কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৮ জুলাই, ২০২৬। মেসি নেইমার রোনাল্ডোর মত মহীরুহ মাঠে থাকলে আলোটা শেষ পর্যন্ত তাঁরাই টেনে নেন ! ইতিহাসও বারবার সেই গল্পই শোনায়। কিন্তু মঙ্গলবারের ম্যাচের হেরো দল নিজেদের ফুটবল, লড়াই আর সাহস দিয়ে কোটি কোটি মানুষের মন জিতে নিল। সেই দলটির নাম মিশর। দিনের শেষে হয়ত স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ! স্কোরবোর্ড মনে রাখবে মেসির নেতৃত্বে অসম্ভবকে সম্ভব করার কাহিনী ! তাই তো নেভিল কারডাস বলেছিলেন, স্কোরবোর্ড হল গাধা ! কিন্তু গোটা ম্যাচ দেখা দর্শকরা জানেন, এই ম্যাচে মিশর এমন এক ফুটবল খেলল, সেখানে চোখ সরান বা ভুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব !
সত্যিই, শেষ মুহূর্তের মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন না ঘটলে, দিনের নায়ক আরেকজন মহম্মদ সালাহ ! কিংবা, ম্যাচের ৫৮ মিনিটের গোলটি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সিদ্ধান্তে বাতিল না হলে, আজ সম্পূর্ণ অন্য গল্প লিখতে হত। তাহলে সেটি হয়ে উঠত মিশরের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় সন্ধ্যা। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও নির্মম। কয়েক সেকেন্ডের একটি সিদ্ধান্ত, একটি বাঁশি সব শেষ ! কায়াহীনের কাহিনী তো অনেক সাফল্যের পেছনেই লুকিয়ে থাকে, এই ম্যাচও কি সেই রকম !
মঙ্গলবারের ম্যাচে প্রথম কয়েক মিনিট বাদ দিলে গোটা প্রথমার্ধ জুড়েই নিখুঁত পরিকল্পনায় খেলেছে মিশর। স্বাভাবিক, আর্জেন্টিনা বারবার আক্রমণে উঠবে। কিন্তু আক্রমণ সামলে দ্রুত প্রতি আক্রমণ, প্রতিপক্ষকে আঘাত তার এক অসাধারণ উদাহরণ কালকের মিশরের ফুটবল ! শুধু প্রথমার্ধ নয়, ম্যাচের প্রায় সত্তর মিনিট পর্যন্ত একই ছন্দে খেলেছে তারা। তাঁদের আত্মবিশ্বাস, গতি, পাসিং, রক্ষণ—সবকিছুই ছিল চোখে পড়ার মতো ! মনে হচ্ছিল, বহুদিনের অপেক্ষার পর বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে নেমেছে ফ্যারাওদের দেশ।
ম্যাচের ১৫ মিনিটে সেই পরিশ্রমের প্রথম পুরস্কার আসে। দুর্দান্ত একটি আক্রমণ, ইয়াসের ইব্রাহিম বল জালে জড়িয়ে মিশরকে এগিয়ে দেন। গোলের পর তাঁদের আত্মবিশ্বাস আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা ! তবে আসল নাটক দ্বিতীয়ার্ধে !
৫৮ মিনিটে মিশরের আগুনে আক্রমণ, ফুটবলপ্রেমীদের বহুদিন মনে রাখার মত ! মাঝমাঠ থেকে হাসিম হাসান অসাধারণ দক্ষতায় পরপর দুই আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে কাটিয়ে এগিয়ে যান। তারপর নিখুঁতভাবে বল তুলে দেন মহম্মদ সালাহর দিকে। সালাহর ডান দিক দিয়ে দৌড়, তারপরেই বক্সের ভিতর নিঁখুত পাস মোস্তফা জিকোর দিকে। সুযোগ নষ্ট করেননি জিকো। অসহায় এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ! বল জালে ! গ্যালারির অল্প কয়েকজন মিশরীয় সাপোর্টার আনন্দে আত্মহারা। মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের আরেকটি অঘটন ঘটে গেল ! মিশর এগিয়ে ২-০ এ !
কিন্তু ফুটবলের নিষ্ঠুর মোচড় ঠিক তখনই ! ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি রেফারিকে গোলটি পুনরায় দেখতে বলেন। রিপ্লেতে দেখা যায়, গোল হওয়ার ঠিক আগে মারওয়ান আত্তিয়ার পা লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ের ওপর উঠে গিয়েছিল। সেই ঘটনাকে ফাউল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর গোল বাতিল রেফারির। কয়েক সেকেন্ড আগেও স্কোরলাইন ২-০, মুহূর্তে তা ১-০-তে। আনন্দ উচ্ছ্বাস বদলে গেল স্তব্ধতায় !
তবু হাল ছাড়েনি মিশর। মাত্র ন’মিনিট পর আবারও গোল, এবার দুই গোলের ব্যবধান ! তখনও মনে হচ্ছে, আবার কি অন্য ইতিহাস আজ ! কিন্তু ফুটবল শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত শেষ হয় না ! শেষ কয়েক মিনিটে আর্জেন্টিনার আক্রমণের ঝড় ! ভেঙ্গে পড়ল মিশরের রক্ষণ ! চাপ সামলাতে না পেরে সেই লিড ধরে রাখতে পারল না। অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনে ম্যাচ জিতল আর্জেন্টিনা !
তবু চোনামার্কা প্রশ্নটা থেকে যাবে। ৫৮ মিনিটের সেই গোলটি বাতিল না হলে কি হত ? স্কোরলাইন সত্যিই ২-০ হয়ে গেলে ? কি ম্যাচের ছবি কি তাহলে বদলে যেত ? উত্তর অজানা। কিন্তু মুহূর্তটা শুধু মিশরের নয়, দুনিয়ার তাবড় ফুটবলপ্রেমীদের মনে বহুদিন কাঁটার মতো বিঁধবে।
তবে এই হারেও মিশরকে কুর্নিশ ! অসাধারণ ফুটবল খেলল ! তাঁদের দৌড়, লড়াই, আত্মবিশ্বাস, দলগত বোঝাপড়া সব মিলিয়ে এক কমপ্লিট প্যাকেজ, চোখ ফেরাতে পারিনি। প্রতিটি আক্রমণে সমর্থকদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই ম্যাচ বুকের ভেতর জমে থাকা স্বপ্নের লড়াই ! কখনও মনে হচ্ছিল, ইতিহাস হাতছানি ! আজ হয়তো সত্যিই নতুন এক অধ্যায় লেখা হবে। অন্তত দ্বিতীয়ার্ধের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত। তারপরেই কেমন যেন উল্টে গিয়ে সব পাল্টে গেল !
জার্মানি, ব্রাজিল, পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলগুলো আগেই বিদায় নিয়েছে। তাই মিশর যখন দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন বুকের ভেতর অজান্তেই ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এবার কি আরেক মহাশক্তির পতন ! স্বপ্নটা আরও একটু বাঁচলে কেমন হয় ! গলিয়াথ বনাম লিলিপুটের লড়াইর ! কিন্তু, সব মহাশক্তি পরপর বিদায় নিলে বিশ্বকাপের আকর্ষণও তো ফুঁস ! তাই কি নিয়তি কেন বাধ্যতে !
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল মিশর। মহম্মদ সালাহরও হয়ত শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ ! ৩৪ বছরের সুপারস্টার, তাঁর পায়ের জাদুতে বছরের পর বছর মন্ত্রমুগ্ধ ফ্যারাওয়ের দেশ ! শেষে মাঠ ছাড়লেন চোখে জল আর বুকভরা আক্ষেপ নিয়ে। অথচ আজকের দিনটা তাঁরও হতে পারত। সমস্ত শিরোনাম, সমস্ত প্রশংসা, সমস্ত আলো যেত তাঁর দিকেই ! কিন্তু ফুটবলে অনেক সময় নায়ক বদলে যায় !
এই হারে তাঁদের মাথা নত হয়নি। বরং প্রমাণ করে দিল, কখনো কখনো পরাজিতরাই বেশি সম্মান কুড়িয়ে নেয়। আজ মিশর ট্রফি জেতেনি, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের অগাধ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত কুর্নিশ তাঁরা নিঃসন্দেহে জিতে নিয়েছে।
একটা নিরীহ প্রশ্ন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে, মিশরের ক্যানসেল হওয়া দ্বিতীয় গোল নিয়ে। ভিএআর বলার পরেও, এতক্ষণ ধরে আলোচনা পর্যালোচনা হলে, একটু তো সমালোচনা হতেই পারে, নাকি ? তাছাড়া ফুটবলকে বলা হয়, বডি কন্টাক্ট গেম ! তবু মাঝে মাঝে মিশরের কুলোর বাতাসেও রেফারির পিঁ পিঁ ! মিশরের ফাউল, ফ্রিকিক আর্জেন্টিনার ! কেমন যেন এক গামলা দুধে বোতল কয়েক চোনার মত !











Be First to Comment