Press "Enter" to skip to content

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় নারীমন ও পুরুষমন চিত্রায়নের স্বরূপ…।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়: কলকাতা, ২৭ জুন, ২০২৬।  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) ঊনবিংশ শতকের বঙ্গসমাজের জটিল দ্বান্দ্বিকতায় নারী ও পুরুষ মনকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর উপন্যাস ও প্রাবন্ধ রচনায় নারীর অবস্থান, পুরুষের কর্তৃত্ব এবং লিঙ্গ সম্পর্কীয় লেখা একাধিক স্তরে চিত্রিত হয়েছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বঙ্কিম consciously স্বীকার করেছেন যে প্রতিটি সমাজেই পুরুষেরাই নারীর আচরণের পথনির্দেশ করে থাকে — “self-interested men are mindful of the improvement of women only to the extent that it furthers their self-interest” । এই উপলব্ধি থেকেই বঙ্কিমের নারী-পুরুষ চরিত্রায়ণের জটিলতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়।

১. নারীর স্বভাব ও অবস্থান: স্থিরতা বনাম পরিবর্তনের দ্বান্দ্বিকতা

১.১ নারীর “স্বভাব” সম্পর্কে বঙ্কিমের প্রশ্ন

বঙ্কিম নারীর অন্তর্নিহিত স্বভাবের ধারণাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একবার তিনি তাঁর ভাই সঞ্জীবচন্দ্র ও বন্ধু দীনবন্ধু মিত্রকে জিজ্ঞাসা করেন — যদি একটি মেয়ে ষোল বছর বনবাসিনী ও কাপালিকের সান্নিধ্যে থেকে বিবাহের পর সমাজে আসে, তাহলে তার চরিত্রে কতখানি পরিবর্তন আসতে পারে? দীনবন্ধু মিত্র নীরব থাকলেও সঞ্জীবচন্দ্র উত্তর দেন — মেয়েটি স্বামী ও সন্তানের সংস্পর্শে ধীরে ধীরে শৈশবের সব কিছু ভুলে যাবে । এই ঘটনা প্রমাণ করে, বঙ্কিম নারীত্বের কোনো “স্থির সারাংশে” বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে পরিবেশ ও অনুশীলনের মাধ্যমেই নারীর চরিত্র গঠিত হয়।

১.২ “পুরাতনী ও নবীনার” দ্বৈত রূপ

বঙ্কিমের বিখ্যাত প্রসঙ্গ “প্রাচীনা ও নবীনা” প্রবন্ধে নারীকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে — প্রাচীনা (ঐতিহ্যবাহী, পতিব্রতা ও ধর্মে নিবেদিতা) ও নবীনা (আধুনিক, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতা)। কিন্তু সমালোচক শর্মিষ্ঠা পাঁজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই দ্বৈত শ্রেণীবিভাগের মধ্যেই বঙ্কিমের “ক্ষতির বোধ” প্রকাশ পায় — প্রাচীনার বিলুপ্তি তিনি মেনে নিতে পারেননি ।

আমার কাছে এই প্রবন্ধের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল শেষে তিনটি কাল্পনিক পত্র — চণ্ডিকাসুন্দরী দেবী, লক্ষ্মীময়ী দেবী ও রসময়ী দাসীর নামে লেখা। এখানে বঙ্কিম স্বয়ং নারীর বেশে আত্মপ্রকাশ করেছেন! এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি সমাজের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে নারীর কণ্ঠস্বর হওয়ার চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় পত্রটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, যেখানে লেখিকা বলেন — স্ত্রী স্বামীর আজ্ঞায় শিক্ষিতা হন, কারণ এটাই “পতিব্রতা” ধর্ম; কিন্তু তারপরেও তাঁদের “অধর্ম” বলে অভিযোগ করা হয় । আমি মনে করি বঙ্কিম বাবুর রচনা বিচার করতে হবে তখনকার সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে।

২. পুরুষমন: উপনিবেশিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত

২.১ পুরুষের “অস্তিত্বগত দুর্বলতা”

 

বঙ্কিমের উপন্যাসগুলির সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হল নারীরাই কর্মের মূল চালিকাশক্তি, অন্যদিকে পুরুষ চরিত্রগুলি প্রায়শই দুর্বল, দ্বিধান্বিত এবং নারীপরামর্শের উপর নির্ভরশীল । উদাহরণস্বরূপ, “বিষবৃক্ষ” বা “কৃষ্ণকান্তের উইল”-এর পুরুষ চরিত্রগুলি নিজেদের সিদ্ধান্তে অস্থির, আর নারী চরিত্রেরাই সংকট মোকাবিলা করে।

২.২ ঔপনিবেশিক আক্রমণে পুরুষত্বের সংকট

ঔপনিবেশিক শাসনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতীয়/হিন্দু পুরুষকে “স্ত্রৈণ” (effeminate) বলে আখ্যায়িত করা হত । বঙ্কিম এই “কলঙ্ক” মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন। তাঁর পুরুষ চরিত্রগুলি — বিশেষ করে শেষ পর্বের উপন্যাসগুলিতে — এই আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, সবার কাছে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের সামনে দুর্বল পুরুষেরা জাতীয় সংস্কৃতির উৎকর্ষতার প্রতীক হিসেবে নারীকেই ব্যবহার করতে চেয়েছেন ।

৩. দুই মনের সংঘাত ও মিলন: চরিত্রের মুখে চিত্রায়ন

৩.১ শান্তি/নবীন (আনন্দমঠ) — যৌনতা ও আনুগত্যের দ্বন্দ্ব

বঙ্কিমের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র শান্তি। “আনন্দমঠ” উপন্যাসে শান্তি নিজেকে নবীন নামক সন্ন্যাসী যোদ্ধা হিসেবে ছদ্মবেশিত করে । সমালোচক মিলারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শান্তির “ট্রান্সনেস” — অর্থাৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লিঙ্গের ভূমিকা অতিক্রম — এখানে একটি অস্থায়ী জাতীয়তাবাদী কৌশলমাত্র । হিন্দু জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য পূরণের পর এই ধরনের লিঙ্গ-পরিবর্তনশীলতার আর প্রয়োজন নেই।

যশোধরা বাগচীর মতে, “শান্তিকে সৃষ্টি করেই বঙ্কিম পত্নীত্বকে আবদ্ধ গার্হস্থ্যের সীমা থেকে মুক্ত করেছেন” । অন্যদিকে পুরুষ চরিত্ররা — মহেন্দ্র, ভবানন্দ — ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যের দ্বন্দ্বে জর্জরিত। বঙ্কিম দেখিয়েছেন, কীভাবে পাবলিক (জাতীয়) ও প্রাইভেট (দাম্পত্য) আনুগত্য একসূত্রে গাঁথা।

৩.২ প্রফুল্ল (দেবী চৌধুরাণী) — নারীর ক্ষমতায়ন বনাম গার্হস্থ্যে প্রত্যাবর্তন

প্রফুল্ল বঙ্কিমের সবচেয়ে জটিল নারীচরিত্র। পরিত্যক্তা ও অসহায় অবস্থা থেকে ভবানী পাঠকের কঠিন তপস্যার মাধ্যমে পাঁচ বছরে দস্যুদলের নেত্রী হয়ে ওঠেন । সমালোচকদের মতে, এই “নতুন নারী” (নিউ ওম্যান) জাতীয়তাবাদী প্রয়োজনে সৃষ্ট — যিনি আধুনিকতার গুণাবলী ধারণ করবেন কিন্তু কখনও নিজের সাংস্কৃতিক মূল (সতীত্ব, ভক্তি, ত্যাগ) হারাবেন না ।

উপন্যাসের শেষাংশে প্রফুল্ল গৃহস্থ জীবনে ফিরে যান। সাগরের প্রশ্ন — “পাঁচ বছর রাজকীয় সিংহাসনে বসার পর আবার ঘরের কাজ করবে?” প্রফুল্লর উত্তর:

“আমি এখানে সেই কাজই করার জন্য এসেছি। কারণ এটাই নারীর যথার্থ জীবন। নারীরা রাজত্ব করার জন্য জন্মায় না। বর্ণিত গার্হস্থ্য জীবনই কঠিন কর্তব্য… এর চেয়ে বড় পুণ্য আর কী আছে? এই ত্যাগই আমি বরণ করতে চাই।”

এই উক্তিতে বঙ্কিমের দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট — নারী চরম ক্ষমতার অধিকারিণী হতে পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে “গার্হস্থ্য জীবনের কঠিন কর্তব্যেই” ফিরতে হবে। পুরুষের জন্য এরকম বাধ্যবাধকতা নেই।

৩.৩ রোহিণী (কৃষ্ণকান্তের উইল) ও কমলাকান্তের ক্ষমাপ্রার্থনা

“কৃষ্ণকান্তের উইল”-এ রোহিণী বিধবা হয়ে গৃহস্থের আশ্রয়ে থেকে কৃষ্ণকান্তের প্রেমে পড়েন। তার প্রতি বঙ্কিমের আচরণ নিষ্ঠুর — তাকে সমাজের চোখে লজ্জিত ও দণ্ডিত হতে হয়। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্ররা আইনের হাতে দণ্ডিত হয় । সমালোচকদের পর্যবেক্ষণ — বঙ্কিম পুরুষ চরিত্রদের বিচারের ভার আইনের ওপর ছেড়ে দেন, কিন্তু নারীদের “ভাগ্যের” ওপর। পুরুষের বিচার হয় আদালতে, নারীর বিচার হয় সমাজের নিষ্ঠুরতায়।

৩.৪ কমলা ও নবকুমার (কপালকুণ্ডলা) — প্রকৃতি বনাম সংস্কার

“কপালকুণ্ডলা”-তে কমলা বনের কাপালিকের কন্যা, প্রকৃতির সন্তান। নবকুমারের সংসারে এসে তিনি সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন। সমালোচকদের বিশ্লেষণে, কমলার ট্র্যাজেডি শুরু হয় যখন তিনি এক রাতে ভাইঝির সংসারিক সুখের জন্য সংগ্রহ করতে বাইরে বেরন। সেখানে তিনি নবকুমারের প্রথম স্ত্রী বেগমের সাথে সাক্ষাৎ করেন — যে বেগম সম্ভবত বাইরের জগতের প্রতিনিধি ।

এই ঘটনায় বঙ্কিম দেখান, নারীর কৌতূহল ও স্নেহপ্রবণতাই (যা গুণ হিসেবে বিবেচ্য) তাকে বিপদে ফেলে। নবকুমারের মনোবিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষ একদিকে চান আদর্শ স্ত্রী (যেমন কমলা) কিন্তু অন্যদিকে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অন্য নারীর সান্নিধ্যও ত্যাগ করেন না।

৪. সমালোচকদের প্রধান পর্যবেক্ষণ

৪.১ পার্থ চট্টোপাধ্যায়: আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্ষেত্র

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বঙ্কিম আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার বস্তুগত কলাকৌশল আয়ত্ত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক সারাংশ ধরে রাখতে চেয়েছিলেন । এই দ্বৈত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে তিনটি দ্বৈততায় বিভক্ত করেন — আধ্যাত্মিক/বস্তুগত, গৃহ/বিশ্ব, নারীসুলভ/পুরুষসুলভ। নারীরা হয়ে ওঠেন আধ্যাত্মিক ও গার্হস্থ্য ক্ষেত্রের প্রতীক, আর পুরুষেরা বস্তুগত ও বৈশ্বিক ক্ষেত্রের ।

৪.২ যশোধরা বাগচী: নতুন নারীর আবির্ভাব

বাগচী দেখান, বঙ্কিমের শেষ পর্বের উপন্যাসগুলিতে নারী চরিত্রগুলি “অভ্যাসের ধর্ম” (অনুশীলন ধর্ম)-এর সফল বাহক । তারা আত্মত্যাগ ও কঠোরতার মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হন। কিন্তু এই ক্ষমতায়ন কখনও পতিব্রতা ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে না। বঙ্কিম পলিগ্যামি প্রথার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ভাষা ব্যবহার করেননি, বরং “দেবী চৌধুরাণী”-তে প্রফুল্ল নিজেই স্বামীকে বলেন — অন্য স্ত্রীদেরও স্বামীর সেবার সুযোগ দেওয়া উচিত ।

৪.৩ মিলার: লিঙ্গ-বিবর্তনের অস্থায়িত্ব

মিলারের মতে, শান্তির নবীন রূপায়ণে বঙ্কিম প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতের লিঙ্গ-তরলতাকে (gender fluidity) ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এই ব্যবহার অস্থায়ী ও কৌশলগত মাত্র। হিন্দু জাতির সুনির্দিষ্ট দ্বৈত লিঙ্গের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে এর প্রয়োজন নেই ।

৪.৪ সুধীর কাকর ও জসবীর জৈন: নিয়ন্ত্রণের পুরুষতান্ত্রিক যন্ত্র

সুধীর কাকরের মতে, ভারতীয় মেয়েদের “ভালো মেয়ে” হতে শেখানো হয় — যার অর্থ সংযম ও ব্রহ্মচর্যের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয় । জসবীর জৈন বলেন, নারীরা “প্রস্তুত-তৈরি ভূমিকায়” নিক্ষিপ্ত — সুরক্ষা-প্রার্থী স্ত্রী, অলৈঙ্গিক বিধবা, অথবা রান্না-ঘর ও পুরুষজগতের সেবাকারিণী ।

উপসংহার:- বঙ্কিমচন্দ্রের নারী-পুরুষ চরিত্রায়ণ একটি সুস্পষ্ট দ্বন্দ্ব প্রকাশ করে। একদিকে তিনি নারীকে অভূতপূর্ব ক্ষমতার অধিকারিণী করেছেন — যিনি দস্যুদলের নেত্রী হতে পারেন (প্রফুল্ল), সন্ন্যাসী যোদ্ধা হতে পারেন (শান্তি) — অন্যদিকে তিনি কখনও পতিব্রতা আদর্শ, গার্হস্থ্য জীবনের প্রতি নারীর “প্রকৃতিগত” টান, এবং পুরুষের বহুবিবাহের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি। জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যের জেরে বঙ্কিমের উত্তর ছিল “নতুন নারী” সৃষ্টি — যিনি বাহ্যিক জগতে প্রবেশ করতে পারবেন কিন্তু শুধুমাত্র আভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক সত্তার শক্তিরূপে। সমালোচকেরা একমত যে বঙ্কিম নারীর প্রতি ন্যায্য হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ঔপনিবেশিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত পুরুষমানস এবং জাতীয় পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজনে তিনি এক অর্ধ-সমাধানেই সন্তুষ্ট ছিলেন।

 

 

More from BooksMore posts in Books »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *