Press "Enter" to skip to content

দ্যাশের বাড়ী এবার ট্রেনে যান…।

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১১ জুলাই, ২০২৬। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গত দেড় বছরে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৭ মাসের শাসনকালে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব দুই দেশের সম্পর্ককে অনেকটাই শীতল করে তোলে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিসরে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে। সেই আবহেই এবার বন্ধুত্বের আর এক বড় বার্তা ভারতের। কূটনীতির ভাষা ছাপিয়ে এবার সহযোগিতার হাত, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সস্তা ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের মাধ্যম—রেল পরিষেবায়।

বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে ভারত। খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি ব্রডগেজ কোচ পাঠাবে দিল্লি। এই কোচগুলি হাতে পেলেই দীর্ঘদিনের কোচ-সংকট কাটিয়ে একাধিক নতুন রেলপথে ট্রেন চালানোর সুযোগ তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, বহুদিন ধরে অব্যবহৃত নতুন রেললাইনগুলিতে প্রাণের সঞ্চার। দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান ও চিনের নানা কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আগের মতো ঘনিষ্ঠ নয়। তবু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে খাদ্যপণ্য ও ডিজেল পাঠিয়েছে ভারত। সম্প্রতি আম কূটনীতির মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঘটনাও নজর কেড়েছে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় রেল অবকাঠামো উন্নয়নে ২০০টি কোচ পাঠানোর সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে একাধিক নতুন ব্রডগেজ রেলপথ তৈরী হয়েছে। দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে যাতায়াতের লক্ষ্যেই এই প্রকল্পগুলি তৈরী করা হয়। কিন্তু রেললাইন তৈরি হলেও পর্যাপ্ত কোচ ও ইঞ্জিনের অভাবে সেই রুটগুলিতে ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো তৈরি হলেও ট্রেন চলাচল ছিলনা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মহম্মদ মহিউদ্দিন জানান, আগামী আগস্ট মাস থেকেই ভারত থেকে ২০০টি রেল কোচ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই কোচগুলি হাতে এলেই নতুন রুটে ধাপে ধাপে ট্রেন চালানো সম্ভব। ফলে যাত্রী পরিষেবার অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সালে যমুনা সেতু-পাবনা রেলপথ, ২০২২ সালে ঢাকা-পদ্মা সেতু-যশোর এবং ঢাকা-পদ্মা সেতু-ফরিদপুর রেলপথ চালু হয়। এরপর ২০২৪ সালে খুলনা-মোংলা রেলপথও উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত ব্রডগেজ ইঞ্জিন ও কোচ না থাকায় এসব রুটে পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রেন চালানো যায়নি। এমনকি যমুনা সেতু-পাবনা এবং খুলনা-মোংলা রুটে এখনও পর্যন্ত একটি ট্রেনও চালানো সম্ভব হয়নি। রেলওয়ে

মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানিয়েছেন, ভারতীয় কোচগুলি হাতে পাওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে ঢাকা-পাবনা রুটে ট্রেন চালু করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে ঢাকা-খুলনা রুটে নতুন ট্রেন চালানো হবে। সেই পরিষেবাকে ভবিষ্যতে মোংলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা যায় কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, নতুন কোচ আসার ফলে বর্তমানে চলা কিছু ট্রেনে নতুন কোচ যুক্ত করা হবে। পুরনো কোচগুলি ব্যবহার করে গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে একটি নতুন কমিউটার ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলের পাঁচটি ট্রেনে নতুন কোচ বসানো হবে। সেখান থেকে অব্যবহৃত হয়ে যাওয়া পুরনো কোচগুলি ব্যবহার করে বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা লোকাল, কমিউটার এবং মেইল ট্রেনগুলি আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে শুধু নতুন রুটই নয়, পুরনো পরিষেবাগুলিও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।

রেল সূত্রের দাবি, পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন ট্রেন পরিষেবা এখনও শুরু হয়নি। বর্তমানে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ছাড়া ঢাকা-খুলনা রুটে নতুন কোনও ট্রেন নেই। সুন্দরবন এক্সপ্রেস এবং বেনাপোল এক্সপ্রেসের রুট বদলে এখন পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে চললেও যশোর হয়ে সরাসরি যাওয়ার পরিবর্তে ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া ঘুরে চলাচল করছে। এতে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখনও রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্যসচিব জিল্লুর রহমান ভিটু জানান, যশোর, খুলনা ও ঝিনাইদহ থেকে সরাসরি ট্রেন চালু হলে সাধারণ মানুষের উপকার ছাড়াও রেলওয়েরও আর্থিক লাভ হবে। যশোর থেকে এখনও কোন ট্রেন নেই, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পাশাপাশি দর্শনা, ঝিনাইদহ ও কোটচাঁদপুরের মানুষও যশোর হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ চান। তাঁর হুঁশিয়ারি, বেনাপোল-ঢাকা, খুলনা-ঢাকা এবং দর্শনা-ঢাকা-সহ চারটি নতুন ট্রেন দ্রুত চালু না হলে আগামী আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন তাঁরা।

তবে এই দাবির বিষয়ে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানিয়েছেন, দর্শনাকে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও ভাবা হচ্ছে। কিন্তু ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াশপিট এখনও তৈরি হয়নি। সেই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই রুটে নতুন ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। তবে অন্যান্য রুটে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন ট্রেন চালু করা হবে।

এদিকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ সরকার। সম্প্রতি সংসদে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, যাত্রীদের আরও আরামদায়ক পরিষেবা দেওয়া এবং মাল পরিবহণ বাড়িয়ে রেলওয়ের আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে ২৬০টি ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ, ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ এবং ৫০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সীমান্তের দুই প্রান্তে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রেলের চাকা আবার নতুন করে বন্ধুত্বের পথ আঁকতে শুরু করেছে। ভারতের পাঠানো ২০০টি কোচ শুধু বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার গতি বাড়াবে না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, যোগাযোগ এবং সহযোগিতার নতুন দিগন্তও খুলে দিতে পারে। কখনও কখনও কূটনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা কোনও বৈঠকের টেবিলে নয়, ছুটে চলা একটি ট্রেনের হুইসেলেই ধরা পড়তে পারে।

আমাদের তরফ থেকেও শুভেচ্ছা থাকল ভারত সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতি।

 

More from TravelMore posts in Travel »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *