Press "Enter" to skip to content

তারাশঙ্করের সাহিত্য নারীমন বনাম পুরুষমন….।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ১২ জুন ২০২৬। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য মূলত মানুষের মনের সাহিত্য। তিনি কাহিনির চেয়ে চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর চরিত্ররা বইয়ের পাতার কাল্পনিক মানুষ নয়; তারা বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদের রাঢ় অঞ্চলের বাস্তব মানুষ।

একজন মনোবিদের দৃষ্টিতে আমি দেখেছি , তারাশঙ্করের পুরুষ চরিত্রগুলো সাধারণত—

 

ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি বেশি সংবেদনশীল,

আত্মপ্রতিষ্ঠা ও অহমবোধে পরিচালিত,

বাইরের জগতের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত,

আবেগ প্রকাশে সংযত।

অন্যদিকে তাঁর নারী চরিত্রগুলো—

সম্পর্ক ও সংসারকেন্দ্রিক, সহিষ্ণু ও বাস্তববাদী,

কিন্তু, আবেগকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম, তাঁরা

সংকটের সময় অধিক মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়।

এই পার্থক্যই তাঁর সাহিত্যে “নারীমন বনাম পুরুষমন”-এর মূল আলোচ্য বিষয় বলে আমার মনে হয়েছে।

‘গণদেবতা’-য় নারী ও পুরুষ মন

গণদেবতা উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারী-পুরুষের মানসিক অবস্থানও পরিবর্তিত হয়।

পুরুষ চরিত্ররা সমাজের নেতৃত্ব, জমি, ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্যস্ত। তাদের চিন্তার কেন্দ্র বহির্জগৎ। তারা গ্রামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে বিচার করে।

কিন্তু নারী চরিত্ররা সংসার, সন্তান, খাদ্য, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক বন্ধনকে কেন্দ্র করে জীবনকে দেখে।

এখানে পুরুষমনের প্রধান প্রশ্ন— “সমাজে আমার স্থান কোথায়?”

নারীমনের প্রধান প্রশ্ন— “আমার পরিবার কীভাবে বাঁচবে?”

এই দ্বৈত মনস্তত্ত্ব রাঢ় বাংলার বাস্তবতারই প্রতিফলন।

‘আরোগ্য নিকেতন’-এ অহং বনাম মমতা

আরোগ্য নিকেতন উপন্যাসে জীবনমশায় চরিত্রটি পুরুষ মনের এক গভীর প্রতীক।

তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন; তিনি নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতিনিধিও।

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির আগমনে তাঁর ভিতরে জন্ম নেয়— আত্মমর্যাদার সংকট,

প্রতিযোগিতার মানসিকতা ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।

এটি পুরুষ মনের এক স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য—নিজস্ব পরিচয় ও ক্ষমতা হারানোর ভয়।

অন্যদিকে নারী চরিত্রদের মধ্যে দেখা যায়—

 

সংসার টিকিয়ে রাখার তাগিদ,

 

সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা,

 

বাস্তব সমস্যার প্রতি অধিক মনোযোগ।

 

অর্থাৎ পুরুষ যেখানে “আমি কে?” প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত, নারী সেখানে “আমরা কীভাবে বাঁচব?” প্রশ্নে উদ্বিগ্ন।

‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’-য় আদিম মন

হাঁসুলি বাঁকের উপকথা সম্ভবত তারাশঙ্করের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।

এখানে কাহার সম্প্রদায়ের জীবনচিত্রে নারী-পুরুষের মানসিক পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট।

পুরুষ চরিত্রগুলো— সাহসী, ঝুঁকিপ্রবণ, গোষ্ঠীর নেতৃত্বপ্রত্যাশী ও প্রথার রক্ষক।

নারীরা— পরিবার রক্ষাকারী, বাস্তবমুখী,

খাদ্য ও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন,

আবেগগতভাবে অধিক পরিণত।

যখন সমাজে পরিবর্তনের হাওয়া আসে, পুরুষরা বিদ্রোহ করে বা প্রতিরোধ গড়ে তোলে; নারীরা পরিবর্তনকে ধীরে ধীরে গ্রহণ করে নেয়।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয়— পুরুষের অভিযাত্রী মন বনাম নারীর অভিযোজনক্ষম মন।

‘কবি’-তে প্রেমের মনস্তত্ত্ব

কবি উপন্যাসে নিতাই কবিয়াল ও বসনের সম্পর্ক নারী-পুরুষের আবেগগত পার্থক্যকে তুলে ধরে।

নিতাইয়ের প্রেমের মধ্যে রয়েছে—

রোমান্টিকতা, স্বপ্ন, শিল্পসত্তা ও আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা।

