ডাঃ অম্লান কে. দত্ত, কনসালটেন্ট – নিউরোলজিস্ট, নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত
নিজস্ব প্রতিনিধি : বারাসাত, ২৪ জুন, ২০২৬। মাথাব্যথা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সাধারণ স্নায়বিক সমস্যাগুলির মধ্যে একটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করছেন যে ক্রমশ বেশি সংখ্যক মানুষ ঘন ঘন মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছেন। যদিও জিনগত কারণ এবং কিছু অন্তর্নিহিত রোগ এর জন্য দায়ী হতে পারে, আধুনিক জীবনযাপনের নানা অভ্যাস এখন মাথাব্যথাজনিত সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির একটি হলো কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন ব্যবহারের ব্যাপক বৃদ্ধি। কাজ, পড়াশোনা বা বিনোদন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষ দীর্ঘ সময় কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে চোখের উপর চাপ পড়ে, শরীরের ভঙ্গি খারাপ হয় এবং মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়, যা মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে কিংবা বিদ্যমান সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মানসিক চাপ বা স্ট্রেসও একটি বড় কারণ। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পড়াশোনার দায়িত্ব, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং আর্থিক উদ্বেগ অনেককেই দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপে রাখে। এই চাপ মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে, ফলে মাথাব্যথার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, মাইগ্রেনে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে স্ট্রেস অন্যতম সাধারণ ট্রিগার হিসেবে বিবেচিত হয়।
অস্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাসও মাথাব্যথার সমস্যা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ । অনিয়মিত ঘুম, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায়, যার ফলে মাথাব্যথার প্রবণতা বাড়ে। শুধু ঘুমের ঘাটতিই নয়, অতিরিক্ত ঘুমও অনেক ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আক্রমণ ঘটাতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। ব্যস্ততার কারণে অনেকেই সময়মতো খাবার খান না, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করেন, পর্যাপ্ত জল পান করেন না বা নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর নির্ভর করেন। শরীরে পানির ঘাটতি এবং রক্তে শর্করার মাত্রার হঠাৎ ওঠানামা মাথাব্যথার সাধারণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত কারণ।
এছাড়া, বসে থাকার অভ্যাসনির্ভর জীবনযাপন সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দীর্ঘ সময় একটানা বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং ভুল ভঙ্গিতে বসার কারণে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে টান পড়ে, যা টেনশন-টাইপ মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম শুধু শারীরিক সুস্থতাই বাড়ায় না, এটি মানসিক চাপ কমায়, ঘুমের মান উন্নত করে এবং মাথাব্যথার মাত্রা ও ঘনত্ব কমাতেও সাহায্য করে।
সুখবর হলো, জীবনযাপনে কিছু সহজ পরিবর্তন এনে অনেক ক্ষেত্রেই মাথাব্যথার ট্রিগার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা, পর্যাপ্ত জল পান করা, সময়মতো সুষম খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত করা, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা এবং যোগব্যায়াম বা ধ্যানের মতো স্ট্রেস-ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা মাথাব্যথার প্রকোপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র মাথাব্যথাকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। যদি মাথাব্যথা ঘন ঘন হয়, দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, অথবা এর সঙ্গে দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, মাথা ঘোরা, শরীরের দুর্বলতা কিংবা কথা বলতে অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মাইগ্রেন ও মাথাব্যথা সচেতনতা মাস উপলক্ষে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে বারবার হওয়া মাথাব্যথা কোনো সাধারণ অসুবিধা নয়। জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, যা ব্যক্তির সামগ্রিক সুস্থতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।










Be First to Comment