ডাঃ রথীন্দ্র নাথ কর্মকার, কনসালটেন্ট, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টনারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত। ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। বর্তমানে অনেকের কাছেই ম্যারাথনে দৌড়ানো একটি ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ যা নিজেকে আরো ফিট ও সুস্থ রাখার একটি উপায়ও। তবে, বেশিরভাগ মানুষ যখন তাঁদের প্রশিক্ষণ, পুষ্টি এবং শরীরে জলের ভারসাম্যের দিকে নজর দেন, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়—তা হল হার্টের স্বাস্থ্য।
ম্যারাথনের মতো দীর্ঘ সময় ধরে চলা ব্যায়াম হার্ট ও রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে, ফলে বিশেষ করে যাঁরা প্রথমবার ম্যারাথনে অংশ নিচ্ছেন, শারীরিকভাবে খুব বেশি ফিট নন বা দীর্ঘদিন নিয়মিত শরীরচর্চা করেননি, তাঁদের ক্ষেত্রে দৌড় শুরু করার আগে হার্টের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, যাঁদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, কোলেস্টেরলের সমস্যা, ধূমপানের অভ্যাস বা অন্য কোনও ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তাঁদেরও কঠিন শারীরিক পরিশ্রম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দৌড়াবেন কি দৌড়াবেন না?
মেডিক্যাল চেক-আপকে দৌড়ানোর ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি নিরাপদে দৌড়ানোর প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নতুন কোনও খেলাধুলা শুরু করার আগে বা শরীরচর্চার মাত্রা বাড়ানোর আগে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা অনেক সময় কোনও উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে, যদিও সেগুলি গুরুতর হতে পারে। একজন চিকিৎসক তাই ম্যারাথনের মতো কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের সময় সম্ভাব্য জটিলতার ঝুঁকি নির্ধারণে সাহায্য করতে পারেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, আগে থেকে কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে বা পারিবারিক ইতিহাসে কারোর হৃদরোগ থেকে থাকলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কোনও নিকটাত্মীয়ের হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলে অথবা যাঁরা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না বা খুব বেশি ফিট নন, তাঁদের নতুন ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ শুরু করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, কিন্তু দৌড়ানোর সময় মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম করা, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা অন্য কোনও অস্বস্তিকর উপসর্গ অনুভব করেছেন, তাঁদেরও সম্ভাব্য সমস্যা আছে কি না তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকিৎসক সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনে আরও কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। ম্যারাথনের প্রশিক্ষণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করার জন্য আলাদা করে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। শারীরিক পরিশ্রম শুরু করার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেককে একগুচ্ছ পরীক্ষা করাতেই হবে। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরামর্শ দেবেন।
ধীরে ধীরে গতি বাড়ান
ম্যারাথনে নতুনদের একটি সাধারণ ভুল হল নিজের শারীরিক সক্ষমতাকে বেশি করে ধরে নেওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করা। নতুন ধরনের শারীরিক কার্যকলাপের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। তাই প্রশিক্ষণের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। একটি সঠিক ‘রানিং শিডিউল’ মেনে চললে অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়ানো যায় এবং পেশি, হাড়, টেন্ডন ও জয়েন্টকে বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান করা, সুষম খাদ্য বজায় রাখা এবং সম্ভব হলে অতিরিক্ত গরমের সময় দৌড়ানো এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজের শরীরের সংকেতগুলির দিকে নজর দেওয়া এবং উদ্বেগজনক কোনও উপসর্গকে উপেক্ষা না করা। বুকে তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি, মাথা ঝিমঝিম করা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ মাথা ঘোরা বা হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এমন কোনও উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ানো বন্ধ করে সাহায্য চাওয়া উচিত। উপসর্গগুলি কোনও শারীরিক সমস্যার কারণে হয়েছে নাকি অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল তা একজন চিকিৎসকই সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারবেন।
ম্যারাথন একটি দীর্ঘস্থায়ী সহনশীলতার পরীক্ষা, আর দৌড়বিদের প্রস্তুতি রেসের দিনের অভিজ্ঞতাকে অনেকটাই নির্ধারণ করে। উপযুক্ত জুতো, পোশাক, সরঞ্জাম, পুষ্টি এবং একটি সঠিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার পাশাপাশি, একটি মেডিক্যাল চেক-আপ নিরাপদ ও সফল ম্যারাথনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।









Be First to Comment