Press "Enter" to skip to content

শুভ প্রবরণা পূর্ণিমা…।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬। বৌদ্ধ ধর্মে পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম ৷ “বুদ্ধপূর্ণিমা” র পর প্রতিটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে যে তিথিটি সবচেয়ে বেশী তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো আমাদের কোজাগরীর মত “প্রবরণা পূর্ণিমা ” ! বৌদ্ধ ধর্মাবল্বীদের দ্বিতীয় প্রধান উৎসব ৷ আমরা হিন্দুরা যেদিন লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করি সেই কোজাগরী পূর্ণিমা তিথিতেই হয় এই উৎসব ৷ আষাঢ়ী পূর্ণিমায় বৌদ্ধভিক্ষুদের বর্ষা ব্রত আরম্ভ হয়ে প্রায় তিন মাস বাদে আজকের মত কার্তিকী পূর্ণিমায় তা শেষ হয় ৷ বিশ্বের সর্বত্র বৌদ্ধ বিহার গুলিতে এই সময় হরেক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হয় ৷বিশেষ করে থেরবাদী বৌদ্ধদের মধ্যে ৷ এদিন বুদ্ধদেব ধর্ম প্রচার শুরু করেন ৷ বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ তাই এদিনে শুধু বৌদ্ধদের কিংবা মানব জাতিকে নয় সব প্রাণীকে জানান মৈত্রীময় শুভেচ্ছা ৷ আমি নানা সময় উপমহাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দির ও মনাস্ট্রিতে ঘুরি ৷ তবে , বরগুণার তালতলীর রাখাইন পল্লীগুলিতে প্রবরণা পূর্ণিমার আলোকজ্জ্বল রাত কখনো ভুলবো না ৷ শত শত ফানুসে আকাশ ঢেকে যায় ৷ মনেহয় তারারা উড়ছে নামছে ! স্মৃতির মণিকোঠায় তা চিরভাস্বর হয়ে আছে ৷” প্রবরণা ” মানে অভিলাষ পূরণ ৷ এদিন সব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার শপথ নিয়ে সবার মঙ্গলের জন্য কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয় ৷ যা স্বয়ং বুদ্ধদেব বলেছেন ,” চরতে ভিক্খবে চরিকং , বহু জন হিতায় , বহুজন সুখায় “৷ প্রবরণা পূর্ণিমার পরে শুরু হয় একমাস ব্যাপী ভিক্ষুদের জন্য ” কঠিন চীবর দান “৷ “চীবর” মানে ভিক্ষুদের পরার কাপড় ৷ ছয়টি রঙের মধ্যে হয় এই বস্ত্র ৷ তবে , আমি লাল ফুলের রঙের বস্ত্রই দিতে দেখেছি ৷ গৃহী দের মত সুন্দর নয় ৷ অন্যরকম বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় এই বস্ত্র ৷ তিন মাসের বর্ষাবাস পালন করেছেন যে ভিক্ষুরা তাঁদের দেওয়া হয় ৷ যেখান কোন ভিক্ষুরা বর্ষাবাস ব্রত পালন করেন নি ৷ সেখানে কঠিন চীবর দান হয় না ৷ আসলে বর্ষাকালে ভিক্ষুগণ ঘুরে ঘুরে ধর্ম প্রচার করতে পারেন না ৷ পথঘাট বিপদসঙ্কুল হয়ে হয়ে ওঠে ৷ তাই তাঁরা বিহারে অবস্থান করেন ৷ এই সময়টা তাঁরা শীল -সমাধি -প্রজ্ঞার অনুশীলনকরে কাটান ৷ তিন মাস ধরে তাঁরা সংযম পালন করেন ৷ তাতে আত্মশুদ্ধি হয় ৷ ভিক্ষুরা হলেন বৌদ্ধ ধর্মের ত্রিরত্ন বুদ্ধ , ধম্ম ও সংঘ – এর তৃতীয়টি ৷ ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী অর্থাৎ বৌদ্ধ সাধু বা সন্ন্যাসী ৷ তাঁরা দান গ্রহণ করলেও কিছু চাইতে পারেন না ৷ চীবর দান শব্দের মধ্যে কঠিন কথাটি আসার কারণ ২৪ ঘন্টার মধ্যে সুতো কাটা , কাপড় বোনা , কাপড় কাটা , সেলাই থেকে রঙ করা , ধোওয়া সব করতে হয় ৷ আরো কিছু নিয়ম মানতে হয় যা দাতা বা গ্রহীতা উভয়ের জন্যই কঠিন ৷ বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন একশো বছরের দান বা বিশ্বের সব কিছু দান একত্র করলে যে ফল হয় তা কঠিন চীবর দানের ষোলো ভাগের এক ভাগ নয় ৷ তাই , প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধকে জীবনে একবার হলেও এই দান করতে হয় ৷ কঠিন চীবর দাতা জন্ম জন্মান্তরের পাঁচটি দোষ মুক্ত হয়ে পাঁচরকম সুফল লাভ করেন ৷নাগিত স্থবিরের থেকে বুদ্ধের ধর্মপ্রচারের দু বছরের মধ্যে তা গৃহী ভক্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ৷ আগে ভিক্ষুরা শ্মশান থেকে বা পরে থাকা বস্ত্র পরিধান করতেন ৷ এতে রোগ সংক্রমিত হত ৷ ভিক্ষুদের নীরোগ ও সুস্থ রাখতেই চীবর দান প্রথার সূত্রপাত ৷ আমরা ভারতীয়রা বিশ্বাস করি বিশ্ব যখন অধর্মে ও হিংসায় ছেয়ে যায় মানুষকে পথ দেখাতে তখন ভগবান স্বয়ং মানব রূপে ধরাধামে অবর্তীন হন ৷ হিন্দু পুরাণ মতে বুদ্ধদেব ভগবান বিষ্ণুর নবম অবতার ৷ পৃথিবীর সব জীবের প্রতি অহিংসা ও করুণার বার্তা দিতে মানব রূপে আবির্ভূত হন ৷ ঐতিহাসিক ভাবে ৬২৩ খ্রিঃপূঃ জন্মেও আজও তিনি প্রাসঙ্গিক ৷হিংসা ও যুদ্ধদীর্ণ পৃথিবীতে মানবতার বার্তা ৷ বুদ্ধদেবের শিষ্যরা পরে “বৌদ্ধ ধর্ম” নামে আলাদা ধর্ম মেনে চলেন ৷ অনেক দেশে বুদ্ধের মত বা ধর্মকে মেনে চলা হয় ৷ এখন তা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধর্ম ৷ অন্য ধর্মের মত এই ধর্মে ঈশ্বর নেই ৷ Generator , Operator, Destructor God নয় ৷ মানুষের তৃষ্ণা বা আকাঙ্খা তাঁর মতে সৃষ্টিকর্তা ৷ মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্ত্রা ৷ অহিংসা , পবিত্র মন ও কর্মই তাঁর মতে ধর্ম ৷ তাঁর ত্রিশরণ মন্ত্র( Three Jewels) হলো – “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি , ধম্মং শরণং গচ্ছামি ও সংঘং শরণং গচ্ছামি ৷ আর্যসত্য , অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা আটটি আর্যপথ হলো তাঁর দুঃখ নিবারন তত্ত্ব ৷ এগুলো হলো -সম্যক সংকল্প , সম্যক বাক্য , সম্যক কর্ম , সম্যক জীবিকা , সম্যক প্রযত্ন , সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি ৷ আমি মনে করি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যদি এই কথা গুলি মেনে চলেন তাহলে পৃথিবীই হতে পারে স্বর্গ ৷”সবেব সত্তা ভবন্তু সুখীতত্বা ” জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।  সবাই আনন্দ লাভ করুক ৷আমার সব বৌদ্ধ বন্ধুদের সহ সবাইকে জানাই প্রবরণা পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

সকল দুঃখের হোক অবসান ৷ নমো বুদ্ধায় ৷ বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি ৷

 

 

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *