Press "Enter" to skip to content

অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য সনাতন হিন্দু বৈদিক ধর্ম চিরন্তন ও মহীয়ান…. !

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৭ মে, ২০২৬। ধৃ+মন= ধর্ম ৷ ধৃ মানে ধারন বা গ্রহণ করা ৷ আর মন বলতে বুঝি আত্মা ৷ মন যাকে গ্রহণ করে শান্তি পায় তাই ধর্ম ৷ আমরা যাকে হিন্দু ধর্ম বলি তা আসলে “সনাতন ধর্ম ” ৷ সনাতন অর্থাৎ চিরন্তন ৷এর শিকড় বৈদিক ধর্মে ৷ সিন্ধু উচ্চারন অপভ্রংশে হয়েছে হিন্দু ৷ বিদেশীদের উচ্চারনে ৷ আমরা হিন্দুরা মনে করি এই ধর্ম অপৌরুষেয়, মৌল ও শাশ্বত ৷ ভূত- ভবিষ্যৎ -বর্তমান সিদ্ধ বলে সনাতন ধর্ম নাম ৷ কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এর প্রবর্তক নয় ৷ বহু সাধনার মিলিত ধারা “সনাতন ধর্ম “৷তাই “সনাতন” অর্থাৎ যা আগে ছিল , এখন আছে ও ভবিষ্যতে থাকবে “৷ “সদা” – সবসময় আর” ষ্টন” প্রত্যয় যোগে হয় “সনাতন “৷ “সত্যং ব্রৃয়াৎ প্রিয়ং ব্রূয়ান্ন ব্রৃয়াৎ সত্যম প্রিয়ম্ ৷ প্রিয়ঞ নানৃতং ব্রূয়াদেষ ধর্ম সনাতনঃ “৷যার লক্ষ্য “ওঁ অসতোমা সদ্ গময় , তমসো মা জ্যোর্তিগময় , মৃত্যোর্মা অমৃত গময় ৷ আবিরাবীর্ম এধিঃ “৷ অর্থাৎ অসৎ থেকে সতে , আঁধার থেকে আলোতে ও মৃত্যু থেকে অমৃতলোকে যাওয়া ৷পরমব্রহ্মে বা তৎ -সৎ ( তৎ স্বরূপ) – এ বিলীন হওয়া ৷ হিন্দুর বিশ্বাস “সর্ব খল্বিদং ব্রহ্মে ” বা দৃশ্য -অদৃশ্য সব কিছুই ব্রহ্ম বা ভগবানের প্রকাশ ৷ তাই , “সত্যং জ্ঞানম্ অনন্তং ব্রহ্ম ” বা সত্য – জ্ঞান -অনন্ত ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন থাকা ৷ আমরা মনে করি জগদীশ্বর বেদের উৎপাদক ও প্রকাশস্বরূপ ৷” ধর্মো মূল হি ভগবান “৷ সনাতন ধর্ম প্রকৃতি প্রদত্ত ৷ যা অতীতে ছিল , বর্তমানে আছে ও ভবিষ্যতে থাকবে ৷ব্যক্তি প্রবর্তিত অন্য ধর্মের মত সনাতন ধর্মীরা তাই শুধু নিজের ধর্ম অনুসারীদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেন না ৷ প্রাথর্না করেন ” সর্বে ভবন্তু সুখীন – মা দুঃখ ভব্যতে ” ৷ সব মানুষ তথা প্রাণীর মঙ্গল কামনা করেন ৷এই ধর্ম মানুষকে পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে এবং মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উত্তরণ ঘটায় ৷ এই ধর্মের লক্ষ্য মোক্ষ লাভ বা ভগবানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া ৷ এই ধর্মে প্রতিটি জীবকে পরমাত্মার অংশ ভাবা হয় ৷ তাই , আর্তের ত্রাণ , গরিবকে শিক্ষাদান ও স্বাস্থ্য সেবা হলো হিন্দুর কাছে “শিব জ্ঞানে জীব সেবা”৷ দেখা হয় না জাতি , ধর্ম ৷ থাকে না সেবাদানের মধ্যে ধর্মান্তরণের অভিসন্ধি ৷ বেদ ভিত্তিক বলে এই ধর্ম বৈদিক ৷ বিদেশীদের সিন্ধু শব্দের ভুল উচ্চারনের ফল ভারতবর্ষের মানুষ হিন্দু ৷ ধর্মীয় বিধিবিধান না মেনেও একজন হিন্দু সন্তান হিন্দু থাকতে পারে ৷ এজন্য তাকে কোন নিপীড়ণের শিকার হতে হয় না ৷ আবার একজন অহিন্দু বা বিদেশী যদি কায়মনোবাক্যে হিন্দুর বিচারধারা মেনে চলেন শুদ্ধি যজ্ঞে বা অন্যভাবে পরাবর্তন ছাড়াও সহজে হিন্দু হতে পারেন ৷হিন্দু পুরাণের মতে পৃথিবীর প্রথম মানুষ স্বায়ম্ভুর “মনু” আর প্রথম নারী “শতরূপা ” ৷ মনুর সন্তান বলে আমরা মানব বা Man আর মেয়েরা মানবী( মনু সংহিতা ৭৮/৬৫৮) ৷ মনু ও শতরূপা হলেন ব্রহ্মা সৃষ্ট প্রথম দম্পতি৷ এদের পাঁচটি সন্তান – দেবব্রত ও উত্তানপাদ দুই ছেলে এবং আকুতি , দেবহূতি ও প্রসূতি এই তিন মেয়ে ( ভাগবত ৩/১২/৫৩,৫৪,৫৬)

