ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৩০ জুলাই, ২০২৬। উজ্জয়িনীর পবিত্র ভূমি—শিপ্রা নদীর তীরে, যেখানে সূর্যোদয়ের আলো প্রথমে পড়ে গোমতি কুণ্ডের জলে, সেখানেই ছিল সন্দীপনি মুনির আশ্রম।
প্রভাতের বাতাসে আজও যেন ভেসে আসে মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি—
> “গুরুর ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরু দেবো মহেশ্বরঃ…”
এ স্থান কেবল একটি আশ্রম নয়, এটি ছিল এক যুগের হৃদয় — যেখানে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, ভক্তি ও আত্মচেতনা মিলেছিল একসাথে।
১. গুরুকুলে আগমন
দ্বারকাধীশ হওয়ার বহু আগে, এক কিশোর এসে দাঁড়িয়েছিল সেই পবিত্র আশ্রমের সামনে। তাঁর চোখে ছিল দীপ্তি, মুখে প্রশান্তি — তিনিই কৃষ্ণ।
সঙ্গে বলরাম ও তাঁর প্রিয় বন্ধু সুদামা।
সন্দীপনি মুনি তাঁদের দেখে মৃদু হাসলেন —
“দেখি, তিনটি পদ্মফুল এসেছে আমার বাগানে। তবে মনে রেখো, ফুল যেমন সুগন্ধ ছড়ায়, তেমনি শিষ্যও জ্ঞান ছড়ায় দিগন্তে।”
শুরু হলো শিক্ষা।
ভোরে সূর্যনমস্কার, পরে বেদের পাঠ, ধনুর্বিদ্যা, অঙ্কন, সংগীত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান — সবই শিখতেন তাঁরা। ৬৪ রকমের বিদ্যা !
কৃষ্ণের চোখে প্রতিদিনই ফুটে উঠত এক নতুন কৌতূহল।
গুরু বলতেন— > “জ্ঞান কেবল পুস্তকে নয়, প্রকৃতির প্রতিটি কণাতেই নিহিত। দেখো, কাক যখন জলের পাত্রে পাথর ফেলে জলে স্তর বাড়ায় — সেও এক ছাত্র। প্রকৃতির কাছে শিখো।”
কৃষ্ণ গভীর মনোযোগে শুনতেন। গুরুর প্রতিটি বাক্য তাঁর জীবনের নীতিতে পরিণত হচ্ছিল।
২. কাঠ সংগ্রহের রাত
একদিন মেঘে ঢেকে গেল আকাশ, বনে বৃষ্টি নেমে এলো ঝরঝর করে।
সেই রাতে গুরু বললেন, “যে সত্যিকার শিষ্য, সে বিপদে সেবার অর্থ বোঝে।”
কৃষ্ণ ও সুদামা বেরিয়ে পড়লেন গুরুর জন্য জ্বালানির কাঠ সংগ্রহে।
প্রবল ঝড়ে দু’জন ভিজে গেলেন, কিন্তু ফিরে এলেন গুরুর জন্য কাঠ নিয়ে।
মুনি দেখলেন—ভেজা দেহে দীপ্ত মুখ, কিন্তু গুরুভক্তিতে পরিপূর্ণ প্রাণ।
তাঁর চোখে অশ্রু এল —
“এই শ্রদ্ধাই তোমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ করল। আজ থেকে তোমরা শুধু শিষ্য নও, আমার সন্তান।”
৩. গুরুদক্ষিণা : এক অনন্ত প্রতিজ্ঞা
শিক্ষা শেষ হবার পর সন্দীপনি মুনি বললেন,
“হে কৃষ্ণ, আমার গুরুদক্ষিণা যদি দিতে চাও, তবে আমার হারানো পুত্রকে ফিরিয়ে দাও।”
কৃষ্ণ নম্রভাবে প্রণাম করে বললেন,
“গুরুদেব, আপনার ইচ্ছাই আমার ধর্ম।”
তিনি বলরামসহ সমুদ্রগর্ভে প্রবেশ করলেন। সমুদ্রের অধিপতি বরুণকে প্রণাম করে বললেন,
“এই বিশ্বে এমন কিছু নেই যা গুরুর প্রার্থনা পূর্ণ করা থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারে।”
অবশেষে কৃষ্ণ ফিরিয়ে আনলেন সন্দীপনি মুনির সন্তানকে, জীবিত অবস্থায়।
আশ্রম জুড়ে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল।
সন্দীপনি মুনি কৃষ্ণের মাথায় হাত রেখে বললেন—
> “তুমি ঈশ্বরের অবতার হলেও গুরুর প্রতি এমন শ্রদ্ধা রাখলে, তাই তুমি সত্যিকার ব্রহ্মজ্ঞানী।”
৪. জ্ঞানের অনন্ত আলো
বছর কেটে গেছে, যুগ কেটে গেছে।
কিন্তু উজ্জয়িনীর সেই গোমতি কুণ্ড আজও আলোকিত থাকে ভোরবেলায়।
সেখানে আজও শিশুরা বিদ্যারম্ভ করে, গুরুকে প্রণাম জানায়,
আর মুনির আশ্রম থেকে যেন শোনা যায় এক চিরন্তন ধ্বনি—
> “যে জ্ঞানের পথে চলে, সে অন্ধকারের ভয় পায় না।”
সন্দীপনি মুনি ও শ্রীকৃষ্ণের গল্প আজ কেবল পুরাণ নয়
এ এক শিক্ষা:
যেখানে ঈশ্বরও শিখতে নত হন ৷,
যে গুরু তাঁর শিষ্যর ঈশ্বররূপ দেখেন,
সেই সম্পর্কেই গাঁথা মানবতার প্রকৃত মন্ত্র।
উপসংহার
সন্দীপনি আশ্রম তাই শুধু একটি স্থান নয়—
এটি এক চেতনার মন্দির, যেখানে গুরু-শিষ্য সম্পর্কের পবিত্রতা জ্ঞানকে পরিণত করে আত্মজ্ঞান-এ।
যেখানে কৃষ্ণের মতো দেবতা শিক্ষার্থীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, এবং সন্দীপনির মতো গুরু মানবজাতিকে শেখান —
> “জ্ঞানই সত্য, ভক্তিই পথ, সেবাই ধর্ম।”










Be First to Comment