
কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৪ জুলাই, ২০২৬। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই বারবার অভিযোগ, আর্জেন্টিনা নাকি নানা ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে ! বিতর্কের আগুন পুরোপুরি নেভার আগেই নতুন করে আলোচনায় লিওনেল মেসিদের দল ! তবে এবার কোনও রেফারির সিদ্ধান্ত, সূচি বা প্রযুক্তি নয়, চর্চার বিষয় জার্সি ! শুনতে কোন ব্যাপার নয় মনে হলেও,আর্জেন্টিনার কাছে এই জার্সি শুধু পোশাক নয় ! বরং ইতিহাস, বিশ্বাস, আবেগ আর আত্মবিশ্বাসের অদ্ভুত মিশেল !
সূত্রের খবর, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনা ফিফার কাছে একটি বিশেষ আবেদন জানায় ! তাদের অনুরোধ, প্রচলিত আকাশি-সাদা হোম জার্সির বদলে গাঢ় নীল অ্যাওয়ে জার্সি পরে খেলার ইচ্ছে। সেই আবেদন মঞ্জুরও করেছে ফিফা। ফলে বুধবার গভীর রাতে সেমিফাইনালে পরিচিত নীল-সাদা ডোরাকাটা জার্সিতে নয়, বরং গাঢ় নীল পোশাকেই মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ও সতীর্থরা।
এখন প্রশ্ন, একটি জার্সি নিয়ে এত আলোচনা কেন ! আসলে তার পিছনে ইতিহাসের এক দীর্ঘ ছায়া ! ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের মঞ্চে গাঢ় নীল জার্সি আর্জেন্টিনার কাছে সৌভাগ্যের প্রতীক। ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে আজও অমলিন ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল। দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল এবং পরে শতাব্দীর সেরা গোল দুটি ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী ! সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা তাদের পরিচিত নীল-সাদা জার্সিতে খেলেনি। মারাদোনারা মাঠে নামেন গাঢ় নীল জার্সি পরে।সেই ম্যাচেই ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইতিহাস আর্জেন্টিনার।
শুধু ১৯৮৬-তেই নয়, ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নকআউট ম্যাচে আর্জেন্টিনা গাঢ় নীল জার্সিতেই খেলে। সেই ম্যাচেও জয় আর্জেন্টিনার। অন্যদিকে, ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে হারাল, তখন আর্জেন্টিনার গায়ে চেনা নীল-সাদা হোম জার্সি। এই পরিসংখ্যানই আর্জেন্টিনার ফুটবলমহলে একটি বিশেষ বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে !
আর্জেন্টিনায় এই ধরনের বিশ্বাসের একটি আলাদা নামও রয়েছে, ‘কাবালা’। এটি এক ধরনের কুসংস্কার বা সৌভাগ্যের বিশ্বাস, খেলাধুলার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িয়ে। অনেক ফুটবলারই মনে করেন, কোনও নির্দিষ্ট পোশাক, নির্দিষ্ট রুটিন বা নির্দিষ্ট অভ্যাস তাঁদের সাফল্য এনে দেয়। আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতেও ‘কাবালা’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গাঢ় নীল অ্যাওয়ে জার্সি পরে খেললে ভাগ্য তাঁদের পক্ষেই থাকে, এমন বিশ্বাস বহুদিনের।
এবারও তাই ফিফার কাছে বিশেষ আবেদন। নিয়ম মেনে ফিফা আবেদন মঞ্জুরও করেছে। ফলে সেমিফাইনালে গাঢ় নীল জার্সিতেই মাঠে নামবে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অনেকের মতে, এটি শুধু পোশাক পরিবর্তন নয়, প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ তৈরির এক কৌশলও। কারণ ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের মনেও জার্সি কাঁটা খচখচ করবেই। তাই অনেকেই এই জার্সিকে আর্জেন্টিনার ‘মগজাস্ত্র’ বলেই উল্লেখ করছেন।
বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মোট পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে। তার মধ্যে তিনটি ম্যাচ ছিল নকআউটে। এবার চতুর্থ নকআউট লড়াই। দুই দেশের ফুটবল-প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইতিহাস, আবেগ, রাজনৈতিক অতীত এবং ফুটবলীয় অহংকার, সব মিলিয়ে এই ম্যাচের গুরুত্ব অন্য মাত্রায়।
এখন দেখার, শেষ পর্যন্ত মাঠে কে জেতে ! গাঢ় নীল জার্সি কি আবারও আর্জেন্টিনার ভাগ্য বদলে দেবে, নাকি ইংল্যান্ড ভেঙ্গে দেবে সেই বহু বছরের ‘কাবালা’? উত্তর মিলবে সেমিফাইনালের ৯০ মিনিটেই।











Be First to Comment