বাঙালির লোকবিশ্বাস, শাস্ত্রীয় অনুশাসন, আয়ুর্বেদ, ঋতুচক্র, পিতৃস্মরণ ও চোদ্দো প্রদীপের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য
ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ কলকাতা, ৭ নভেম্বর, ২০২৬। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর সেই পার্বণের ভিড়ে এমন একটি বিশেষ তিথি রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূত-প্রেত, পিতৃপুরুষ, যমরাজ, চোদ্দো শাক, চোদ্দো প্রদীপ, ঋতু পরিবর্তন, আয়ুর্বেদীয় জীবনচর্যা এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে উত্তরণের এক আশ্চর্য সাংস্কৃতিক দর্শন। সেই তিথির নাম ভূত চতুর্দশী।
কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে, দীপাবলি বা দীপান্বিতা অমাবস্যা এবং বাংলার কালীপুজোর ঠিক আগের দিন বাঙালি হিন্দু পরিবারে পালিত হয় এই বিশেষ লোকাচার। এই দিনটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ১৪ সংখ্যাটি। দুপুরে চোদ্দো রকম শাক খাওয়ার প্রথা, সন্ধ্যায় বাড়ির বিভিন্ন স্থানে চোদ্দোটি প্রদীপ জ্বালানো এবং চোদ্দো পুরুষ পূর্বপুরুষকে স্মরণ করার রীতি—সব মিলিয়ে ভূত চতুর্দশী বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।প্রশ্ন জাগে, কেন চোদ্দোটি শাক? কেন চোদ্দোটি প্রদীপ? কেনই বা চোদ্দো পুরুষের স্মরণ? এই ১৪ সংখ্যার সঙ্গে কি যমরাজের সম্পর্ক রয়েছে? ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে চোদ্দো শাক খাওয়ার কোনও স্বাস্থ্যসম্মত সম্পর্ক আছে কি? আর ভূত চতুর্দশীর সঙ্গে পাশ্চাত্যের হ্যালোউইন উৎসবেরই বা কোথায় মিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি প্রবেশ করেছি বাঙালির লোকসংস্কৃতি, পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র, আয়ুর্বেদীয় ধারণা এবং নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের জগতে।
১. ভূত চতুর্দশী : তিথি, লোকবিশ্বাস ও প্রাচীন ঐতিহ্য কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলায় এই দিনটি ভূত চতুর্দশী নামে পরিচিত। ভারতের অন্য কিছু অঞ্চলে একই সময়ের উৎসব নরক চতুর্দশী বা কালী চৌদস নামে পরিচিত।
বাঙালির লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ রাতে মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মারা প্রেতলোক থেকে মর্ত্যে ফিরে আসেন। বিশেষ করে যাঁরা পরলোকগমন করেছেন, তাঁদের স্মরণে বাড়ির বিভিন্ন স্থানে প্রদীপ জ্বালানো হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই আলো তাঁদের পরিচিত গৃহে ফিরে আসার পথ দেখায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ভূত চতুর্দশী কেবল ভূত তাড়ানোর দিন নয়; বরং অনেক বাঙালি পরিবারের কাছে এটি মৃত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার দিন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের প্রতি সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী উপলক্ষ।
লোকবিশ্বাস অনুসারে, মানুষের পূর্ববর্তী চোদ্দো পুরুষের আত্মীয়তা ও আশীর্বাদের সঙ্গে এই তিথির সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই সন্ধ্যায় চোদ্দোটি প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁদের পথ আলোকিত করার রীতি প্রচলিত হয়েছে।
আবার অন্য একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে অশুভ শক্তি, ভূত-প্রেত ও অশরীরী সত্তার আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। বাড়ির অন্ধকার কোণে প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই অশুভ শক্তিকে দূরে রাখা হয়। কোথাও কোথাও দেবী চামুণ্ডা এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত চতুর্দশ শক্তির আরাধনার কথাও লোকমুখে প্রচলিত।
তবে এই সব ব্যাখ্যার সবগুলিরই সমান শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এগুলিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।
২. কেন ১৪ সংখ্যার এত গুরুত্ব?