অন্যদিকে বসনের প্রেম— নিবেদন, গ্রহণক্ষমতা,

আত্মত্যাগ ও সম্পর্ক রক্ষার মানসিকতা।

একই প্রেমকে নারী ও পুরুষ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে অনুভব করে—তারাশঙ্কর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তা দেখিয়েছেন।

‘বেদেনী’-তে স্বাধীনতা বনাম নিরাপত্তা

বেদেনী গল্পে নারীমনের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে নারী কেবল পুরুষের অনুসারী নয়; সে নিজের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয়ের অধিকারী।

পুরুষ চরিত্র অনেক সময় নারীর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কারণ তার মধ্যে অধিকারবোধ প্রবল।

নারী চরিত্র চায়— স্বীকৃতি, স্বাধীনতা ও ভালোবাসা।

এই সংঘাত আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

রাঢ় বাংলার মানুষের মন-মানসিকতার ছাপ

তারাশঙ্করের নারী-পুরুষ চরিত্র বুঝতে হলে রাঢ় বাংলাকে বুঝতে হবে। রাঢ় বাংলার একজন মানুষ হিসেবে আমার তা খুব কাছের মনে হয়। তাই, লাভপুর সহ লেখকের বিভিন্ন জায়গায় বার বার ছুটে যাই। রাঢ় এর মানুষের –

 

১. কঠোরতা ও সহিষ্ণুতা

 

লালমাটির অনুর্বর ভূখণ্ড মানুষের মনকে কঠিন করেছে।

 

পুরুষের মধ্যে এনেছে— জেদ, আত্মসম্মান,

 

লড়াইয়ের মানসিকতা।

 

নারীর মধ্যে এসেছে—

 

সহনশীলতা, ধৈর্য ও ত্যাগের ক্ষমতা।

 

২. লোকবিশ্বাস ও সংস্কার

 

রাঢ় বাংলার সমাজে অলৌকিক বিশ্বাস প্রবল ছিল।

 

পুরুষরা অনেক সময় সামাজিক নিয়মের রক্ষক।

 

নারীরা সেই নিয়মের ভুক্তভোগী হলেও পরিবার রক্ষার জন্য তা মেনে নেয়।

 

৩. গোষ্ঠীচেতনা

 

ব্যক্তির চেয়ে সমাজ বড়—এই ধারণা রাঢ় বাংলার মানুষের মধ্যে গভীর।

 

ফলে নারী ও পুরুষ উভয়ের মনেই ব্যক্তিস্বাধীনতার চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা বেশি।

 

৪. আবেগের সংযম

 

রাঢ় অঞ্চলের মানুষ সহজে আবেগ প্রকাশ করে না।

 

পুরুষের কান্না যেমন আড়ালে থাকে, তেমনি নারীর বেদনাও নীরবে বহমান।

 

তারাশঙ্করের চরিত্রদের এই নীরবতা তাদের মনস্তত্ত্বকে আরও গভীর করেছে।

মূল্যায়ন

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে “নারীমন বনাম পুরুষমন” কোনও যুদ্ধ নয়; এটি একই জীবনের দুটি স্বতন্ত্র মানসিক ভাষা। পুরুষ সাধারণত ক্ষমতা, মর্যাদা, আদর্শ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে উদ্বিগ্ন; নারী বেশি মনোযোগী সম্পর্ক, পরিবার, নিরাপত্তা ও জীবনের ধারাবাহিকতার দিকে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে দেখা যায়, পুরুষের বাহ্যিক শক্তির চেয়ে নারীর অন্তর্নিহিত মানসিক শক্তিই অধিক স্থিতিশীল।

এই কারণেই তারাশঙ্করের সাহিত্য আমাদের শেখায়—রাঢ় বাংলার সমাজে পুরুষ ইতিহাস রচনা করেছে, কিন্তু নারী সেই ইতিহাসকে বহন করেছে। পুরুষ নির্মাণ করেছে সমাজের কাঠামো, আর নারী নির্মাণ করেছে সমাজের প্রাণ। তাঁর সাহিত্যজগতের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং একই মানবমনের দুই অপরিহার্য ও পরিপূরক রূপ।

 

আমার লেখা বই “নারীমন বনাম পুরুষমন”-এর জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি বিষয় প্রথমেই আমার মনে আসে , তিনি কখনও নারী ও পুরুষকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেননি; বরং একই সমাজ-বাস্তবতার দুটি ভিন্ন মানসিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যজগতে নারী ও পুরুষ উভয়েই রাঢ় বাংলার লালমাটির সন্তান। তাই তাদের মনোজগত গড়ে উঠেছে একই প্রকৃতি, দারিদ্র্য, সংগ্রাম, লোকবিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতির ভিতরে। তবে জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী ও পুরুষ মনে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য।

 

 

More from BooksMore posts in Books »
More from WorldMore posts in World »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *