“স্নানযাত্রা”
(জগৎপতি শ্রীজগন্নাথদেবের শ্রীচরণে নিবেদিত)
ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা।
জয় জয় জগন্নাথ, নীলাচলের নাথ,
করুণাধারায় ভাসাও আজি বিশ্বজীবের সাথ।
দীন-দুঃখী, পতিত-পাবন, অনাথের তুমি প্রাণ,
তোমার কৃপায় ফুটে ওঠে ভক্তির খেলা ।
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা, পুণ্যতিথি, শুভ্র প্রভাত বেলা,
স্বর্গ-মর্ত্য একাকার আজ, আনন্দেরই মেলা।
শঙ্খ-ঘণ্টা, বেদমন্ত্রে মুখর চারিধার,
দেব-ঋষিরা নেমে আসে করাতে তোমায় স্নান।
শত-আটটি সোনার কলস, গঙ্গাজলের ধারা,
চন্দন-অগুরু-কর্পূরের সুগন্ধে দিকহারা।
সেই অমৃতজলধারায় ভিজে প্রভুর অঙ্গ,
ভক্তের চোখে প্রেমের অশ্রু—ধন্য হয় এ সঙ্গ।
হে জগন্নাথ! বিশ্বপতি! সবার আপনজন,
তোমায় ঘিরে মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, সন্তানেরই মন।
ভক্তের প্রেমে ঈশ্বর তুমি মানবলীলা করো,
তাই তো জ্বরে কাতর হয়ে ভালোবাসার দ্বারে ধরো।
স্নানশেষে জ্বর যে আসে—সেও তোমার লীলা,
ভক্ত হৃদয় ভরে ওঠে সেবার অমৃতশীলা।
দয়িতাপতি সেবকগণ স্নেহে করে সেবা,
পাচন, ফল আর মিষ্টান্নে পূর্ণ করে ডাবা।
পনেরো দিন অন্তরালে নিরোধনের ঘরে,
ভক্ত কাঁদে—”প্রভু কোথায়?” অশ্রু ঝরে ঝরে।
আলর্নাথের দিব্যরূপে দাও তখন দর্শন,
করুণাময়! পূর্ণ করো কোটি ভক্তের মন।
গণেশবেশে গজানন রূপে অপূর্ব শোভা পাও,
ভক্ত গণপতির সাধ মিটিয়ে কৃপাধারা দাও।
বলভদ্র গজবেশে, সুভদ্রা পদ্মময়ী,
দেখে সেই রূপ, প্রেমসাগরে ভাসে ধরাধামই।
স্নানযাত্রা রথের আগের শুভ আগমনী গান,
শুনে জেগে ওঠে জগৎজোড়া কোটি ভক্তপ্রাণ।
“রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে”—
শাস্ত্রবাণী ধ্বনিত হয় মুক্তির মহাগীতে।
উপনিষদের অমৃতবাণী অন্তরে জাগে তাই—
“আত্মানং রথিনং বিদ্ধি”—জীবনরথের ঠাঁই।
দেহ যে রথ, মন তার লাগাম, বুদ্ধি সারথি মহান,
তোমার নামই পথের আলো, তুমিই পরিত্রাণ।
হে নীলমাধব! কৃপাসিন্ধু! ধরো আমার হাত,
ভবসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে থাকো সবার সাথ ।
লোভ-মোহ আর অহংকার সব চরণে লয়,
তোমার নামেই মুক্তি খুঁজি, তোমার নামেই জয়।
যেমন তুমি স্নান করো পবিত্র অমৃতধারে,
তেমনি ধুয়ে দাও অন্তর আমার দোষের অন্ধকারে।
অজ্ঞানতার কালিমাখানি করো আজ নির্মল,
তোমার নামের সুধাস্রোতে হোক জীবন উজ্জ্বল।

তুমি সূর্যের আলোকধারা, তুমি চাঁদের হাসি,
তুমি সাগরের অনন্ত ঢেউ, তুমি প্রাণের বাঁশি।
তুমি আদি, তুমি অনাদি, তুমি সৃষ্টির প্রাণ,
তোমার কৃপায় ধন্য হয় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সবখান।
চলো সবাই টানি আজ প্রেমের জীবনরথ,
জগন্নাথের নাম জপে খুলুক মুক্তিপথ।
স্নানযাত্রার পুণ্যলগ্নে একটিই আর সাধ—
জন্মে জন্মে চরণতলে পাই যেন আশ্রয়, হে নীলাচলনাথ।









Be First to Comment