জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য :-
প্রবীর রায় : প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। কলকাতা, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। এখন এই নিস্তরঙ্গ জীবনে কায়িক সক্রিয়তা অনেকাংশেই কমেছে- সঙ্গত কারণেই। অফুরন্ত অবসরে এখন শুধু স্মৃতির সরণী দিয়েই আসা যাওয়া। সে পথ জুড়ে আলো ছায়ার খেলা। শারিরীক অসুস্থতা স্মরণশক্তিকেও দূর্বল করেছে অনেক খানি। তবু কতো কিছু যে মনে পড়ে।
সকাল থেকে ফেসবুকে পোস্ট দেখছিলাম স্বনামধন্য অভিনেতা, নাট্যকার অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়কে নিয়ে। আজ তাঁর জন্মদিন। নানা লেখা… সে সব পড়তে পড়তে কতো পুরনো কথা মনে পড়ছিল। ভাবলাম ওঁকে নিয়ে দু-চার কথা লিখি।
অজিতেশদার সঙ্গে প্রথম আলাপ নব্যেন্দুদার (নব্যেন্দু চ্যাটার্জী) টালা পার্কের বাড়িতে। সেখানে বিশেষ কথাবার্তা হয়নি, আরো অনেকেই ছিলেন। “আজ কাল পরশুর গল্প” নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। তার আগে অবশ্য আমি অজিতেশদার “শের আফগান” আর “মঞ্জরী আমের মঞ্জরী” দেখেছি। ভালো করে পরিচয় হয় বোলপুরে “আজ কাল পরশুর গল্পের” শুটের সময়। অসম্ভব শিক্ষিত, বিদেশী নাটক নিয়ে প্রচুর চর্চা করা এক মানুষ। অসম্ভব ভালো গল্প করতে পারতেন আর বাজখাই গলায় সেই হাসি। শুটের সময় ছোট খাটো জিনিস অনেক কিছু শিখেছি ওনার কাছে।
একটা ছোট্ট ঘটনা বলি আমার একটা শট ছিল ভোর বেলা গ্রামের একটা কালভার্টের উপর বসে নিমডাল মুখে দিয়ে বসে আছি। দুটো পা ঝুলিয়ে বসেছিলাম। অজিতেশ দা বললেন, “প্রবীর, একটা সাজেশন দেব, যদি কিছু মনে না করো?” আমি বললাম, “আরে এই রকম বলছেন কেন? প্লিজ বলুন।“ বললেন “তুমি তো একদম গ্রামের ছেলে, সকালে নিমডাল মুখে দিয়ে বসে আছো, মানে দাঁত মাজছো। যদি পা দুটো না ঝুলিয়ে বসে, কালভার্টের উপর উঠে উবু হয়ে বসো, তাহলে বোধহয় চরিত্রটা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাই না ?” Pose and Posture অভিনয়ের একটা বিশেষ অংশ।
এই রকম অনেক ছোটোখাটো পরামর্শ দিতেন সেই সময় উনি যাত্রাতে গেছেন। বোলপুর থেকে সোজা শো করতে যাওয়ার কথা। যেদিন উনি চলে যাচ্ছেন, আমাকে বললেন “প্রবীর চলো আমাকে স্টেশনে ছেড়ে আসবে !” আমরা যখন পৌছলাম স্টেশনে, তখনও ট্রেন আসেনি। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অনেক গল্প করলেন, কেন উনি যাত্রাতে গেছেন ইত্যাদি। বললেন, “আমার যাওয়ার একদম ইচ্ছে ছিলোনা , কিন্তু বাধ্য হয়ে যেতে হলো, টাকার জন্য। টাকার খুব দরকার।“ আজ ভাবি এখনকার অভিনেতা, অভিনেত্রীদের কথা আর এঁদের কথা। এত বড় অভিনেতা, নাট্য পরিচালক, প্রযোজক বাধ্য হয় যাত্রাতে গেলেন। অজিতেশদা চলে যাওয়ার পর খুব বিষন্ন মনে টুরিস্ট লজে ফিরে এলাম। 
এর পর অজিতেশদার সঙ্গে দেখা “আজ কাল পরশুর গল্পের” ডাবিং এ ইন্ডিয়া ফিল্ম ল্যাবরেটারিতে। সেদিন উনি আমার অভিনয়ের খুব প্রশংসা করলেন। নব্যেন্দুদাকেও বললেন। বেশ চলছিল ডাবিং। হঠাৎ খবর এলো বড়বাবু (উত্তমকুমার) আসছেন, ওনার একটা ফিল্মের প্রজেক্শনের জন্য। মেহতাজী (ইন্ডিয়া ফিল্ম ল্যাবরোটারির একজন ডিরেক্টর) নব্যেন্দুদাকে বললেন একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে সেদিন। সেদিন দীপঙ্করও (দীপঙ্কর দে) ছিল ডাবিংয়ে। উত্তমদা আসছেন শুনে, “আমি চললাম” বলে ও চলে গেলো। আসলে সেই সময় “বাঞ্ছারামের বাগান” নিয়ে একটা সমস্যা চলছিল। যাই হোক, ডাবিং হয়ে যাওয়ার পর অজিতেশদা আমাকে আর নব্যেন্দুদাকে ওনার বাড়িতে গিয়ে আড্ডা মারার আমন্ত্রণ জানালেন। উনি থাকতেন বেলেঘাটাতে। আমরা অজিতেশদার সঙ্গে ওনার বাড়িতে গেলাম। ওনার বেডরুমে মাটিতে বসে আড্ডা শুরু হলো। ঘরের চারিদিকে কাবার্ডে বার্নার্ড শ, শেক্সপীয়ার, ব্রেখট, ইবসেন থেকে শুরু করে বিখ্যাত সব নাট্যকারের বই। ওঁর বাড়ির ঠিক নিচেই একটা মিষ্টির দোকান ছিল, ওখান থেকে মিষ্টি অর্ডার দিলেন সঙ্গে সিঙ্গারা। বৌদি চা দিয়ে গেলেন। অজিতেশদা ভীষণ মিষ্টি খেতে ভালোবাসতেন, কিন্তু খাওয়া বারণ। হাই সুগার। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বৌদি বকাবকি করে যাচ্ছেন আর অজিতেশদা খেয়েই যাচ্ছেন। সেই অজিতেশদার সঙ্গে শেষ দেখা। হাই সুগারের কারণেই, মাত্র ৫০ বছর বয়েসে চলে যান না ফেরার দেশে।
ওই সব টুকরো টুকরো স্মৃতি ধরা আছে আমার লেখা “স্মৃতির অলিন্দে একাকী” বইটিতে…
জন্মদিনে আমার আনত প্রণাম।















Be First to Comment