এ তো নেপোলিয়নের সৈন্যদল !
ফ্রান্স ২ (এমবাপে, দেম্বেলে)। মরক্কো ০
কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১০ জুলাই, ২০২৬। চার বছরে বদলেছে অনেক কিছু ! ফ্রান্স ও মরক্কোর রাজনৈতিক সম্পর্কও নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী। অভিবাসন নীতি নিয়ে ফ্রান্সের কঠোর অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির আবহ তৈরি করেছিল। আবার পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে সমর্থন জানিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নতুন করে সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা করেন। ফলে ফুটবল মাঠে ফ্রান্স ও মরক্কোর মুখোমুখি লড়াই শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘ পোস্ট-কলোনিয়াল ইতিহাসেরও এক প্রতীকী অধ্যায়।
ফ্রান্স মরক্কোর রাজনৈতিক এত উত্থান পতন, কিন্তু ফুটবল মাঠে ফ্রান্স এখনও বাস্তিল দুর্গ ! অন্তত চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপেও মরক্কোর গাট, এবারও তাই !
তাই সেই আবেগ, অসমাপ্ত হিসাব আর প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়েই মাঠে নেমেছিল ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’। ইয়াসিন বোনো, আশরাফ হাকিমিরা চেয়েছিলেন চার বছর আগের দুঃখ ভুলিয়ে নতুন ইতিহাস লিখতে। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও বড় নির্মম! ভাগ্যের অদৃশ্য জাদুবাক্সে এদিনও জমা, মরক্কোর পরাজয়ের আরেকটি চিরকুট। বদলার ম্যাচে সফল হতে পারল না তারা। কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের জোড়া আঘাত, ২-০ এ জিতে সেমিফাইনালে ফ্রান্স।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণের রাশ দিদিয়ের দেশঁর দলের হাতে। এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং দেজিরে দুয়ের একের পর এক আক্রমণ ! ফরাসি ফুটবলারদের গতি, পাসিং এবং আক্রমণের ধার শুরু থেকেই মরক্কোর রক্ষণকে চাপে ফেলে দেয়। তবে প্রতিবারই শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো। দুরন্ত সব সেভ করে তিনি একাই কুম্ভ ! তাঁর অসাধারণ গোলকিপিং বারবার হতাশ করে ফ্রান্সকে !
২৫ মিনিটে ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগ। আশরাফ হাকিমির কাছ থেকে বল কেড়ে এমবাপেকে পাস বাড়ান দেজিরে দুয়ে। দ্রুত গতিতে মরক্কোর বক্সে ঢুকতেই তাঁকে ফাউল নৌসের মাজরাউইর। সঙ্গে সঙ্গে রেফারির পেনাল্টির বাঁশি। সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় প্রায় তিন মিনিট ধরে ভিএআর রিপ্লে দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টির সিদ্ধান্তই বহাল। কিন্তু এমবাপের দুর্বল শট অসাধারণ দক্ষতায় আটকে দেন ইয়াসিন বোনো। সেই মুহূর্তে মনে হল, ভাগ্য কি তাহলে আজ মরক্কোর দিকে !
পেনাল্টি মিসের পরও আক্রমণের গতি কমায়নি ফ্রান্স। দেম্বেলের একাধিক শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট। দেজিরে দুয়ের শক্তিশালী শটও বাঁচিয়ে দেন বোনো। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে লুকাস ডিগনের দূরপাল্লার জোরালো শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। অন্যদিকে, কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবল খেলছিল মরক্কো। ব্রাহিম দিয়াজ কয়েকবার আক্রমণ গড়ে তুললেও ফরাসি রক্ষণ ভাঙ্গতে পারেননি। ডিফেন্সে উইলিয়াম সালিবা ছিলেন প্রায় দুর্ভেদ্য প্রাচীর। প্রথমার্ধের শেষ দিকে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ফ্রি-কিক পেলেও আশরাফ হাকিমির শট লক্ষ্যে থাকেনি। পুরো প্রথমার্ধে বলের দখল ছিল ফ্রান্সের ৬৩ শতাংশ। এত আক্রমণ, এত সুযোগ তৈরি করেও গোল না হওয়ায় বিরতিতে গোলশূন্য অবস্থায় মাঠ ছাড়ে দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও আগ্রাসী রূপে ফিরে আসে ফ্রান্স। বিরতির পর শুরু থেকেই আক্রমণের ঝাঁজ বাড়িয়ে দেয় ‘লে ব্লুজ’। মরক্কোর রক্ষণও ধীরে ধীরে চাপে পড়তে থাকে। অবশেষে ৬০ মিনিটে সেই প্রতীক্ষার অবসান। তিনজন মরক্কো ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁক খাওয়ানো শট, বল জালে জড়িয়ে দেন কিলিয়ান এমবাপে। চলতি বিশ্বকাপে এটি তাঁর অষ্টম গোল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব মিলিয়ে ২০ বার স্কোরশিটে নাম লেখালেন এই ফরাসি সুপারস্টার।
প্রথম গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আরও একবার আঘাত হানে ফ্রান্স। ৬৬ মিনিটে মাইকেল অলিসের নিখুঁত পাস থেকে এমবাপে অসাধারণ ওয়ান-টাচ সেট-আপ করে দেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিচু শট, বল জালে, ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। চলতি বিশ্বকাপে এটি তাঁর পঞ্চম গোল। মাত্র ছয় মিনিটের মধ্যে দুই গোল, ম্যাচের ভাগ্যে স্ট্যাম্প করে দিল ফরাসিরা।
৭৭ মিনিটে এমবাপেকে তুলে নেন কোচ দিদিয়ের দেশঁ। সামনে সেমিফাইনালের লড়াই, তাই কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। এরপর মরক্কো আক্রমণে ঝাঁপালেও গোলের দেখা পায়নি। আশরাফ হাকিমি, আজেদিন উনাহি এবং এল আইনাউই শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়েও ফরাসি রক্ষণ ভাঙ্গতে ব্যর্থ। তবে একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে—ইয়াসিন বোনো না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হত। তাঁর একের পর এক দুরন্ত সেভই মরক্কোকে বড় লজ্জার হাত থেকে বাঁচাল !
শেষ পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স। চার বছর আগের মতো এবারও মরক্কোর স্বপ্নভঙ্গের কারণ তারাই। ২০২২ এর কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের রেজাল্ট এবারও ! ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ! কোয়ার্টার ফাইনালে দাপুটে ফুটবল, এমবাপেরা বুঝিয়ে দিলেন শিরোপার লড়াইয়ে তাঁরা এখনও অন্যতম বড় দাবিদার। এখন প্রশ্ন একটাই, দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ফ্রান্সকে থামাবে কে ? সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন অথবা বেলজিয়াম। তাই ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা, নেপোলিয়নের বাহিনী বিশ্বজয় করবে ? নাকি ওয়াটারলুর যুদ্ধের মত মুখ থুবড়ে পড়বে !











Be First to Comment