ভূত চতুর্দশীর প্রতিটি প্রধান আচারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ১৪ সংখ্যাটি।
চোদ্দো রকম শাক খাওয়া।
চোদ্দোটি প্রদীপ জ্বালানো।
চোদ্দো পুরুষ পূর্বপুরুষকে স্মরণ।
যমরাজের চোদ্দোটি নামের উল্লেখ।
চতুর্দশী তিথির বিশেষ মাহাত্ম্য।
হিন্দু ধর্মীয় ও লোকসংস্কৃতিতে ১৪ সংখ্যার আরও কিছু প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। পুরাণে চোদ্দো ভুবনের কথা বলা হয়েছে। সাতটি ঊর্ধ্বলোক এবং সাতটি অধোলোক মিলিয়ে চতুর্দশ ভুবনের ধারণা গড়ে উঠেছে।
ঊর্ধ্বলোকগুলি হলো—ভূর্লোক, ভুবর্লোক, স্বর্লোক, মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক। অন্যদিকে অধোলোকের সাতটি স্তর হলো—অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল।
এই চতুর্দশ ভুবনের ধারণা ভারতীয় পুরাণে সৃষ্টিজগতের ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিকতার প্রতীক।
তবে ভূত চতুর্দশীর চোদ্দো শাক বা চোদ্দো প্রদীপের উৎপত্তি সরাসরি চতুর্দশ ভুবনের ধারণা থেকেই হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং ১৪ সংখ্যাটিকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও লোকাচার সময়ের সঙ্গে পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে বলে মনে হয়।
৩. চোদ্দো শাক খাওয়ার প্রথা : প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্ক
ভূত চতুর্দশীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো দুপুরে চোদ্দো রকম শাক ভাজা খাওয়ার রীতি।
এই প্রথার সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।
শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমন। দিনের বেলায় উষ্ণতা থাকলেও রাতের দিকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। বাতাসে শীতের আভাস পাওয়া যায়। প্রকৃতিতে ঘটে ঋতুর পরিবর্তন। খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও আসে পরিবর্তন।
একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র, বিশেষত আয়ুর্বেদ পড়ে জেনেছি , ঋতু অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ঋতুচর্যা (Ritucharya)।
আয়ুর্বেদীয় ধারণা অনুযায়ী, ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরের দোষ-ধাতু-মলের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। সেই কারণে খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম, ব্যায়াম ও দৈনন্দিন আচরণে ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খাওয়ারও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। সবুজ শাকপাতায় থাকে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং ফাইটোকেমিক্যাল। বিভিন্ন ধরনের শাক খেলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য আসে।
বিশেষ করে শীতের আগমনের সময় সহজলভ্য দেশীয় শাকপাতা খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একটি ভালো খাদ্যাভ্যাস।
তবে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন—চোদ্দো রকম শাক একদিন খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যায়, এমন কোনও প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং নিয়মিত সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে বিভিন্ন শাকসবজি খাওয়াই স্বাস্থ্যকর।
অর্থাৎ প্রাচীন লোকাচারের মধ্যে ঋতুভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের যে ধারণা রয়েছে, তার সঙ্গে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
৪. স্মৃতিশাস্ত্রে চোদ্দো শাক : রঘুনন্দনের উল্লেখ
ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের নাম চোদ্দো শাকের প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর স্মৃতিশাস্ত্রীয় রচনায় ভূত চতুর্দশীর দিনে চোদ্দো রকম শাক খাওয়ার বিধানের উল্লেখ পাওয়া যায় বলে প্রচলিত।
সেই উদ্ধৃত শ্লোকটি হলো ৷ যা আমার লেখা
“ওলং কেমুকবাস্তুকং সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলকং গুড়ুচীন্তথা॥