“ওঁ” =অ+উ+ম ৷ ত্রিগুণাতীত এই একাক্ষর আদি প্রণব মন্ত্র ৷ কম্পন অনুসারে ৩:৭:১০ কম্পন তরঙ্গ৷

সব বিদ্যার আদি বীজ ! মন্ত্র হলো “মন নাৎ ত্রায়তে ইতি মন্ত্র ” অর্থাৎ যা মনন বা গভীর ভাবে চিন্তা করলে ত্রাণ পাওয়া যায় ৷পূজা হলো শ্রদ্ধা নিবেদন ৷আমরা যেমন দেশের প্রতীকরূপে পতাকা বা মানচিত্রকে শ্রদ্ধা জানাই ৷ সেভাবেই সমগ্র বিশ্ব সংসারের স্রষ্টাকে আমরা নিজেদের পছন্দমত রূপে শ্রদ্ধা নিবেদন করি ৷ নিরাকার অবস্থায় তা কঠিন ৷আমরা পঞ্চোপসনা বা ত্রিদেব উপাসনা বা দেবদেবীর আরাধনা যাই করি তা প্রতীক উপাসনা ৷ মূর্তি বা পুতুল পুজো নয় ৷সনাতনীরা প্রতীকের মাধ্যমে ঈশ্বর আরাধনা সহজ করে নিয়েছে ৷শুধু পুজোর সময়টুকুর সময় প্রতিমাকে আমরা ভগবানের প্রতীকরূপে দেখি ৷প্রতিমা জড় বস্তু হলেও তা ভগবানের প্রতিনিধিত্ব করে ৷ তাবলে , পুজোর আগে এবং দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা জড় মূর্তি ৷বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে প্রাণ প্রতিষ্ঠার পর তবে তা ভগবানের আসন পায় ৷ মৃন্ময়ীর মাঝে চিন্ময়ী নিমেষে ধরা দেয় ৷ তখন দেব দেবী রূপে ভগবান আরাধ্য প্রতিমায় বিরাজ করেন ৷ আর আমরা পুতুল বা মূর্তি পূজারী নই বলেই দর্পণ বিসর্জনের পর আনন্দে আমরা প্রতিমা জলে বিসর্জন করি ৷কারণ দর্পণ বিসর্জন হলো দেবদেবীকে আহ্বান করা , যাতে তিনি স্বধামে ফিরে যান ৷ আমরা পূজা , অচর্না , ধ্যান , যজ্ঞ , মন্ত্র ও তীর্থযাত্রা নানা ভাবে যার যেভাবে সুবিধা ভগবানকে পেতে চায় ৷ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন তিনি সর্বভূতের বীজ ৷দুস্কৃতিদের হাত থেকে সাধু বা ভালো মানুষের মুক্তির জন্য “সম্ভবামি যুগে যুগে ” ভগবান অবর্তীন হন ৷ শ+ই+ব= শিব ৷ যাঁর লিঙ্গ মূর্তির নিম্নাংশকে সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মা ভাগ , যোনি পট্টকে রক্ষাকর্তা বিষ্ণুভাগ এবং উর্ধাংশ সংহার কর্তা রুদ্রভাগ ৷ ঈশ্বর ঈজ্ঞণ বা প্রকাশ করেন ৷ আবার যিনি রক্ষা করেন ৷ এভাবেই সনাতনীরা ঈশ্বরকে প্রকাশ করেন ৷ “যঃ ঈক্ষতে সঃ ঈশ্বর ” জড় ও জীবজগতের সবকিছুর অন্তর্যামী সত্তা৷ “আরাধনা “= আ-রাধ্ + আনট্ + আ ৷ ঋষিদের দিব্যদৃষ্টি থেকে পাওয়া মন্ত্রে দেবতাকে আবাহন করা৷ সনাতন ধর্মে ৩৩ কোটি দেবতা বলে যা বলা হয় তা ভুল ৷ এই ধর্ম এক ঈশ্বরবাদী ৷পরমেশ্বর যেহেতু অসীম অনন্ত , তাই স্পর্শব্রহ্ম মূর্তি করে সেই পরমব্রহ্মেরই আরাধনা করা হয় ৷ যাতে নিজের সুবিধা মত ও সহজে ভগবানকে চিন্তা করার সুযোগ মেলে ৷ হিন্দুরা কর্মফলে বিশ্বাসী ৷নিজের জন্ম জন্মান্তরের কর্মফলের মাধ্যমে উন্নতিতে বিশ্বাসী ৷নারায়ণের দশাবতারের মধ্যে দিয়ে এখানে আধুনিক যুগের বির্বতনবাদকে হাজার হাজার বছর আগেই বোঝানো হয়েছে ! যুগে যুগে অসংখ্য মহামানব এই ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ৷ যেমন আদি শংকরাচার্য ভারতবর্ষের চারদিকে – উত্তরে যোশিমঠে জ্যোতির্মঠ , পশ্চিমে দ্বারকায় শারদামঠ,দক্ষিণে রামেশ্বরমে শৃঙ্গেরীমঠ এবং পূর্বে শ্রীক্ষেত্র পুরীতে গোবর্ধন মঠ স্থাপন করেন ৷ দ্বৈতবাদী , বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী সাধকরাও এভাবে মঠ স্থাপন করে ধর্মকে সুস্থিতি দিয়েছেন ৷ আজ চৈতন্য ও অন্য অবতারদের ইচ্ছামত অনুসারীরা বিশ্বের সর্বত্র হিন্দু সনাতন ধর্মকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ৷ আমরা মনে করি আমাদের বারবার জন্ম হয় ৷ তাই , পূর্ব জন্মের কর্মফলে কেউ কেউ জন্মসূত্রে বঞ্চনার শিকার হয় ৷ বিকলাঙ্গ , বোবা কিংবা বধির হয় ৷কারো মাতৃগর্ভে জীবন শেষ হয় ৷ পরম করুণাময় ঈশ্বর কখনো পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন না৷ এর উত্তর শুধুমাত্র সনাতন ধর্মের জন্মান্তর বাদ থেকে মেলে ৷ অন্য কোন ধর্মে যারা জন্মান্তর মানে না এর ব্যাখ্যা দিতে অপারক ৷ কুম্ভমেলা , পৃথিবীর প্রাচীনতম ও বৃহত্তম মেলা যেখানে সব মত ও পথের হিন্দুরা একত্রিত হন ৷ ২০২৪ এও যেখানে ত্রিশ কোটি মানুষ মিলিত হয়েছিলেন ৷ প্রাচীনতম এই ধর্ম পৃথিবীর তৃতীয় বৃহৎ ধর্ম ৷ প্রলোভন দেখিয়ে বা জোর করে ধর্মান্তরণ না করে যার অনুসারীর সংখ্যা ১৩৫ কোটি৷  জয় সনাতনের জয় ৷

ফটো কৃতজ্ঞতা স্বীকার – গুগল।

 

More from CultureMore posts in Culture »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *