বাংলায় রথের পরিক্রমা
কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৬ জুলাই, ২০২৬। রথ বললেই আমাদের মনে পড়ে উড়িষ্যার পুরী। তবে পশ্চিমবঙ্গেও রথযাত্রার ঐতিহ্য কোনও অংশে কম নয়। বরং বাংলার মাটিতেও ছড়িয়ে বহু শতাব্দী প্রাচীন রথযাত্রার ইতিহাস, তার সঙ্গে জড়িয়ে ভক্তি, লোকসংস্কৃতি, রাজকীয় ঐতিহ্য এবং অসংখ্য মানুষের অনুভূতি। সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে হুগলির মাহেশের রথযাত্রা। প্রায় ৬২৫ বছরের পুরনো এই রথযাত্রা শুধু বাংলার নয়, গোটা দেশের অন্যতম প্রাচীন রথযাত্রা হিসেবেও পরিচিত। এমনকি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাধারাণী’তে মাহেশের রথের মেলার উল্লেখ করেছেন।
বর্তমানে মাহেশের রথ, চারতলা বিশিষ্ট বিশাল লোহার রথ। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এই রথে ১২টি লোহার চাকা। রথের প্রতিটি তলা এক একটি শিল্পকর্ম। প্রথম তলায় চৈতন্যলীলা, দ্বিতীয়য় কৃষ্ণলীলা এবং তৃতীয় তলায় রামলীলার অপূর্ব চিত্র। আর চতুর্থ তলায় স্বয়ং দেববিগ্রহ। রথের সামনে তামার দু’টি ঘোড়া এবং সঙ্গে কাঠের সারথি। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই রথযাত্রা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভক্তি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক !
তবে শুধু মাহেশেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও রথযাত্রার নিজস্ব ইতিহাস এবং অসংখ্য বৈচিত্র্য ! কোথাও রথে আসীন রঘুনাথ, কোথাও বা মদনমোহন। আবার কোথাও এমন কিছু বিশেষ রীতি প্রচলিত, যা অন্য কোথাও দেখা যায় না। প্রতিটি রথযাত্রাই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে আজও বেঁচে আছে।
নদিয়ার শান্তিপুরের রথযাত্রা সেই রকমই এক অনন্য ঐতিহ্য। রাস, ঝুলন বা জন্মাষ্টমীর মতোই এখানকার রথযাত্রার ইতিহাসও বহু প্রাচীন। তবে শান্তিপুরের বিশেষত্ব, এখানে রথে মূল আকর্ষণ জগন্নাথ নন, বরং গোস্বামী বাড়িগুলির আরাধ্য দেবতা রঘুনাথ ! রামচন্দ্রের দারুমূর্তি ধুতি পরে পদ্মাসনে রথে আসীন। তাঁর গায়ের রং সবুজ এবং পাশে জগন্নাথের বিগ্রহ। বড়গোস্বামী বাড়ির প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো এই রথযাত্রায় একসময় জগন্নাথের পাশাপাশি রঘুনাথের কাঠের বিগ্রহও রথে তোলা হতো। ধীরে ধীরে রঘুনাথই এখন এই রথযাত্রার প্রধান আকর্ষণ।
শান্তিপুরের রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে নানা ভোগের প্রথাও। উল্টোরথের আগের দিন, অর্থাৎ আষাঢ় নবমীর রাতে দেওয়া হয় বিখ্যাত ‘দেওড়াভোগ’। এই ভোগে থাকে কলমিশাক-সহ নানা নিরামিষ পদ সাদা ভাত, খিচুড়ি, তরকারি, ভাজা, দই, পায়েস-সহ একাধিক সুস্বাদু পদ। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বসে বিশাল মেলাও। বড়গোস্বামী বাড়ির সংলগ্ন মাঠ এবং রথতলা—এই দুই জায়গায় বসে জমজমাট রথমেলা, ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ।
উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের রথযাত্রাও এক বিশেষ আকর্ষণ। এখানে রথযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু মদনমোহন। ১৮৯০ সালে শুরু হওয়া এই রথযাত্রা আজও একই ঐতিহ্য মেনে পালিত হয়। রথযাত্রার আগের দিন অধিবাসের মাধ্যমে শুরু হয় উৎসব। সুগন্ধি তেল মেখে মদনমোহনের অঙ্গরাগ সম্পন্ন হয়। পরদিন মহাস্নানের পর রথযাত্রার দিন মূল মন্দিরের পশ্চিমদিকে অবস্থিত অন্য একটি মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয় দেবতাকে।
মদনমোহনের রথের উচ্চতা ২২ ফুট। ছয় চাকার এই রথের সামনে থাকে রুপোর তৈরি দু’টি ঘোড়া এবং কাঠের সারথি। প্রতিবছর মন্দিরেই প্রায় ৪০ কেজি পাট দিয়ে তৈরি হয় রথের বিশাল রশি। রথে চেপে শহর পরিক্রমা করে মদনমোহন পৌঁছন মাসির বাড়ি ‘গুঞ্জবাড়ি’-তে। সেখানে সাত দিন অবস্থানের পর উল্টোরথে ফেরেন মূল মন্দিরে। তবে মন্দিরে ফিরেই সিংহাসনে বসেন না তিনি। প্রথমে বারান্দায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম। এই বিশেষ রীতির নাম ‘ঠাকুরের হাওয়া খাওয়া’। সেই সময় তাঁকে বিশেষ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় শুধুই রসগোল্লা। তারপর নিজের সিংহাসনে।
হুগলির গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রাও বাংলার অন্যতম বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী রথ। এখানে তিনি ‘বৃন্দাবন জিউ’। বলাগড় থানার অন্তর্গত এই জনপদের রথযাত্রার বয়স প্রায় ২৮৫ বছর। এখানে টানা হয় নয় চূড়াবিশিষ্ট বিশাল রথ, প্রতিটি চূড়ায় ওড়ে রঙিন ধ্বজা। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা প্রায় এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছন গোঁসাইগঞ্জ-বড়বাজারে অবস্থিত মাসির বাড়িতে।
তবে গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ‘ভান্ডার লুট’। উল্টোরথের দিন মাসির বাড়ির মন্দিরের তিনটি দরজা একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয়। ভিতরে সাজানো থাকে ৫২ রকমের ভোগে ভরা অসংখ্য মালসা। সেই প্রসাদ পাওয়ার জন্য শুরু হয় ভক্তদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ আর হুড়োহুড়ি। এই ভান্ডার লুটের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান।
আসলে বাংলার রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি মানুষের মিলন, সংস্কৃতির উত্তরাধিকার এবং শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল ! কোথাও রঘুনাথ, কোথাও মদনমোহন, কোথাও আবার জগন্নাথের মহিমা প্রতিটি রথের আলাদা গল্প ! আর সেই গল্পের সঙ্গী হয় মেলা, ভোগ, লোকাচার, আনন্দ আর অগণিত ভক্তের ভালোবাসা। তাই প্রতি বছর ভরা আষাঢ়ে রথের ঘণ্টাধ্বনিতে শুধু দেবতার যাত্রাই শুরু হয় না, শুরু হয় বাংলার ঐতিহ্য, ভক্তি আর আবেগকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার এক চিরন্তন মহামিলন উৎসব।
আমাদের তরফ থেকে সবাইকে জানাই শুভ রথযাত্রা।











Be First to Comment