ভন্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ।
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ॥”
এই শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ভূত চতুর্দশী তিথিতে নির্দিষ্ট শাকগুলি ভক্ষণ করার ধর্মীয় মাহাত্ম্য রয়েছে।
শ্লোকের শব্দগুলির আঞ্চলিক ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন পাঠ ও ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তাই প্রাচীন নামগুলির সঙ্গে আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের নাম মেলানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—প্রাচীন স্মৃতিশাস্ত্রে খাদ্যাভ্যাসকে শুধু শরীরের প্রয়োজন হিসেবে দেখা হয়নি; ধর্মীয় কর্তব্য, ঋতুচক্র, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক জীবনযাত্রার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে চোদ্দো শাকের প্রথা কেবল রান্নার একটি বিশেষ আয়োজন নয়, বরং ধর্মীয় সংস্কার ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের এক মিলিত নিদর্শন।
৫. চোদ্দো শাক : নাম, পরিচয়, পুষ্টিগুণ ও প্রচলিত ভেষজ ব্যবহার
বিভিন্ন অঞ্চল, পরিবার ও পঞ্জিকা অনুসারে চোদ্দো শাকের তালিকায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। রঘুনন্দনের নামে প্রচলিত তালিকা এবং বর্তমানে বাজারে সহজলভ্য শাকের তালিকা সব সময় এক নয়।
কোথাও ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দে, নিম, সর্ষে, শালিঞ্চা, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু, হিঞ্চে, সুষনি ও শেলু উল্লেখ করা হয়। আবার কোথাও স্থানীয়ভাবে পাওয়া শাক দিয়ে তালিকা সম্পূর্ণ করা হয়।
১. বেতো শাক (Chenopodium album)
বেতো শাক বা বাস্তুক শাক বাংলার অতি পরিচিত একটি শাক। ইংরেজিতে একে Lamb’s quarters বলা হয়।
এই শাকে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান থাকে। খাদ্যআঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
লোকজ চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদীয় ব্যবহারে বেতো শাককে কৃমিনাশক, কোষ্ঠকাঠিন্য ও অম্বল প্রশমনে সহায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মুখে রুচি ফেরানোর ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার প্রচলিত।
বৈষ্ণব সাহিত্যে, বিশেষত শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের খাদ্যবর্ণনায়, বেতো শাকের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে এই শাকের সঙ্গে বাঙালির ধর্মীয় ও খাদ্যসংস্কৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে।
২. কালকাসুন্দে শাক (Senna sophera / Cassia sophera)
কালকাসুন্দে একটি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। প্রাচীন লোকচিকিৎসায় এর বিভিন্ন অংশের ব্যবহার রয়েছে।
প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসায় অ্যালার্জিজনিত সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অর্শ, ফিসচুলা, হুপিং কাশি এবং দাদজাতীয় চর্মসমস্যায় এর ব্যবহারের কথা বলা হয়।
এতে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। তবে এসব রোগের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা সম্পর্কে আধুনিক বা ক্লিনিক্যালি প্রমাণ কম । ওষুধের বিকল্প নয় সাথে খাওয়া
উচিত।
৩. নিমপাতা (Azadirachta indica)
নিম ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম পরিচিত ভেষজ বৃক্ষ।
নিমপাতায় বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে নিম্বোলাইড, আজাদির্যাকটিনসহ বিভিন্ন লিমোনয়েড শ্রেণির উপাদান নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
লোকজ চিকিৎসায় চর্মরোগ, খোসপাঁচড়া, ক্ষত, কৃমি এবং বিভিন্ন ত্বকের সমস্যায় নিমের ব্যবহার বহুল প্রচলিত।ম্যালেরিয়া, জন্ডিস, কুষ্ঠ এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসাতেও ঐতিহ্যগতভাবে নিমের উল্লেখ পাওয়া যায়।
৪. জয়ন্তী শাক (Sesbania sesban)
জয়ন্তী একটি পরিচিত ঔষধি উদ্ভিদ। আয়ুর্বেদীয় ও লোকজ চিকিৎসায় এর বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বহুমূত্র, শ্বেতী, জ্বর, কৃমি এবং সর্দিজনিত সমস্যায় এর ব্যবহার রয়েছে। প্রসূতি-পরবর্তী পরিচর্যার ক্ষেত্রেও লোকজ চিকিৎসায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে সদ্য প্রসূতিদের জন্য এটি বিশেষ উপকারী বা নির্দিষ্ট রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত নয়।
৫. গুলঞ্চ শাক (Tinospora cordifolia)
গুলঞ্চ বা গুডুচি ভারতীয় আয়ুর্বেদে বহুল পরিচিত একটি ঔষধি লতা।
এর পাতা ও কাণ্ডে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় জ্বর, বাতরক্ত, পিত্তজনিত সমস্যা, কৃমি এবং বিভিন্ন প্রদাহজনিত অবস্থায় এর ব্যবহার প্রচলিত।
প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে গুলঞ্চকে রসায়ন শ্রেণির ভেষজ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
তবে গুলঞ্চের ক্ষেত্রে একটি সতর্কতা জরুরি। কিছু ক্ষেত্রে গুলঞ্চজাতীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পরও যকৃতের ক্ষতির ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। তাই দীর্ঘদিন বা বেশি মাত্রায় সেবন নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না।
৬. সুষনি শাক (Marsilea quadrifolia)
সুষনি একটি জলজ বা জলাভূমিতে জন্মানো উদ্ভিদ। এর পাতাগুলি চারটি খণ্ডে বিভক্ত থাকে।
লোকজ চিকিৎসায় সুষনি শাককে প্রশান্তিদায়ক বলে মনে করা হয়। প্রচলিত ব্যবহারে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক অস্থিরতা ও ঘুমের সমস্যায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রশান্তিদায়ক প্রভাবের কথাও লোকজ চিকিৎসায় প্রচলিত।
৭. পলতা পাতা বা পটলের শাক (Trichosanthes dioica)
পটল লতাজাতীয় উদ্ভিদ। এর কচি পাতা ও ডগা বিভিন্ন অঞ্চলে শাক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আয়ুর্বেদীয় ও লোকজ চিকিৎসায় পটলকে পিত্তজনিত সমস্যা, যকৃতের অসুবিধা, চর্মরোগ এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় উপকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রচলিত ধারণায় এটি রক্তবর্ধক হিসেবেও পরিচিত।
তবে পলতা ও পটলের শাকের আঞ্চলিক নামের ব্যবহারে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই উদ্ভিদটির সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা জরুরি।
৮. হিঞ্চে বা হিলঞ্চে শাক (Enhydra fluctuans)
হিঞ্চে বাংলার জলাভূমি ও স্যাঁতসেঁতে অঞ্চলে জন্মানো একটি পরিচিত শাক।
এতে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান, ফাইটোকেমিক্যাল এবং ফাইটোস্টেরল রয়েছে।
লোকজ চিকিৎসায় হিঞ্চেকে পিত্তনাশক, রক্তশোধক, ক্ষুধাবর্ধক এবং জ্বর প্রশমক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
হিমোগ্লোবিন বাড়ানো এবং রক্তাল্পতা দূর করার ক্ষেত্রেও এর উপকারিতার কথা প্রচলিত। তবে হিঞ্চে খেলেই রক্তাল্পতা সেরে যায়, এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
এটি একটি পুষ্টিকর দেশীয় শাক হিসেবে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
৯. পালং শাক (Spinacia oleracea)
পালং শাক অত্যন্ত পুষ্টিকর সবুজ শাক। এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফোলেট, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে।
রক্ত গঠনে প্রয়োজনীয় ফোলেট ও আয়রনসহ নানা পুষ্টি উপাদান এতে পাওয়া যায়।
পালং শাকের বিটা-ক্যারোটিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে থাকা ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমর্থন করে।
লোকজ চিকিৎসায় পালং পাতার রস পোড়াঘা, ক্ষত, ব্রণ বা কালশিটে স্থানে লাগানোর প্রচলন রয়েছে। তবে ক্ষত বা পোড়া জায়গায় অপরিশোধিত পাতার রস লাগানো সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
১০. লাল শাক (Amaranthus spp.)
লাল শাক বাঙালির অতি প্রিয় একটি শাক। এর লালচে রংয়ের জন্য দায়ী উদ্ভিজ্জ রঞ্জক পদার্থ, বিশেষত বেটালেইন জাতীয় উপাদান।
এতে ভিটামিন এ-র পূর্বসূরি ক্যারোটিনয়েড, খাদ্যআঁশ, ফোলেট, আয়রন ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থাকে।
দৃষ্টিশক্তি ও স্বাভাবিক কোষের কার্যকারিতার জন্য এর পুষ্টি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যআঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে লাল শাক ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে।
১১. পুঁই শাক (Basella alba)
পুঁই শাক বাংলার পরিচিত লতানো শাক। এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং খাদ্যআঁশ রয়েছে।
এর পিচ্ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিউসিলেজ বা উদ্ভিজ্জ আঠালো উপাদানের সম্পর্ক রয়েছে। এই উপাদান খাদ্যআঁশের মতো অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় সহায়তা করতে পারে।
তবে পুঁই শাক কিছু মানুষের কাছে গুরুপাক মনে হতে পারে। আমাশা বা ডায়রিয়ার সময় ব্যক্তিভেদে সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করা উচিত।
রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বেশি থাকলে পুঁই শাক একেবারেই বর্জন করতে হবে—এমন সর্বজনীন চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক নির্দেশ নেই। গাউটের রোগীদের খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা উচিত।
১২. কলমি শাক (Ipomoea aquatica)
কলমি শাক জলাভূমিতে জন্মানো একটি জনপ্রিয় শাক।
এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ-র পূর্বসূরি ক্যারোটিনয়েড, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ রয়েছে।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন কে হাড়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খাদ্যতালিকায় কলমি শাক অন্তর্ভুক্ত করলে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণে সাহায্য পাওয়া যায়।
তবে জলাভূমি থেকে সংগৃহীত কলমি শাক দূষিত জল ও পরজীবীর সংস্পর্শে থাকতে পারে। তাই ভালোভাবে পরিষ্কার করে সম্পূর্ণ রান্না করে খাওয়া জরুরি।
১৩. নোটে বা নটে শাক (Amaranthus spp.)
নটে শাক বাংলার একটি সহজলভ্য ও পুষ্টিকর শাক। এর সবুজ ও লাল—দুই ধরনের জাতই দেখা যায়।
এতে খাদ্যআঁশ, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফোলেট, ভিটামিন সি এবং ক্যারোটিনয়েড পাওয়া যায়।
লোকজ চিকিৎসায় নটে শাককে পিত্তনাশক, রক্ত পরিষ্কারকারী এবং মেদ কমানোর সহায়ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি ভালো সবুজ শাক। তবে রক্ত পরিষ্কার করা বা সরাসরি শরীরের মেদ গলিয়ে দেওয়ার মতো দাবি প্রমাণিত নয়।১৪. মেথি শাক (Trigonella foenum-graecum)
মেথি শাকের পুষ্টিগুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে।
মেথির পাতায় অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট উপাদান পাওয়া যায়। মেথির বীজে থাকা দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ ও অন্যান্য উপাদান রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে।
লোকজ ও আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় মেথিকে তারুণ্য রক্ষা, হজমশক্তি বৃদ্ধি, হতাশা প্রশমন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং যৌনস্বাস্থ্য ভালো রাখার সহায়ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে মেথি শাক বা মেথি বীজ ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়। গর্ভাবস্থায় বা নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মেথি সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
৬. আরও যেসব শাক চোদ্দো শাকের তালিকায় পাওয়া যায়
