Press "Enter" to skip to content

আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ফুটবল খেলা মানেই ফুটবল মাঠের যুদ্ধ… !

মাঠ না ফকল্যান্ড ! দখল আর্জেন্টিনার

আর্জেন্টিনা ২ (এনজো ফার্নান্দেজ (প্রায় ৮৫’)। লাউতারো মার্টিনেজ (শেষ মুহূর্ত)

ইংল্যান্ড ১ (অ্যান্থনি গর্ডন (৫৫’))

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৬ জুলাই, ২০২৬। পুরো ১৯৮২ র ফকল্যান্ড যুদ্ধ ! তবে সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনা সেনাবাহিনীর হার হয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে ! তখন থেকেই আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ফুটবল খেলা মানেই ফুটবল মাঠের যুদ্ধ ! কালও তাই ! তবে ইংল্যান্ডকে মনে করিয়ে দিল আর্জেন্টিনা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে জেতার নাম ফুটবল ! শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত হার মানার প্রশ্ন নেই।

বিশেষ করে মেসির মত প্লেয়ার বিপক্ষে থাকলে ম্যাচ যে কোন সময় পাল্টে দিয়ে উল্টে দিতে পারে ! এই বিশ্বাস, এই আত্মবিশ্বাস আর অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতার জোরে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা।

আটলান্টা স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, দুই দলই কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। প্রথম থেকেই সৌন্দর্যের বদলে প্রবল শারীরিক লড়াই। বলের থেকেও বেশি গুরুত্ব প্রতিপক্ষকে আটকে রাখায়। ধস্তাধস্তির একশেষ ! একসময় মনে হল ফুটবল ম্যাচ নয়, যুদ্ধক্ষেত্র। প্রথমার্ধ শেষে সেই ছবিটাই স্পষ্ট পরিসংখ্যানে। ইংল্যান্ড করে ৭টি ফাউল, আর আর্জেন্টিনা ১২টি। এই সংখ্যাই বলে দিচ্ছিল, কতটা রুক্ষ প্রথম ৪৫ মিনিট।

মাঠে লিওনেল মেসির মতো এক জাদুকর থাকলেও প্রথমার্ধে তাঁকে কার্যত খেলতেই দেওয়া হয়নি। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। ম্যাচের আগের সাংবাদিক বৈঠকেই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মেসিকে আটকাতে কী বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে? সেই উত্তর মাঠেই দিলেন তিনি। এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে প্রায় ছায়ার মতো মেসির সঙ্গে লেগে থাকতে দেখা যায়। একসময় এই সব মার্কিংকে স্রেফ ডজ করে বার হয়ে যেতেন। এখন ঘাটতি পড়ে। তবে বয়স বাড়লেও তাঁর জাদু পুরোপুরি হারায়নি। কয়েকবার প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বেরিয়েও যান। কিন্তু চারপাশে এত চাপ, শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের মতো জায়গা তৈরি করতে পারেননি।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও বুঝেছিলেন, ইংল্যান্ডকে নিজেদের ছন্দে খেলতে দিলে বিপদ হতে পারে। তাই তিনি কৌশলে বদল আনেন। রড্রিগো ডি’পলের বদলে ডানদিকে খেলান গিউলিয়ানো সিমিওনেকে। বাবার মতোই লড়াকু মানসিকতা নিয়ে তিনি মাঠে নেমে ইংল্যান্ডের আক্রমণ ভাঙ্গতে ব্যস্ত ছিলেন। ডি’পলের মতোই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার কাজ করেছেন, তবে আরও দ্রুত গতিতে। এর ফলে মাঝমাঠে ইংল্যান্ড খুব একটা জায়গা পায়নি। বিশেষ করে জুড বেলিংহ্যামদের কার্যত আটকে রাখে আর্জেন্টিনার সংগঠিত রক্ষণ।

তবে ইংল্যান্ডের দল নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বুকেয়ো সাকা কিংবা ননি মাদুয়েকের মতো ফুটবলারদের রেখে কেন প্রথম একাদশে মর্গান রজার্সকে খেলানো হল, সেই প্রশ্নের উত্তর টুখেলই দিতে পারবেন। প্রথমার্ধে দুই দলই গোলমুখে তেমন সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। ইংল্যান্ডের গোল লক্ষ্য করে মাত্র একটি শট ! মাঝমাঠেই বল ঘুরেছে বেশি। একের পর এক ফাউল, দুটি হলুদ কার্ড এবং প্রচুর ধস্তাধস্তির মধ্যেই শেষ প্রথম ৪৫ মিনিট।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ম্যাচের চেহারা বদলে যায়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের শুরুটা আর্জেন্টিনার একটি বড় ভুল থেকে। ৫৫ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের বাজে ক্লিয়ারেন্স এবং অফসাইড ট্র্যাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ কাজে লাগায় ইংল্যান্ড। মুহূর্তের মধ্যে বক্সে উঠে আসে ক্রস। সেখানে একেবারে ফাঁকা জায়গায় থাকা অ্যান্থনি গর্ডন সহজেই বল জালে জড়িয়ে দেন। নাহুয়েল মোলিনাও তাঁকে আটকানোর মতো কভার দিতে পারেননি। ১-০ গোলে এগিয়ে ইংল্যান্ড।

গোল পাওয়ার পরই টমাস টুখেল আরও রক্ষণাত্মক ! পুরো দলকে প্রায় নিজেদের বক্সের সামনে নামিয়ে এনে রক্ষণে তালা ঝুলিয়ে দেন। একের পর এক ইংরেজ ফুটবলার মিলে তৈরি করেন মানবপ্রাচীর। আর্জেন্টিনা আক্রমণ চালালেও সেই প্রাচীর ভাঙ্গা সহজ ছিল না। অনেকের মনে তখন হয়তো ফিরে আসছিল অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার কথা। এমন কঠিন ম্যাচে তাঁর অভাব অনুভূত হচ্ছিল। তবে এই আর্জেন্টিনা কেবল একজনের দল নয়। এটি গোটা দলের লড়াই।

গোল শোধের মরিয়া চেষ্টায় একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে আর্জেন্টিনা। ৬৮ মিনিটে নিকো গঞ্জালেজের দুর্দান্ত হেড অসাধারণ ঝাঁপিয়ে বাঁচিয়ে দেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। ৭৫ মিনিটে আরেকটি সুযোগ অল্পের জন্য বারে লেগে ফিরে আসে। ৮৪ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ দূরপাল্লার শটে গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও সফল হতে পারেননি। তবু আর্জেন্টিনা হাল ছাড়েনি। একের পর এক আক্রমণে তখন ইংল্যান্ডের রক্ষণ দুলতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠছিল, আর কতক্ষণ এই চাপ সামলাতে পারবে ইংল্যান্ড?

অবশেষে উত্তর কিছুক্ষণের মধ্যেই। হঠাৎই মাঝমাঠ থেকে বুলেট শট। এনজো ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত দূরপাল্লার সেই শটে জালের ঠিকানা খুঁজে নেয় বল। মুহূর্তের মধ্যে গর্জে ওঠে আটলান্টা স্টেডিয়াম। উল্লাসে ফেটে পড়েন বিশ্বের কোটি কোটি আর্জেন্টিনার সমর্থক। স্কোরলাইন তখন ১-১। ম্যাচ আবার নতুন করে শুরু !

সমতা ফেরানোর পর আর থামেনি আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আক্রমণের পর আক্রমণ স্কালোনির দলের। আর সেই চাপের ফল ম্যাচের একেবারে অন্তিম লগ্নে। দুর্দান্ত একটি আক্রমণ থেকে ভেসে আসা বলকে নিখুঁত হেডে জালে পাঠিয়ে দেন লাউতারো মার্টিনেজ। মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ ইংল্যান্ড। অন্যদিকে আনন্দে আত্মহারা আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও সমর্থকেরা।

শেষ বাঁশি বাজতেই নিশ্চিত, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ! ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ! এই জয় শুধু স্কোরলাইনের জয় নয়। এটি ছিল অদম্য মানসিকতার জয়, শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রাখার জয়, আর প্রমাণ করে দেওয়ার জয় ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনও লড়াই শেষ হয় না। মাঠে মেসির নেতৃত্ব, দলের সম্মিলিত লড়াই এবং শেষ মুহূর্তের অদম্য সাহসই আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনাকে এনে দিল ফাইনালের টিকিট।

তবে টমাস টুখেল এতটা রক্ষণাত্মক না হলে, আর্জেন্টিনা হয়ত আরও চাপে থাকত। অন্তত হ্যারি কেন এবং বেলিংহ্যাম ওপরে থাকলেও বাড়ত চাপ। পরে হয়ত টমাস ভাববেন এই নিয়ে। তবে গতস্য শোচনা নাস্তি। এখন বাস্তব স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনাল।

More from SportsMore posts in Sports »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *