Press "Enter" to skip to content

সংস্কৃত—সময়ের অনন্ত স্বর…।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় । কলকাতা।

যে ভাষার নামেই আছে

পরিশুদ্ধতার স্পর্শ,

যে ভাষা উচ্চারিত হলে

সহস্র বছরের ধুলো পেরিয়ে

জেগে ওঠে ভারতবর্ষ—

সে ভাষার নাম সংস্কৃত।

কোনও এক ভোরে নয়,

কোনও এক রাজসভায় নয়—

তার স্বর ভেসে এসেছে

অতি প্রাচীন অগ্নিকুণ্ডের ধোঁয়া পেরিয়ে,

ঋষির কণ্ঠে,

মন্ত্রের ছন্দে,

নদীর মতো বহমান স্মৃতিতে।

ঋগ্বেদের সেই প্রাচীন উচ্চারণ

আজও যেন প্রশ্ন করে—

মানুষ কে?

বিশ্ব কোথা থেকে এলো?

আকাশের ওপারে কী আছে?

আর জ্ঞানের শেষ সীমানাটাই বা কোথায়?

বেদ থেকে উপনিষদ,

উপনিষদ থেকে দর্শন—

প্রশ্নের পর প্রশ্নে

মানুষকে নিজের ভিতরে ফিরিয়ে দিয়েছে

এই ভাষা।

তারপর এলেন পাণিনি—

শব্দের কারিগর,

ব্যাকরণের মহাশিল্পী।

অষ্টাধ্যায়ী-র সূত্রে সূত্রে

শব্দ পেল শৃঙ্খলা,

ধ্বনি পেল নিয়ম,

ভাষা পেল এক আশ্চর্য স্থাপত্য।

তিন লিঙ্গ,

তিন বচন,

আট বিভক্তি—

শব্দের শরীরে

ব্যাকরণের কত নিখুঁত নক্ষত্রমালা!

কিন্তু সংস্কৃত

শুধু ব্যাকরণের কঠিন অঙ্ক নয়—

সে কালিদাসের মেঘ হয়ে

প্রিয়ার কাছে বার্তা নিয়ে যায়,

সে শকুন্তলার চোখে

অপেক্ষার ভাষা হয়ে জ্বলে,

সে রামায়ণের পথে

আদর্শের সন্ধান করে,

মহাভারতের রণক্ষেত্রে

মানুষের ধর্ম ও দ্বন্দ্বকে

আয়নার মতো দেখায়।

সে কখনও মন্ত্র,

কখনও মহাকাব্য,

কখনও নাটক,

কখনও দর্শনের গভীর প্রশ্ন।

সে গণিতের সংখ্যায়,

জ্যোতির্বিজ্ঞানের নক্ষত্রে,

আয়ুর্বেদের জ্ঞানে,

রাষ্ট্রচিন্তার সূত্রে—

জীবনকে দেখেছে

অসংখ্য জানালা দিয়ে।

আর তাই

সংস্কৃত শুধু কোনও একটি ধর্মের ভাষা নয়;

বৌদ্ধ ও জৈন পণ্ডিতের কলমেও

তার অক্ষর জেগেছে,

জ্ঞান ও সাধনার বহু পথ

তার শব্দভাণ্ডারে আশ্রয় পেয়েছে।

কেউ বলে—

সংস্কৃত মৃত ভাষা!

আমি বলি—

মৃত ভাষা কি

এত ভাষার শিরায়

আজও শব্দ পাঠাতে পারে?

বাংলার মা,

হিন্দির মাতা ,

মারাঠির মাতা —

শব্দের গভীরে,

ব্যাকরণের স্মৃতিতে,

ভারতের বহু ভাষার শরীরে

তার পদচিহ্ন আজও স্পষ্ট।

দক্ষিণের দ্রাবিড় ভাষার ভুবনেও

সংস্কৃতের শব্দ এসে

শতাব্দীর পর শতাব্দী

নতুন অর্থে বেঁচে আছে।

তবু আজ

সংস্কৃতের সামনে এক প্রশ্ন—

শুধু পূজার মন্ত্রে

তুমি কি বেঁচে থাকবে?

শুধু প্রাচীন পুঁথির পাতায়

তোমার ভবিষ্যৎ?

না!

তোমাকে ফিরতে হবে

নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে,

বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে,

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়,

প্রযুক্তির নতুন পর্দায়,

নতুন কবিতায়,

নতুন চিন্তায়।

দেবনাগরীর অক্ষরে হোক,

বাংলা হরফে হোক,

যে কোনও লিপির আলোয় হোক—

ভাষা তো লিপির বন্দি নয়,

ভাষা মানুষের স্মৃতি।

আজ সংস্কৃত সপ্তাহ,

আজ সংস্কৃত দিবস—

এ শুধু একটি উৎসবের দিন নয়,

এ যেন নিজের শিকড়কে

একবার ছুঁয়ে দেখার দিন।

যে মাটিতে

বেদ উচ্চারিত হয়েছে,

যে আকাশে

উপনিষদের প্রশ্ন উড়েছে,

যে সভায় পাণিনি

শব্দকে নিয়মে বেঁধেছেন,

যে কবির কলমে

মেঘ প্রেমের দূত হয়েছে—

সেই উত্তরাধিকার

শুধু অতীতের নয়,

আমাদেরও।

তাই এসো,

সংস্কৃতকে শুধু প্রণাম নয়—

তাকে পড়ি,

তাকে বুঝি,

তার সৌন্দর্যকে নতুন ভাষায় বলি।

প্রাচীন বলে দূরে সরিয়ে নয়,

প্রাচীন বলেই

নতুন দিনের আলোয়

আরও একবার তাকে দেখি।

কারণ—

সময় বদলায়,

লিপি বদলায়,

মানুষ বদলায়,

শব্দের উচ্চারণও বদলায়;

তবু কিছু ভাষা

শুধু ভাষা হয়ে থাকে না—

তারা হয়ে ওঠে সভ্যতার স্মৃতি।

সংস্কৃত তেমনই এক স্বর—

সহস্র বছরের পথ পেরিয়ে

আজও বলে—

“আমি অতীত নই,

আমি তোমার উত্তরাধিকার।

আমাকে শুধু মুখস্থ কোরো না,

আমাকে বাঁচিয়ে রাখো

তোমার জ্ঞান,

তোমার সৃজন,

তোমার আগামী দিনের ভাষায়।”

৷৷ সংস্কৃতায় নমঃ ৷৷

 

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *