কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : দিঘা, ১৫ জুলাই, ২০২৬। ১৫ দিন শেষ। কাল বৃহস্পতিবার তিন ভাইবোন মাসির বাড়ী যাবেন। অনবাসর পর্ব শেষ হতেই তাই বুধবার ভোরে খুলে গেল দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজা। স্নানযাত্রার পর নিয়ম মেনে টানা ১৫ দিন ভক্তদের দর্শন দেন না মহাপ্রভু জগন্নাথ, দাদা বলরাম এবং বোন সুভদ্রা। সেই বিরহ পর্ব কাটিয়ে এদিন ফের ভক্তদের সামনে আবির্ভূত তিন দেবতা। সেই মুহূর্তকে ঘিরে সকাল থেকেই দিঘার মন্দির চত্বরে এক অনন্য পরিবেশ ! ভোর ৬টায় মন্দিরের দরজা খুলতেই হাজার হাজার ভক্ত প্রভুর দর্শনের আশায়। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রসাদ, আবার কারও চোখে শুধু এক ঝলক দর্শনের আকুলতা। প্রভুর দর্শন পেয়ে ভক্তদের মুখে তৃপ্তির হাসি, চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে—‘জয় জগন্নাথ’।
এই আবেগের মধ্যেই দিঘায় শুরু হয়ে গিয়েছে রথযাত্রার মহাপ্রস্তুতি। আগামীকাল, বৃহস্পতিবার মহাসমারোহে পালিত হবে রথযাত্রা। মন্দির কর্তৃপক্ষের অনুমান, এ বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হবে দিঘায়। সেই কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসন থেকে মন্দির কর্তৃপক্ষ সবাই ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। প্রায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত তিনটি রথও। রঙ্গীন সাজে সেজে উঠেছে রথগুলি, আগামীকাল মহাপ্রভুর যাত্রা আরও জাঁকজমকপূর্ণ ও স্মরণীয় করার জন্য।
রথযাত্রার আগে স্নানযাত্রা ও অনবাসর পর্বের বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব আছে। বিশ্বাস অনুযায়ী, স্নানযাত্রার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন মহাপ্রভু। তাই টানা ১৫ দিন তিনি জনসমক্ষে আসেন না। এই সময় তাই ভক্তরা তাঁর দর্শন থেকে বঞ্চিত ! সেই অনবাসর শেষ হতেই আবার দর্শন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার। তাই বুধবারের এই দিনটি ভক্তদের কাছে শুধুই একটি মন্দির খোলার দিন নয়, বরং আবেগ, বিশ্বাস এবং পুনর্মিলনের এক পবিত্র মুহূর্ত।
দিঘার মন্দিরের ট্রাস্টি ও প্রধান পুরোহিত রাধারমণ দাস বলেন, “অনবাসরের ১৫ দিন শেষে জগন্নাথ, বলরাম ও দেবী সুভদ্রার পুনরায় দর্শন লাভ ভক্তদের কাছে এক অপার আনন্দ ও আবেগের মুহূর্ত। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে দিঘার এই ঐতিহাসিক রথযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য সকলকে আন্তরিক আহ্বান জানাই।” তাঁর কথায়, এই উৎসব কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, মানুষের মিলন, ভক্তি ও ঐতিহ্যের এক মহাসম্মেলন।
গত বছর দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে প্রথম রথযাত্রার সূচনা করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবার রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি সরকার ক্ষমতায়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের রথযাত্রাও বিশেষ গুরুত্বর। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বছরের রথযাত্রায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাবা, কাঁথির প্রাক্তন সাংসদ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিশির অধিকারী। তিনিই বিকেলে রথের রশিতে প্রথম টান দেবেন।
ইতিমধ্যেই মন্দির কতৃপক্ষের রথযাত্রার পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচিও ঘোষিত। সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। বিশেষ পূজা-অর্চনার মাধ্যমে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে মন্দির থেকে বার করে তিনটি পৃথক রথে প্রতিষ্ঠা করা হবে। দুপুর ১টা থেকে দুপুর আড়াইটে পর্যন্ত তিনটি রথ সুসজ্জিত করে রথে অধিষ্ঠিত বিগ্রহদের ভোগ নিবেদন। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রথযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সাড়ে ৩টায় শিশির অধিকারীর হাতে শুভ সূচনা মহাপ্রভুর যাত্রার। সূচি অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৪টায় তিনটি রথ মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা মন্দিরে পৌঁছবে।
সমুদ্রের গর্জন, শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টার আওয়াজ, ভক্তদের জয়ধ্বনি আর বিশ্বাসের অদম্য টানে আগামীকাল নতুন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা দিঘার। শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এই রথযাত্রা হয়ে উঠুক ভক্তি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের মিলনমেলার মহোৎসব। বহু মানুষের বিশ্বাস, রথের রশিতে একবার টান দিতে পারলেই জীবনের বহু দুঃখ-কষ্ট দূর হয়, পূর্ণ হয় মনের অগণিত প্রার্থনা। সেই বিশ্বাস বুকে নিয়েই হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ আগামীকাল ভিড় জমাবেন দিঘার জগন্নাথধামে। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার মহাপ্রভু নিজেই কাল ভক্তদের মাঝে ! রথের চাকার সঙ্গে গড়িয়ে চলবে বিশ্বাস, আবেগ আর অনন্ত ভক্তির এক চিরন্তন যাত্রা।











Be First to Comment