Press "Enter" to skip to content

দশ বছর পরে কি টাকার প্রয়োজন থাকবে না….?

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ১৭ আগস্ট, ২০২৬। পৃথিবীর ধনীতম ব্যক্তি একমাত্র ট্রিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কের এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে গত কিছু দিন ধরে তাঁর দেওয়া বিশ্বের সবচেয়ে নামী অর্থনীতির পত্রিকা “দ্য ইকোনোমিস্টের ” সম্পাদকের সঙ্গে মাস্কের সাক্ষাৎকার সহ বহু পত্রপত্রিকায় নানা মুনির পক্ষে বিপক্ষে নানা গবেষণামূলক মতামত পড়ে আজ একজন লেখক হিসাবে আমার বিশ্লেষণ তুলে ধরছি ৷

মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রা মূলত একটি চিরন্তন সংগ্রামের ইতিহাস—অভাবকে জয় করার ইতিহাস। আদিম মানুষের খাদ্যসংগ্রহের অনিশ্চয়তা থেকে শুরু করে কৃষির উদ্ভাবন, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের গর্জন থেকে বিদ্যুতের আলো—প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত বাঁকবদলেই উৎপাদন বেড়েছে এবং কমেছে মানুষের দৈনন্দিন যাপনের কৃচ্ছ্রসাধন। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবাকৃতি রোবটের মেলবন্ধনে সেই ইতিহাসেরই সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়টি রচিত হতে চলেছে। এই সন্ধিক্ষণেই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক এক অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী নিজের ভবিষ্যদ্বাণী হাজির করেছেন। তাঁর মতে, আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক উভয় শ্রমেই যন্ত্রের চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, জন্ম নেবে ‘প্রাচুর্যের অর্থনীতি’, কাজ মানুষের জন্য আর বাধ্যতামূলক থাকবে না এবং প্রচলিত অর্থের ভূমিকাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে। এমনকি সুদূর মহাকাশ অর্থনীতির প্রেক্ষিতে তিনি ডলারের বদলে ‘ভর ও শক্তি’কে পরিমাপক হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রশ্ন জাগে, এই স্বপ্ন কি আসন্ন বাস্তবতার পূর্বাভাস, নাকি প্রযুক্তিপ্রেমী মাস্কের কল্পনার এক মোহময় ইউটোপিয়া?

অর্থনীতির তত্ত্বালোচনায় এই ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৯৩০ সালে প্রখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস তাঁর দূরদর্শী প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ ঘটলে মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা মিটে যাবে এবং উত্তরসূরিদের হয়তো সপ্তাহে মাত্র পনেরো ঘণ্টা কাজ করলেই চলবে। মাস্ক যেন কেইনসের সেই অভাবহীন পৃথিবীর স্বপ্নকেই সিলিকন চিপ আর অ্যালগরিদমের আধারে মূর্ত করে তুলছেন। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, সফটওয়্যারের বুদ্ধি এবং রোবটের হাত-পা যখন উৎপাদনের সব ক্ষেত্রে যুক্ত হবে, তখন পণ্যের অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। ফলে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হবে অফুরন্ত প্রাচুর্য, যা নাগরিকের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে ‘সর্বজনীন উচ্চ আয়’-এর মতো রূপরেখার মাধ্যমে।

তবে এই উজ্জ্বল ছবির ঠিক বিপরীত পিঠে দাঁড়িয়ে আছেন আধুনিক সমাজ ও অর্থনীতির তাত্ত্বিকরা। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডারন আজিমোগ্লু ও সাইমন জনসন তাঁদের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে দেখিয়েছেন যে প্রযুক্তি নিজে থেকে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে না। যন্ত্র যখন মানুষের দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করার চেয়ে কেবল মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে তৎপর হয়, তখন তা অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং সমাজে ক্ষমতার চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের উৎপাদনযন্ত্র যদি অল্প কয়েকটি দানবীয় করপোরেটের কুক্ষিগত ঙূথাকে, তবে তা সর্বজনীন প্রাচুর্য আনার বদলে এক চরম ‘টেকনো-সামন্তবাদ’ ডেকে আনবে, যেখানে কোটি কোটি মানুষ পরিণত হবে রাষ্ট্র বা করপোরেটের ভাতার ওপর নির্ভরশীল প্রজা হিসেবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতির অনতিক্রম্য সীমানা। ডিজিটাল বিশ্বে একটি সফটওয়্যার তৈরি হয়ে গেলে তা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর খরচ হয়তো নগণ্য, কিন্তু ভৌত পৃথিবীর নিয়ম ভিন্ন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মিচিও কাকু যেমনটি স্মরণ করিয়ে দেন—আমাদের বিশ্ব থার্মোডাইনামিক্সের সুকঠিন নিয়মে বাঁধা। রোবট বানাতে প্রয়োজন লিথিয়াম, তামা, ইস্পাত আর বিপুল শক্তি। অধিকন্তু, ভৌগোলিক অবস্থানের সীমাবদ্ধতাকে রোবট কোনোভাবেই প্রসারিত করতে পারে না। লন্ডনের কেন্দ্রস্থল, টোকিওর প্রাণকেন্দ্র কিংবা সমুদ্রের ধারের এক টুকরো সীমিত জমি রোবটের ছোঁয়ায় অসীম হয়ে উঠবে না। এই দুর্লভ সম্পদগুলো বণ্টনের জন্য সমাজের কোনো না কোনো সার্বজনীন বিনিময় মাধ্যম প্রয়োজন হবেই। ফলে প্রচলিত মুদ্রা রূপ বদলাতে পারে—হয়তো তা ডিজিটাল ক্রেডিট বা রিসোর্স টোকেনে পরিণত হবে—কিন্তু বণ্টনের পরিমাপক হিসেবে অর্থের অন্তর্নিহিত ধারণাটি বেঁচে থাকবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সমসাময়িক গবেষণাও সম্পূর্ণ কাজহীন পৃথিবীর আশঙ্কার চেয়ে এক গভীর রূপান্তরের সাক্ষ্য দেয়। তাদের তথ্যমতে, উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে প্রায় অর্ধেক কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্পর্শে পরিবর্তিত হবে। তবে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রক্ষেপণ অনুসারে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি প্রথাগত পেশা যদি প্রযুক্তির ধাক্কায় বিলুপ্তও হয়, বিপরীতে উদ্ভাবিত হবে ১৭ কোটিরও বেশি নতুন ধারার কাজ। সমস্যাটি কাজের পরিমাণের চেয়েও বেশি মানবিক অস্তিত্বের। একজন মধ্যবয়সী অভিজ্ঞ কর্মী যখন তাঁর দীর্ঘদিনের পেশাগত প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেন, তখন নতুন প্রযুক্তির গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কেবল দক্ষতার লড়াই থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বের টানাপোড়েন।

অর্থনৈতিক এই আবর্তের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক মৌলিক দার্শনিক জিজ্ঞাসা। প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক হান্না আরেন্ট তাঁর লেখায় মানুষকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তার সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে। কাজ কেবল জীবিকার সংস্থান নয়; কাজ মানুষের আত্মপরিচয়, সামাজিক সংযোগ ও বেঁচে থাকার এক গভীর সার্থকতা। যন্ত্র যদি মানুষের হাত থেকে যাবতীয় কর্মের ভার কেড়ে নেয়, তবে মানুষ হয়তো অর্থনৈতিক দারিদ্রে পড়বে না, কিন্তু মুখোমুখি হবে এক তীব্র আত্মিক শূন্যতার। তখন তাকে নতুন করে ভাবতে হবে—জীবনধারণের সংগ্রাম থেমে গেলে বেঁচে থাকার অর্থ কী?

তবে ,আগামী দশ বছরে পৃথিবীর বুক থেকে টাকার চিরতরে বিদায় নেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে ইলন মাস্কের ভাবনা আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স যদি মৌলিক বেঁচে থাকার খরচকে অবিশ্বাস্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে, তবে মানুষ হয়তো অর্থের দাসত্ব থেকে কিছুটা মুক্তি পাবে। কিন্তু সেই পৃথিবী মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি নতুন কোনো বৈষম্যের কারাবাস, তা কোনো অ্যালগরিদম নির্ধারণ করবে না। তা নির্ধারিত হবে প্রযুক্তির মালিকানা এবং সেই বিপুল সম্পদের সুফল রাষ্ট্র ও সমাজ কীভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টন করছে তার ওপর।

ছবি প্রতীকী।

 

 

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *