ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৮ জুলাই, ২০২৬।” ডায়াবেটিস ” – হলো নীরব ঘাতক ৷ আর আমাদের ভারতবর্ষ এখন পৃথিবীর ডায়াবেটিক রাজধানী ৷সংখ্যা ও শতাংশে প্রায় সব বয়সীদের মধ্যে বেড়েই চলেছে ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র বা মধুমেহ রোগ ৷
চিরাচরিত রীতিনীতি ও খাবারের পরিবর্তন এবং শারীরিক পরিশ্রম না করে শুয়ে বসে থাকা এ রোগ দ্রুত হারে বৃদ্ধির কারণ ৷ এটি এমন একটি রোগ যা আমাদের শরীরের সব অঙ্গকে ভিতর থেকে ঝাঁঝড়া করে তোলে ৷ইনসুলিন একরকম হরমোন ৷ যা অগ্নাশয় দ্বারা নিঃসৃত হয় ৷ এটি গ্লুকোজকে দেহ কোষে প্রবেশ করতে দিয়ে সেখানে শক্তির জন্য ব্যবহৃত হয় ৷ যে সব ডায়াবেটিক রোগীদের অগ্নাশয় একদম ইনসুলিন তৈরী করে না তাদের টাইপ -১ আর যাদের কম তৈরী হয় তাদের টাইপ -২ ডায়াবেটিস বলে ৷ এজন্য ভীষণ রকম ক্ষতি হয় চোখের ৷ আমরা যারা চোখ দেখি তাঁদের কাছে এলে প্রাথমিক অবস্থায় অনেকটা ক্ষতির পরিমাণ আঁচ করতে পারি ৷ এ থেকে দ্রুত বেড়ে যায় ছানি ৷ যা আমাদের দেশে অন্ধত্বের প্রধান কারণ ৷ ভারতে প্রতিবছর চার কোটি মানুষ ছানিতে আক্রান্ত হন ৷এই রোগে আক্রান্তদের ছানির প্রবণতা চারগুণ বেশী হয় ৷তবে , ডায়াবেটিস জনিত মৃদু আকারের ছানি শর্করা নিয়ন্ত্রক ও ছানির ওষুধে সরে যেতে পারে ৷ অন্য ছানি বিলম্বিত করা গেলেও অপারেশন ছাড়া উপায় থাকে না ৷৬০ বছরের পর অনেকেরই চোখের লেন্স অস্বচ্ছ বা ঘোলাটে হয়ে যায় ৷ এছাড়া ,ডায়াবেটিস ,এটোপিক ডার্মাটাইটিস , এলার্জি , মায়োটনিক ডিস্ট্রফি নামের চোখের পেশীর কার্য্যক্ষমতা কমে যাওয়ার অসুখ , অতি বেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ , অত্যাধিক মাইনাস পাওয়ার বা মাইওপিয়া এবং রাতকানা থাকলে কম বয়সেও ছানি পড়ে ৷আবছা বা ঘোলাটে দেখলে , চশমাতেও বিশেষত রাতে পড়তে অসুবিধা হলে ছানি হয়ে থাকতে পারে ৷ডায়াবেটিস চোখের মনি , লেন্স , রেটিনাকে নষ্ট করে দিতে পারে ৷ তাই , ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শব্দটি এখন শিক্ষিত মহলে বেশ পরিচিতি পেয়েছে ৷ রেটিনা বা অক্ষিপট হলো আমাদের চক্ষুগোলকের পিছনের দিকে অবস্থিত স্নায়ুকোষযুক্ত একটি পাতলা স্তর ৷যা ক্যামেরার ফিল্মের মত ফটোরিসেপ্টরের মাধ্যমে ছবিটি ক্যাপচার করে ৷সেখান থেকে রেটিনার হাতে ধরা সিগন্যাল বা ছবি অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভিস্যুয়াল সেন্টারে প্রেরিত হলে আমরা দেখতে পাই ৷নিয়মিত সুগার পরীক্ষা ছাড়াও বছরে দু একবার চক্ষু চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চোখের গুরুত্বপূর্ণ রেটিনার অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হয় ৷ কারণ কেন্দ্রবিন্দু বা সেন্টার পয়েন্ট ঠিক থাকা পর্যন্ত রোগী নিজে দৃষ্টিজনিত সমস্যা বুঝতে পারেনা ৷ প্রাথমিক অবস্থায় চোখের রেটিনা অংশে রক্তবাহী সরু ধমনী গুলি দূর্বল হয়ে পড়ে ৷ এতে চোখে থাকা ফ্লুইড লিক করে ৷ এভাবে ধমনীতে রক্ত চলাচলের সমস্যা আরো বাড়লে রেটিনার বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছায় না ৷ আশপাশের নালিগুলি চেষ্টা করেও রক্ত পৌঁছাতে অক্ষম হয় ৷ দূর্বল নালিগুলি ফেটে গিয়ে তখন রক্ত বের হয় ৷
রক্তনালী থেকে প্লাজমা বের হয়ে রেটিনার কোষে জমতে থাকে ৷আর চোখের কেন্দ্রে থাকা জেলি জাতীয় ভিট্রিয়াস হিউমার থেকে জেলি বা রক্ত ক্ষরণ হয় ৷ যাকে বলে “ভিট্রিয়াস হেমারেজ” ৷এতে অনেক সময় রেটিনা ডিটাচমেন্ট হয় ৷ তাই রেটিনা বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোন চিকিৎসাই কাজে দেয় না ৷অনেকে দশ বছর সুগার জনিত সমস্যায় ভুগলেও রেটিনা ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না ৷ ওষুধ না খেলে ও নিয়ম না মানলে তিন চার বছরের মধ্যেও হাইপারগ্লাসেমিয়া বা উচ্চরক্ত শর্করা রোগীরও রেটিনা চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে ৷দুনিয়াটা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে ৷ টাইপ -১ এবং২ দু ধরণের ডায়াবেটিক রোগীদেরই রেটিনোপ্যাথি , ঝাপসা দৃষ্টি ও ছানির আশঙ্কা বেশী ৷ডায়াবেটিক আক্রান্ত কুড়ি থেকে চল্লিশ ভাগ রোগীর রেটিনোপ্যাথি হতে পারে ৷ ভারতীয়দের মধ্যে এই হার ২৩% ৷অনেক সময় রেটিনা প্রতিস্থাপন বা ভিট্রেকটমি করতে হয় ৷অপ্টোমেট্রিস্ট ও অপথ্যালমোলজিস্টরা দেখে বুঝলে DFA নামের এঞ্জিওগ্রাফি , OCT নামের চোখের স্ক্যান , PRP নামের ফটোকোয়াগুলেশন নামের লেজার থেরাপি , Anti VEGF নামের স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন দিতে দরকারে ভিট্রিও রেটিনাল সার্জেনদের কাছে পাঠান ৷ চোখের হরেক রকম ইনফেকশন হতে পারে ডায়াবেটিস থেকে ৷ চোখের মধ্যে তরলের চাপ বৃদ্ধি হলো ” গ্লুকোমা “৷ শুরুতে চক্ষু চিকিৎসক ছাড়া বুঝতে পারে না ৷এই জটিল রোগে চোখের স্নায়ু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৷সারা বিশ্বে গ্লুকোমা জনিত অন্ধ সংখ্যায় দ্বিতীয় ৷ যা প্রায় আট কোটি ৷চোখের উচ্চচাপ এর কারণ ধরা হলেও স্বাভাবিক চাপেও এই রোগ হতে পারে ৷ তাই ,মাথা ব্যথা , চোখে ব্যথা , ঝাপসা , ঘনঘন চশমার পাওয়ার বৃদ্ধি , মৃদু আলোতে চোখে ব্যথা হওয়া , চোখের কর্ণিয়া ক্রমাগত বড় হওয়া ও সাদা হওয়া এবং জলাবদ্ধতার সমস্যার আঁচ পেলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার ৷জন্মগত ক্রটি ও বছরের পর বছর ধরে স্টেরয়েড ওষুধ সেবনে এই রোগ হতে পারে ৷ আর পিতা বা মাতার কিংবা এই দুই বংশের নিকট আত্মীয়দের গ্লুকোমা থাকলে মাঝে মাঝে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত ৷ তাদের ঝুঁকি বেশী ৷ সময়ের সঙ্গে অপ্টিক নার্ভের সঙ্কোচন বাড়লে রোগী আঁচ করতে পারে ৷তখন অনেকটা ক্ষতি হয়ে যায় ৷অনেকক্ষেত্রে সারা জীবন ওষুধ ব্যবহার করতে হয় ৷ দশ শতাংশ ব্যক্তি চিকিৎসা না করলে গ্লুকোমা জনিত কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন ৷ বেশী দিন ছানি ফেলে রাখলেও গ্লুকোমা হতে পারে ৷গ্লুকোমা রোগে ওষুধ বা লেজার বা সার্জারী যার যেটা লাগে করতে হয় ৷রক্তে শর্করা , ইউরিয়া ক্রিয়েটেনিন , হাইপার লিপিডিমিয়া ,কিডনির সমস্যা , রক্ত চাপ ও কোলেস্টরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী ৷ ৩০ বছরের আগে যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের এবং ডায়াবেটিক আক্রান্ত দের গর্ভাবস্থার প্রথম চার মাসে এর ঝুঁকি বেশী ৷ এছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের শুষ্ক চোখ হয় ৷ যাতে কৃত্রিম টিয়ার ড্রপ ও ওষুধ লাগে ৷ কর্ণিয়া হলো চোখের স্বচ্ছ ও বাইরের দিকে কিছুটা উত্তল চোখের স্বচ্ছ অংশ যা চোখের সামনের অংশটিকে ঢেকে রাখে ৷এটি প্রোটিন ও কোষ সম্বন্বয়ে তৈরী ৷ এতে রক্তনালী থাকে না ৷ডায়বেটিক রোগীদের অনেক সময় কর্ণিয়া খারাপ হয় ৷ ডায়াবেটিকদের মধ্যে কনজাংটিভাইটিস বা লাল চোখ , কর্ণিয়ায় সংক্রমণ , চোখের পাতায় বারবার অঞ্জনি , চ্যালাজিয়ান বা ক্যালাজিয়ান সহ চোখের পাতার রোগও অনেক বেশী হয় ৷ওষুধ গ্রহণ , খাদ্য নিয়ন্ত্রণ , কায়িক পরিশ্রম , স্থূলতা হ্রাস , রক্তশূন্যতা ও ভিটামিন ডি ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ , ধূমপান বর্জন ও নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে চক্ষু পরীক্ষা করলে ডায়াবেটিস নামের নিশব্দ ঘাতক আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না ৷দীর্ঘদিন ধরে চোখের চিকিৎসায় বহু রোগীকে শনাক্ত করতে পেরেছি ৷ এটা চিকিৎসক হিসাবে পরম পাওয়া ৷










Be First to Comment