Press "Enter" to skip to content

পুজোর ফুল ও পাতা…।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ কলকাতা, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬। পৃথিবীতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ফুল হলো ভগবানের উপহার ৷ মানুষের মতই ভগবানেরও প্রিয় ফুল এবং পাতা ৷ সব দেবতা সব ফুলে তুষ্ট হন না ৷ কিন্তু , প্রতিটি মানুষের যেমন পছন্দ আলাদা ৷ তেমনি ঠাকুর ঘরে ও মন্দিরে একেক ফুল ও পাতায় একেক দেব দেবী সন্তুষ্ট হন ৷ আমরা সনাতন ধর্মীয় বা হিন্দুরা ইষ্ট দেবদেবীর পুজো করি ৷ কিন্তু , প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অভাবে কোন ফুল ও পাতা কোন পুজোয় লাগে জানি না ৷ সবার জ্ঞাতার্থে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস ৷ ভালো লাগলে শেয়ার করবেন ৷ নিজেরা আরো কিছু জানলে মন্তব্য করবেন ৷

“দৈবস্য মস্তকংকুর্যাৎকুসুমোপহিতং সদা ” ৷তাই আমরা দেবদেবীর মাথা ফুলে ঢেকে দিই ৷ মন্ত্র বলে

পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে থাকি ঈশ্বরের শ্রীচরণে ৷ বিভিন্ন পুরাণে সেজন্য বলা হয়েছে -ভগবানের সবচেয়ে পছন্দ হলো ফুল ৷ ” পুষ্পৈদেবাং প্রসীদন্তি পুষ্পৈ দেবাশ্চ সংস্থিতাঃ , ন রত্নৈর্ণ সুবর্ণেন না বিত্তেন চ ভুরিনা ৷”ফুল আমাদের মনে আনন্দ আনে ৷ মনকে প্রসন্ন করে ৷ ফুলের সুগন্ধে মানুষের মত দেবতারা

খুশী হন ৷ দেব দেবীদের বাসি,পচা , চুরি করা , নোংরা বা ছেঁড়া ফুল দিতে নেই ৷ ফুলের মালা দেবদেবীর শোভা দান করে ৷পদ্ম ও কুমুদ ফুল বাসি দেওয়া যায় ৷ কলি শুধুমাত্র চাঁপার দেওয়া যায় ৷ গাঁদা ও গোলাপ সব দেবদেবীকেই উৎসর্গ করা যায় ৷ প্রথম পূজিত দেব গণেশের প্রিয় লাল ফুল ৷তাঁকে তুলসী পাতা দিতে নেই ৷পদ্মপুরাণে লেখা আছে গণেশের প্রিয় পাতা দূর্বা ৷

শিব পছন্দ করেন ধুতরা , আকন্দ, নীলকন্ঠ ( নীল অপরাজিতা ) নাগকেশর , জংলী ফুল , বেল ফুল , পদ্ম ইত্যাদি ৷ আকন্দ ফুলে বিষ আছে ৷ গোলাপী আকন্দ মহাদেবের সবচেয়ে পছন্দের ৷ একাধারে শিশুর মত সরল অন্যদিকে রুদ্রের মত কঠিন মহাদেব ফল হয়েছে এমন গাছের নিখুঁত তিনটি ফলক যুক্ত বেল পাতা পেলেই মহাখুশী ৷ তবে , মহাদেবকে কখনো কেওড়া ফুল অর্পণ করা যাবে না ৷দুর্গার পূজা নীল কমল বা নীল পদ্ম ( যা দুর্লভ) দিয়ে রামচন্দ্র করেছিলেন বলে কৃত্তিবাসী রামায়ণে লেখা আছে ৷ লাল পদ্ম , গোলাপ , জবাও দুর্গার প্রিয় ৷ দুর্গার অকালবোধনের সময় বাংলা ভরে যায় শিউলি ফুলে ৷ যা দেবীর খুব পছন্দের ৷তিনি চাঁপা , চামেলি ও বেলি ভালোবাসেন ৷ তবে , রক্ত করবী মা দুর্গার খুব প্রিয় ৷ বাসন্তী দুর্গাকে আট রকম লাল ফুল দিতে হয় ৷ গৌরীর প্রিয় বেলী , সাদা পদ্ম , পলাশ ও চাঁপা ৷ দুষ্টের দমন করতে কালীর আগমন ৷ ভয়ংকর মূর্তির পিছনে তিনি মমতাময়ী মা ৷মা কালীর পছন্দ লাল ফুল ৷ বিশেষ করে রক্তমুখী বা রাঙা জবা , পঞ্চমুখী জবা এবং সুগন্ধী ফুল ৷ যদিও জবাকে মনে করা হয় বিদেশী বা চীনা ফুল ৷ কালীর চরণে ১০৮ টি জবা দিলে মনস্কামনা পূরণ হয় ৷দুর্গা বা মায়ের যেকোন রূপের পূজায় সাদা পদ্ম , চম্পা ও পলাশ দেওয়ার বিধান আছে ৷সরস্বতী ভালোবাসেন হলুদ ও সাদা ফুল ৷ বাসন্তী গাঁদা ও সাদা গোলাপ তাঁর খুব পছন্দের ৷আবার আমরা তাই হলুদ বা বাসন্তী কাপড় পড়ে তাঁকে পুজো করি ৷ লাল পলাশও তাঁর প্রিয় ৷ বেদ প্রসবিনী , বিদ্যার দেবী মা সরস্বতী পুজোয় দিতে হয় আম শাখা বা আম্র পল্লব ও আমের মুকুল ৷শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় ফুল পদ্ম , কদম্ব , জুঁই , চম্পা, কুমুদ , মালতী বলে তিনি স্বয়ং মহাভারতে যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন ৷স্বর্গের পারিজাত বিষ্ণুর সবচেয়ে প্রিয় ৷ নারায়ণের ও গোপালের পুজোয় করবী , মালতী , গাঁদা ,কেওড়া , অশোক , বৈজয়ন্তী , চামেলি , অপরাজিতা ও পলাশ সাদা ও উজ্বল রঙের ফুল দিতে হয় ৷জুঁই , কদম , মালতী , বাসন্তী , চম্পা ফুল দিতে হয় ৷ সবচেয়ে প্রিয় হলো “পারিজাত” ৷ মনে করা হয় সমুদ্র মন্থনের সময় এই ফুল ওঠে ৷ রাতে ফোটা পারিজাত দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গে নিয়ে যান ৷ বিষ্ণুর পুজোয় ফুলের কুঁড়ি দিতে নেই ৷নারায়ণের পুজোয় উগ্র গন্ধ বা গন্ধহীন কোনো ফুল এবং জবা ফুল দিতে নেই ৷ তবে , তুলসী পাতা ছাড়া কৃষ্ণ , রাম বা হনুমানের পুজো হয় না ৷বলা হয় দ্বারকার সব ধনরত্ন একদিকে আর একটি তুলসী পাতা দাঁড়ি পাল্লার অন্যদিকে মাপলে শ্রীকৃষ্ণ তুলসীকে বেশী ভারী বলেন ৷ তার গায়ে লেখা আছে পরাবেদা , পরাক্ষরা ও পরামুক্তি এই নারায়ণ মন্ত্র ৷ তুলসী পাতা ছাড়া বজরঙ্গবলীর পেট ভরানো যায় নি ৷হনুমানজীর পুজোয় যে কোন ফুল দেওয়া যায় ৷ তবে , তাঁর বেশী পছন্দের লাল রঙের ফুল , গাঁদা ও জুঁই ফুল ৷ লক্ষ্মীর প্রিয় পদ্ম ৷তাই তাঁর নাম পদ্মালয়া ৷লাল গোলাপ ও হলুদ ফুল তাঁর অধিক প্রিয় ৷ ধন সম্পদের দেবী লক্ষ্মী আমাদের দেন সুখ , শান্তি ও সমৃদ্ধি ৷ তাঁর পুজোয় ঘরদোর পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হয় ৷ কাঁসর ও ঘন্টা বাজাতে নেই ৷শনি দেবের প্রিয় ফুল নীল অপরাজিতা বা যেকোন নীল রঙা ফুল ৷জয়ন্তী ও টুনকো জবাও তিনি ভালোবাসেন ৷ তেমনি সূর্য দেবকে অর্ঘ্য দিতে হয় পদ্ম , চাঁপা , পঞ্চমুখী জবা ,অশোক ও পলাশ দিয়ে ৷দেবর্ষি নারদ ভালবাসেন চাঁপা ৷ দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার পছন্দ মাধবীলতা ও লঙ্কা জবা ৷শিবকন্যা মনসা দেবীর ভালবাসেন পদ্ম ও নাগেশ্বর ফুল ৷ তাঁকে দিতে হয় কাঁচা প্রসাদ ৷ পুজোর সময় ধূপ -ধূনা দিতে নেই ৷তাই কথায় বলে একে মা মনসা তাতে ধূনোর গন্ধ ৷কখনো কোন দেবদেবীকে ফুল জলে ধুয়ে পুজো করতে নেই ৷স্নানের আগে শুদ্ধ বস্ত্রে বা ভালো জামা -কাপড়ে গঙ্গা জল ছিটিয়ে তবে ফুল তুলতে হয় ৷পদ্ম ,চাঁপা মালতী , বেলফুল , তুলসী এবং দূর্বা কখনো বাসি হয় না ৷শুধুমাত্র চাঁপা , পদ্ম ও মালতী ফুল একবার পুজোর পর জলে ধুয়ে পরদিন আবার দেবদেবীর শ্রীচরণে অর্পণ করা যায় ৷ ভোরে , সন্ধ্যায় , পূর্ণিমা , অমাবস্যা এবং দ্বাদশী তিথিতে তুলসী পাতা ছিঁড়তে নেই ৷ বিশ্বাস এতে নারায়ণের অঙ্গে আঘাত লাগে ৷ঐ দিনগুলিতে বেলপাতা তোলাও নিষেধ ৷ শিউলি ফুল মাটিতে পড়লেও অশুদ্ধ হয় না ৷ পুজো করা যায় ৷ শ্মশানের ফুল যত মনোরম হোক তা দিয়ে পুজো নিষেধ ৷ কেতকী, মোরগ এবং অনেক বিদেশী ফুল কোন পুজোয় লাগে না ৷ হয়তো , ভারতবর্ষে আগে পাওয়া যেত না বলে ৷আবার যখন যে দেব দেবীর পূজার কাল তখনকার ফুলই সেই দেবতাকে দেওয়া বিধি সম্মত ৷ দেবদেবীকে সাজাতে ও তাঁদের পায়ে ভক্তিভরে অঞ্জলি দিতে হয় তাঁদের যাঁর যাঁর প্রিয় ফুল ও পাতা দিয়ে ৷ দুপুরে স্নানের পর ও রাতে ফুল তুলতে নেই ৷যদিও অনেক সাধক বলেছেন ভালোবেসে ও ভক্তিভরে যা সুন্দর তা ভগবানের শ্রীচরণে নিবেদন করা যায় ৷আর শুদ্ধচিত্তে পুষ্পাঞ্জলি দিতে হয় ৷

 

More from CultureMore posts in Culture »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *