নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ৪ নভেম্বর, ২০২৬। ভারতের বিশিষ্ট নিউরোসার্জন, পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডাঃ অশোক কুমার মহাপাত্র আর আমাদের মধ্যে নেই। গত ২ নভেম্বর ২০২৬, সোমবার রাতে দিল্লির AIIMS-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কের অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ক্যানসার গ্লায়োব্লাস্টোমার সঙ্গে লড়াই করছিলেন এই চিকিৎসক।
কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার খবরের মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে এমন এক জীবনসংগ্রামের গল্প, যা আগামী প্রজন্মের চিকিৎসক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকেও অনুপ্রাণিত করবে।
এক সাধারণ গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরোসার্জন!
১৯৫২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ওড়িশার পুরী জেলার এক সাধারণ গ্রামে জন্ম ডাঃ মহাপাত্রের। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পথচলা ছিল সংগ্রামের। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু তাঁর নিজের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৯৭৫ সালে MKCG Medical College থেকে MBBS সম্পন্ন করেন। এরপর দিল্লির AIIMS থেকে সার্জারিতে MS এবং নিউরোসার্জারিতে MCh ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৩ সালে AIIMS দিল্লিতে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা, অধ্যবসায় ও অসাধারণ চিকিৎসা-জ্ঞান দিয়ে হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিউরোসার্জন। পরবর্তীকালে তিনি AIIMS-এর নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান, নিউরোসায়েন্সেস সেন্টারের প্রধান এবং ডিন (রিসার্চ)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন।
জগা ও কালিয়ার জীবন বদলে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচার!
২০১৭ সালে গোটা দেশ তাঁকে নতুন করে চিনেছিল।ওড়িশার কান্ধামাল জেলার দুই যমজ শিশু জগা ও কালিয়া জন্মেছিল মাথা জোড়া অবস্থায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিরল অবস্থাকে বলা হয় Craniopagus Twins।
দু’জনের মাথার খুলি ও মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিল সংযোগ ছিল। তাদের আলাদা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য ভুলেও দু’জনের জীবন বিপন্ন হতে পারত।
কিন্তু হাল ছাড়েননি ডাঃ মহাপাত্র। তিনি প্রায় ৩০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে নিয়ে একটি বিশাল মেডিক্যাল টিম গঠন করেন। নিউরোসার্জনদের পাশাপাশি ছিলেন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট সহ বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা।
২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট প্রথম পর্যায়ের অস্ত্রোপচার হয়। এরপর ২৫ অক্টোবর দীর্ঘ ও জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুই শিশুকে আলাদা করা সম্ভব হয়। এই ঐতিহাসিক চিকিৎসা সাফল্য শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মহলেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। যে দুই শিশুর স্বাভাবিকভাবে আলাদা জীবন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত কঠিন, তারা পেল নতুনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ। আজও জগা ও কালিয়ার পরিবারের কাছে ডাঃ মহাপাত্র ছিলেন ঈশ্বরের সমান।
তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে জগার বাবার শোকের ভাষা ছিল, এই মানুষটি তাঁদের কাছে ঈশ্বরের মতো ছিলেন।
আর জগার সেই হৃদয়বিদারক স্মরণ—
“যিনি আমার জীবন বাঁচিয়েছিলেন, তিনি আর নেই।”
ভাবুন, একজন চিকিৎসকের প্রতি একটি শিশুর কতটা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা থাকলে এমন কথা বলতে পারে! শুধু একটি অস্ত্রোপচার নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেখে গিয়েছেন অসংখ্য অবদান।
ডাঃ মহাপাত্রের পরিচয় শুধু জগা ও কালিয়ার অস্ত্রোপচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিউরোসার্জারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হাজার হাজার জটিল মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর অস্ত্রোপচারে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। মস্তিষ্কের টিউমার, জটিল নিউরোসার্জারি, শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের অস্ত্রোপচার এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। SGPGI লখনউয়ের অধিকর্তা থাকাকালীন তিনি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার, ট্রমা সেন্টার এবং অ্যাডভান্সড পেডিয়াট্রিক সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।
২০১২ সালে AIIMS ভুবনেশ্বরের প্রতিষ্ঠাতা অধিকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একেবারে গোড়া থেকে প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসা ও শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়েই সেখানে MBBS, নার্সিং, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এবং সুপার স্পেশ্যালিটি শিক্ষার ব্যবস্থা চালু হয়। করোনা মহামারির সময় SOA বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন ওড়িশায় ২,৬০০-রও বেশি কোভিড চিকিৎসার বেড তৈরির উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি করোনা পরীক্ষা ও ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণাতেও ছিলেন অসাধারণ!তাঁর অবদান শুধু অপারেশন থিয়েটারের চার দেওয়ালে আটকে থাকেনি।
সরকারি পদ্মশ্রী সম্মাননার জীবনী অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৮৭০টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, লিখেছেন ১৬টি বই এবং ১৪০টিরও বেশি বইয়ের অধ্যায়। তাঁর গবেষণার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মহলেও। তাঁর গবেষণাপত্রগুলিতে ২৬,৮০০-রও বেশি সাইটেশন রয়েছে। তিনি শুধু রোগীদের চিকিৎসা করেননি, তৈরি করেছেন নতুন প্রজন্মের চিকিৎসক ও গবেষক। দেশের নিউরোসার্জারি শিক্ষার উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে পদ্মশ্রী সম্মান গ্রহণ করেন তিনি।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি!
সারাজীবন যিনি অন্যের মস্তিষ্কের জটিল রোগের চিকিৎসা করেছেন, যিনি অসংখ্য মানুষকে নতুন জীবন দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিকেই আক্রান্ত করল মস্তিষ্কের মারণ ক্যানসার। গ্লায়োব্লাস্টোমার মতো ভয়ংকর রোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন চিকিৎসকও মানুষ। তাঁরও সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু একজন প্রকৃত চিকিৎসকের কাজের সার্থকতা শুধু নিজের জীবনে নয়, তিনি কত মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়ে গেলেন, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
ডাঃ অশোক কুমার মহাপাত্র হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু জগা ও কালিয়ার মতো অসংখ্য মানুষের জীবনে তিনি যে আশার আলো জ্বালিয়ে গিয়েছেন, তা কখনও নিভে যাওয়ার নয়।
একটি সাধারণ গ্রামের ছেলে নিজের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও মানবসেবার মানসিকতা দিয়ে কীভাবে গোটা দেশের গর্ব হয়ে উঠতে পারেন, তাঁর জীবন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদবি, সম্পত্তি কিংবা খ্যাতিতে নয়; তিনি কত মানুষের জীবন বদলে দিতে পেরেছেন, তার মধ্যেই তাঁর আসল পরিচয়।













Be First to Comment