
পুরুষ মনে করে— এটাই স্বাভাবিক।
নারী মনে প্রশ্ন জাগে— “আমার নিজের জীবন কোথায়?”
এই প্রশ্নই নারীমনের আত্মসচেতনতার প্রকাশ।
‘পদবিকা’
পদবিকা-তে বিবাহের পরে নারীর পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এসেছে।
পুরুষের নাম ও পরিচয় সামাজিক মর্যাদা পায়।
নারীর নিজস্ব পরিচয় মুছে যায়।
এখানে আশাপূর্ণা দেবী পরিচয়-সংকটের মধ্য দিয়ে নারী ও পুরুষের সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য দেখিয়েছেন।
‘অগ্নিপরীক্ষা’
অগ্নিপরীক্ষা ধরনের গল্পগুলিতে বারবার দেখা যায়—
নারীর চরিত্র নিয়ে সমাজ সন্দেহপ্রবণ।
পুরুষের ক্ষেত্রে একই বিচার প্রযোজ্য নয়।
এই দ্বৈত নৈতিকতাই পুরুষমনের সামাজিক সুবিধাভোগী অবস্থানকে তুলে ধরে।
মায়ের মন বনাম বাবার মন
আশাপূর্ণা দেবীর বহু গল্পে দেখা যায়—
মা সন্তানের সুখ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন।
বাবা অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা, বংশগৌরব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা নিয়মকানুনকে বেশি গুরুত্ব দেন।
অবশ্য তিনি কখনও এটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখাননি।
অনেক গল্পে বাবার হৃদয়ও কোমল এবং মায়ের মনও কঠোর হয়েছে।
তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল বাস্তবভিত্তিক, একপেশে নয়।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে নারীমন বনাম পুরুষমন
আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যজগতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি প্রধান ক্ষেত্র।
তিনি দেখিয়েছেন—
নারী ভালোবাসার মধ্যে মানসিক অংশীদারিত্ব খোঁজে।
পুরুষ অনেক সময় দায়িত্ব পালনকে ভালোবাসার সমার্থক মনে করে।
ফলে উভয়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়।
এই সূক্ষ্ম মানসিক ব্যবধান তাঁর বহু গল্পে এসেছে।
কেন তিনি এই বিষয়টি এত গুরুত্ব দিয়েছেন?
কারণ আশাপূর্ণা দেবী নিজেই এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন যখন—
মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো হতো না,
বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল,
নারীর মতামতের মূল্য কম ছিল।
তিনি ঘরের ভেতর থেকে নারীজীবনের সুখ-দুঃখ প্রত্যক্ষ করেছেন।
তাই তাঁর লেখায় নারীমন শুধু আবেগের নয়, চিন্তারও বিষয়।
একই সঙ্গে তিনি দেখেছেন পুরুষও অনেক সময় সামাজিক প্রথার বন্দি।
ফলে তাঁর সাহিত্য পুরুষবিরোধী নয়; বরং সমাজব্যবস্থার সমালোচক।
উপসংহার
আশাপূর্ণা দেবীর সমগ্র সাহিত্যজুড়ে “নারীমন বনাম পুরুষমন” কোনও বিচ্ছিন্ন প্রসঙ্গ নয়, বরং একটি ধারাবাহিক মানবিক অনুসন্ধান। প্রথম প্রতিশ্রুতি-এর সত্যবতী, সুবর্ণলতা-এর সুবর্ণলতা এবং বকুলকথা-এর বকুল—এই তিন প্রজন্মের নারীর মধ্য দিয়ে ট্রিলজিতে তিনি দেখিয়েছেন যে নারী ও পুরুষের মনের পার্থক্যের চেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক ক্ষমতার অসমতা। তাঁর রচনায় নারীমন প্রতিবাদ করে, স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, ভোগে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মপরিচয়ের সন্ধান করে। আর পুরুষমন কখনও শাসক, কখনও সহযাত্রী, কখনও দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ হিসেবে উপস্থিত হয়। এই কারণেই আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য আজও “নারীমন বনাম পুরুষমন” আলোচনার এক অমূল্য ভাণ্ডার।
আশাপূর্ণা দেবী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রায় না থাকা সত্ত্বেও, গৃহকোণের অভিজ্ঞতা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি এবং অসাধারণ স্মৃতির জোরে তিনি উপন্যাস, গল্প, কিশোরসাহিত্য, প্রবন্ধ মিলিয়ে প্রায় আড়াইশোরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। আমার মায়ের তিনি সবচেয়ে প্রিয় লেখক। আমার ছোট দিদা জয়া চ্যাটার্জী রোজ একটা করে বই শেষ করতেন। আশাপূর্ণা দেবীর লেখা তিনি প্রায় মুখস্ত বলতে পারতেন! আসলে তাঁরা আশাপূর্ণা দেবীর লেখায় তাঁদের নারীমন সহজে মিল খুঁজে পেত ৷ আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যজগতের কেন্দ্রে রয়েছে নারীজীবন, কিন্তু তিনি কখনও শুধু নারীর প্রশস্তি বা পুরুষের নিন্দা করেননি। বরং নারী ও পুরুষ—উভয়ের মনোজগত, সামাজিক অবস্থান, পারস্পরিক সংঘাত, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও অসহায়তাকে তিনি গভীর মানবিক দৃষ্টিতে বিচার করেছেন।











Be First to Comment