ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬। ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে লক্ষ্মী পূজার শিকড় অনন্ত গভীরভাবে প্রোথিত। দেবী লক্ষ্মী—যিনি সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য, শুভ্রতা ও কল্যাণের প্রতীক—তাঁর আরাধনা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এক জীবন্ত সামাজিক চেতনা, এক সাংস্কৃতিক ধারা, এক অর্থনৈতিক প্রতীকবোধ। যুগে যুগে, বৈদিক ঋষিদের স্তবগান থেকে আধুনিক নাগরিক সমাজের আলো-সজ্জিত পূজা পর্যন্ত, লক্ষ্মী আরাধনা মানুষের আশা ও অর্জনের এক অনবদ্য সংলাপ বহন করে চলেছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও পুরাণের আলোকে
ঋগ্বেদে ‘শ্রী’ নামে দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়—
> “শ্রীয়ং লক্ষ্মীং ত্রৈলোক্যমাতরম্”—
অর্থাৎ, তিন লোকের মাতা, যিনি সৌন্দর্য, শুভ্রতা ও কল্যাণের উৎস।
বৈদিক যুগে লক্ষ্মী ছিলেন শ্রী-রূপে, শুভ ও সৌন্দর্যের অধিষ্ঠাত্রী শক্তি। পরবর্তীকালে পুরাণে, বিশেষত বিষ্ণু পুরাণ, গরুড় পুরাণ, ও পদ্ম পুরাণ-এ, সমুদ্র মন্থনের সময় দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের কাহিনি বর্ণিত হয়। তিনি পদ্মাসনা, হাতে পদ্ম ও সোনার পাত্র, গৌরবর্ণা, চারিদিকে জ্যোতিময় আভায় উদ্ভাসিত—এভাবেই লক্ষ্মী দেবীর রূপ স্থির হয় ভারতীয় কল্পনায়।
সমুদ্র মন্থনের প্রতীকী ব্যাখ্যা গভীর : ‘মন্থন’ মানে মনের গভীরতা থেকে জীবনের সত্য আহরণ। সেই মন্থনের মধ্যেই উদ্ভাসিত হয় লক্ষ্মী—যিনি বস্তুগত ও আত্মিক উভয় সমৃদ্ধির প্রতীক। তাই দেবী কেবল ধনের নয়, ধ্যানেরও অধিষ্ঠাত্রী।
অঞ্চলভেদে লক্ষ্মী আরাধনার রূপ
ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই লক্ষ্মী পূজার নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে—
বঙ্গদেশে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা, গুজরাট-মহারাষ্ট্রে দীপাবলি লক্ষ্মী পূজা, দক্ষিণ ভারতে কলশ পূজা, ওড়িশা-অসমে লক্ষ্মী পঞ্চায়েত পূজা—সবই একই চেতনার নানা আঞ্চলিক প্রতিফলন।
বাংলা ও কোজাগরী পূজা
‘কোজাগরী’ শব্দটি সংস্কৃত “কো জাগতী?” থেকে উদ্ভূত—অর্থাৎ “কে জেগে আছো?”।
বিশ্বাস, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী জাগ্রত ভক্তের ঘরে আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। কৃষিভিত্তিক সমাজে নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দে, এই পূজা প্রকৃতির প্রাচুর্যের আরাধনা।
বাঙালি ঘরে দেবী স্থাপিত হন কলাবৌ, পিঁড়ি, কাঠ বা মাটির প্রতিমায়। চাল, ধান, নারকেল, ফল, আলপনা ও লক্ষ্মীপদচিহ্নে সজ্জিত হয় ঘর। মহিলারা ভক্তিভরে লক্ষ্মী পাঁচালি পাঠ করেন; ঘরে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, প্রদীপ, ও দীপমালা দেবীর আগমনকে সূচিত করে।
পশ্চিম ও উত্তর ভারত
গুজরাটে দীপাবলির দ্বিতীয় দিনে ‘চোপডা পূজন’ হয়—যেখানে ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা পূজো করেন।
উত্তর ভারতে দীপাবলির রাতে বাড়িঘর আলোয় ভরে ওঠে; সোনা-রূপার মুদ্রা, পদ্মফুল, দুধ ও মিষ্টি নিবেদন করা হয় দেবীকে।
দক্ষিণ ভারত ও অন্যান্য প্রদেশ
দক্ষিণ ভারতে কলশ, নারকেল, আমপাতা ও রঙ্গোলি দ্বারা দেবী আরাধিত হন। ওড়িশা ও অসমে ধানলতিকা, কন্দমূল ও পুঁটুলাকৃতি প্রতিমা ব্যবহৃত হয়। সর্বত্রই পূজার মূল মন্ত্র—পবিত্রতা, শান্তি, ও পরিবারের ঐক্য।
দেবী লক্ষ্মীর দর্শন ও প্রতীকতত্ত্ব
দেবী লক্ষ্মী এক বহুমাত্রিক শক্তির প্রতীক।
তিনি কেবল ধনসম্পদের দেবী নন; বরং তিনি মানবজীবনের চারটি পুরুষার্থের (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) মধ্যে অর্থ ও ধর্ম-এর সুষম সমন্বয়।
তাঁর বাহন পেঁচা—যা রাত্রিকালের জাগরণ, সতর্কতা ও আত্মসচেতনতার প্রতীক।
তাঁর পদ্মাসন মানে অমলিনতা; জলময় পৃথিবীতে থেকেও পদ্ম যেমন নির্মল, তেমনি দেবীর কৃপায় সংসারজীবনও পবিত্র হয়।
তাঁর দুই হাত বরদা ও অভয়মুদ্রায় প্রসারিত—যা দান ও সুরক্ষার প্রতীক; অপর দুই হাতে পদ্ম ও সোনার পাত্র—বস্তুগত সমৃদ্ধির প্রতীক।
অষ্টলক্ষ্মী : জীবনের আট রূপের সম্পদ
পুরাণ অনুসারে দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ আছে, যা অষ্টলক্ষ্মী নামে পরিচিত—
১. আদিলক্ষ্মী (মূল শক্তি)
২. ধনলক্ষ্মী (আর্থিক সমৃদ্ধি)
৩. ধান্যলক্ষ্মী (অন্নশস্যের অভিভাবক)
৪. গজলক্ষ্মী (শক্তি ও রাজ্যসমৃদ্ধি)
৫. সন্তানলক্ষ্মী (সন্তান ও বংশরক্ষা)
৬. বিজয়লক্ষ্মী (সফলতা)
৭. বিদ্যালক্ষ্মী (জ্ঞান)
৮. অজলক্ষ্মী (অশুভের বিনাশ)।
এই আট রূপেই লক্ষ্মী দেবী সংসারের পূর্ণতা রক্ষা করেন—ধন, ধর্ম, জ্ঞান ও প্রেমের ভারসাম্যে।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র, ধ্যান ও জপপদ্ধতি
মূল মন্ত্র
> “শ্রীং লক্ষ্মী দেব্যৈ নমঃ।”
(পদ্মবীজের মালা দিয়ে ১০৮ বার জপ করা শুভ বলে বিবেচিত।)
ধ্যান মন্ত্র
> “ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ-সৃণিভর্য্যাম্য-সৌম্যয়োঃ।
পদ্মাসনস্থাং ধ্যায়েচ্ছ শ্রীয়ং ত্রৈলোক্যমাতরম্॥”
প্রণাম মন্ত্র
> “নমো-বিশ্বরূপস্য ভার্য্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।
সর্বতঃ পাহি মাং দেবি, মহালক্ষ্মী নমোহস্তুতে॥”
লক্ষ্মী গায়ত্রী মন্ত্র
> “ওঁ শ্রী মহাদেব্যৈ চ বিদ্মহে, বিষ্ণু পত্ন্যৈ চ ধীমহি।
তন্নো লক্ষ্মীঃ প্রচোদয়াত্ ওঁ॥”
অর্থ — আমরা মহান দেবী মহালক্ষ্মীর ধ্যান করি, যিনি মহাবিষ্ণুর পত্নী; তিনি আমাদের মনকে প্রেরণা ও আলোয় পূর্ণ করুন।
—
মন্ত্রজপের নিয়ম ও অর্থবোধ
মন্ত্রজপের সময় সর্বোচ্চ একাগ্রতা অপরিহার্য।
প্রতি মালা ১০৮ দানা বিশিষ্ট—যা ব্রহ্মাণ্ডের ১২ রাশিচক্র ও ৯ গ্রহের গুণফল (১২×৯ = ১০৮), তাই এই সংখ্যা পূর্ণতার প্রতীক।
মন্ত্র উচ্চারণে শুদ্ধতা, শান্ত পরিবেশ, দেবীর রূপকল্পনা ও মনসংযোগ—এই চারটি শর্ত পূর্ণ হলে তবেই জপের ফল শুভ হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৩, ৭ বা ১১ মালা জপ করা হয় সংকল্প অনুযায়ী।
মালা সরানোর সময় তর্জনী ব্যবহার না করে মধ্যমা ও অঙ্গুষ্ঠের সাহায্যে দানা ঘোরানো উচিত—এটি বিনয় ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
—
সমাজ, অর্থনীতি ও নারীশক্তির প্রতীক রূপে লক্ষ্মী
লক্ষ্মী দেবী কেবল দেবলোকের দেবী নন—তিনি ভারতীয় সমাজে নারীশক্তির অর্থনৈতিক প্রতীক।
গৃহিণীকে “গৃহলক্ষ্মী” বলা হয়—যিনি সংসারধর্ম, আর্থিক সংযম ও মানসিক শান্তির মূর্ত রূপ।
এই ধারণা কেবল ধর্মীয় নয়, সমাজতাত্ত্বিকও বটে—যেখানে নারীর শ্রম, মমতা ও দানশক্তি সংসারের ভিত্তি স্থাপন করে।
কৃষক সমাজে নতুন ধান ঘরে আনা, ব্যবসায়ী সমাজে নতুন খাতা পূজো করা, পরিবারে নববিবাহিতা নারীর ‘লক্ষ্মী প্রবেশ’—সবই এই দেবীর প্রতীকী প্রতিফলন।
আধুনিক কালে, লক্ষ্মী দেবী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সততা ও পরিশ্রমেরও প্রতীক—যাঁর কৃপা মানে শান্তি, সংযম, ও নৈতিক সমৃদ্ধি।
—
সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিতে লক্ষ্মীর অবস্থান
সংস্কৃত থেকে বাংলা, তামিল থেকে মারাঠি—প্রায় সব সাহিত্যেই লক্ষ্মীর উপস্থিতি অম্লান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় ‘ধনঞ্জয়’ ও ‘শ্রী’ শব্দগুলি যেমন আশীর্বাদের প্রতীক, তেমনি লোকগানে ও পাঁচালিতে লক্ষ্মী দেবী হলেন “সোনার ধানের মা”, “গৃহের মঙ্গললক্ষ্মী”।
চিত্রকলায়, রঙ্গোলি, আলপনা ও অলঙ্করণে পদ্মাসনা দেবীর প্রতিমা আজও গৃহশোভা ও সৌন্দর্যের চিহ্ন।
—
উপসংহার
লক্ষ্মী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচরণ নয়—এটি এক জীবনদর্শন।
এ পূজা শেখায়, সমৃদ্ধি কেবল ধনসম্পদের নয়, বরং শুদ্ধ মন, সততা, পরিশ্রম, এবং নৈতিকতার পূর্ণতা।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতে জাগরণ কেবল দেবীকে আহ্বান নয়—এটি আত্মজাগরণের প্রতীক;
যেখানে আলোয় অন্ধকার দূর হয়, অহংকারে বিনয় জন্মে, এবং ভোগে আসে সংযমের বোধ।
এইভাবেই যুগে যুগে, লক্ষ্মী আরাধনা ভারতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছে—
মানুষের আশার, পরিশ্রমের, ও শুভ্রতার দেবী হয়ে, পদ্মাসনে অধিষ্ঠিতা, শান্ত জ্যোতিময়ী মহালক্ষ্মী।










Be First to Comment