আপনার উল্লেখ করা প্রধান শাকগুলির পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আরও কয়েকটি শাক চোদ্দো শাকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সর্ষে শাক (Brassica campestris / Brassica juncea): এতে ভিটামিন এ, সি, কে, ফোলেট, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রয়েছে। শীতের খাদ্যতালিকায় সর্ষে শাকের বিশেষ স্থান রয়েছে।
ওল শাক বা ওল (Amorphophallus paeoniifolius): ওল কন্দজাতীয় উদ্ভিদ। এর কচি পাতা ও অন্যান্য অংশ কিছু অঞ্চলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে কাঁচা বা অপর্যাপ্ত রান্না করা অংশে ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কারণে জ্বালাপোড়া হতে পারে।
কুমড়ো শাক (Cucurbita spp.): কুমড়োর কচি পাতা ও ডগায় খাদ্যআঁশ, ক্যারোটিনয়েড ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।
মূলো শাক (Raphanus sativus): মূলোর পাতায় ভিটামিন সি, ক্যারোটিনয়েড, ক্যালসিয়াম এবং খাদ্যআঁশ রয়েছে।
লাউ শাক (Lagenaria siceraria): লাউয়ের কচি পাতা ও ডগা বাংলার পরিচিত খাদ্য। এতে জলীয় অংশ, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থাকে।
গিমে শাক: বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিত দেশীয় শাক। লোকজ চিকিৎসায় যকৃত ও জন্ডিসের সমস্যায় এর ব্যবহার প্রচলিত। তবে জন্ডিসের চিকিৎসা হিসেবে এর কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয়।
পাট শাক (Corchorus spp.): এতে খাদ্যআঁশ, বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান থাকে। এর পিচ্ছিল উপাদান অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় সহায়তা করতে পারে।
ঘেঁটু বা ভাঁট (Clerodendrum infortunatum): বাংলার পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। লোকজ চিকিৎসায় চর্মরোগ, জ্বর ও বিভিন্ন প্রদাহজনিত সমস্যায় এর ব্যবহার প্রচলিত।
শেলু, কেও ও শালিঞ্চা: প্রাচীন তালিকায় উল্লেখিত কয়েকটি নাম। স্থানীয় নামের পার্থক্যের কারণে এদের সুনির্দিষ্ট উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় নির্ধারণে অঞ্চলভেদে সতর্কতা প্রয়োজন।
এই তালিকা থেকে বোঝা যায়, চোদ্দো শাকের প্রথাটি কোনও একটিমাত্র স্থির বাজারি তালিকার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং স্থানীয় জলবায়ু, মাটি, জলাভূমি, কৃষি এবং খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
৭. চোদ্দো শাকের পুষ্টিবৈজ্ঞানিক গুরুত্ব
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিভিন্ন ধরনের শাক খাওয়ার কয়েকটি বিশেষ উপকারিতা রয়েছে।
ক. ভিটামিনের উৎস: শাকপাতায় ভিটামিন এ-র পূর্বসূরি ক্যারোটিনয়েড, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে এবং ফোলেট পাওয়া যায়।
খ. খনিজ পদার্থ: আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো খনিজ পদার্থ শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় ভূমিকা পালন করে।
গ. খাদ্যআঁশ: অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সাহায্য করে।
ঘ. অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট: বিভিন্ন শাকের ক্যারোটিনয়েড, পলিফেনল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদান কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
ঙ. খাদ্যবৈচিত্র্য: বিভিন্ন শাকের পুষ্টি উপাদান এক নয়। তাই একাধিক ধরনের শাক খেলে খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়ে।
তবে শাকের আয়রন উদ্ভিজ্জ উৎসের নন-হিম আয়রন। ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খেলে এর শোষণ বাড়তে পারে। আবার কিছু শাকে অক্সালেট ও ফাইটেটের মতো উপাদান থাকায় খনিজের শোষণ প্রভাবিত হতে পারে।
অতএব চোদ্দো শাক খাওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্যগত তাৎপর্য হলো—বিভিন্ন দেশীয় শাকের মাধ্যমে শরীরকে নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা।
৮. যমরাজ ও যমের চোদ্দো নাম : যা আজকের চতুর্দশীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
ভূত চতুর্দশীর সঙ্গে মৃত্যুর দেবতা যমরাজের সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে যম হলেন মৃত্যুর অধিপতি এবং ধর্মের বিচারক। তিনি ধর্মরাজ নামেও পরিচিত। জীবনের অবসানে মানুষের কর্ম অনুসারে পরলোকের গতি নির্ধারণের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে।
যমের সঙ্গে যুক্ত চোদ্দোটি নামের একটি প্রচলিত তালিকা হলো—
১. যম
২. ধর্মরাজ
৩. মৃত্যু
৪. অন্ত
৫. বৈবস্বত
৬. কাল
৭. সর্বভূতেশ্বর
৮. ঔড়ুম্বর
৯. দধ্ন
১০. নীল
১১. পরমেষ্ঠী
১২. বৃকোদর
১৩. চিত্র
১৪. চিত্রগুপ্ত।
এই নামগুলির বানান ও পাঠভেদ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়। আপনার দেওয়া তালিকায় যেমন রয়েছে, তেমনই প্রচলিত রূপটি এখানে রাখা হলো।
যদিও চিত্রগুপ্ত যমরাজের হিসাবরক্ষক হিসেবেই পরিচিত। মানুষের পাপ-পুণ্য, কর্ম ও জীবনের হিসাব তাঁর কাছে সংরক্ষিত থাকে বলে পুরাণে বর্ণনা রয়েছে।
যমের এই চোদ্দো নামের সঙ্গে চতুর্দশী তিথির একটি ধর্মীয় প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। মৃত্যুর অনিবার্যতা, কর্মফল, ধর্মপালন এবং জীবনের নশ্বরতা—এই সমস্ত ভাবনা এই তিথির সঙ্গে মিশে আছে।
স্কন্দপুরাণের কার্তিক মাসের মাহাত্ম্যবিষয়ক বর্ণনায় যমের উদ্দেশ্যে তর্পণ ও প্রদীপদানের প্রসঙ্গ পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়। তবে বাংলার চোদ্দো প্রদীপের বর্তমান পারিবারিক রীতির সঙ্গে সেই পুরাণীয় আচারের সরাসরি ঐতিহাসিক যোগসূত্র কতটা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
৯. ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দো প্রদীপ : অন্ধকার দূর করার প্রতীক
ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যা নামলেই বাঙালি বাড়িতে শুরু হয় চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর আয়োজন।
আগে বাড়ির মহিলারা মাটির প্রদীপ তৈরি করতেন। সরষের তেল বা ঘি দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হতো। বাড়ির দরজা, জানালা, উঠোন, তুলসীতলা, সিঁড়ি, ছাদ এবং অন্ধকার কোণে প্রদীপ রাখা হতো।
এখন অনেক জায়গায় মাটির প্রদীপের পাশাপাশি মোমবাতি ও বৈদ্যুতিক আলোও ব্যবহার করা হয়।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই চোদ্দো প্রদীপ চোদ্দো পুরুষ পূর্বপুরুষকে পথ দেখায়। তাঁরা যেন তাঁদের পরিচিত গৃহে আসতে পারেন এবং আলো পেয়ে আনন্দিত হন।
আবার অন্য একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, প্রদীপের আলো অশুভ শক্তি ও অশরীরী সত্তাকে দূরে রাখে।
প্রদীপ জ্বালানোর মধ্যে একটি সুন্দর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক অর্থও রয়েছে। অন্ধকার মানুষের মনে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অজানার অনুভূতি সৃষ্টি করে। আলো সেই অন্ধকার দূর করে আশ্বাস, নিরাপত্তা ও আশার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সুতরাং চোদ্দো প্রদীপ কেবল ভূত তাড়ানোর উপাচার নয়; এটি পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিবারের মঙ্গলকামনা এবং জীবনের অন্ধকার অতিক্রম করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
১০. প্রদীপ প্রজ্বালনের মন্ত্র
প্রদীপ জ্বালানোর সময় বিভিন্ন পরিবারে বিভিন্ন মন্ত্র পাঠের রীতি রয়েছে।
প্রচলিত প্রদীপ বন্দনার একটি মন্ত্র হলো—
“শুভং করোতি কল্যাণং
আরোগ্যং ধনসম্পদাম্।
শত্রুবুদ্ধিবিনাশায়
দীপজ্যোতির্নমোऽস্তুতে॥”
অর্থাৎ, হে প্রদীপের জ্যোতি, তুমি শুভ, কল্যাণ, আরোগ্য ও সমৃদ্ধি প্রদান করো। অশুভ চিন্তা ও শত্রুভাব দূর করো। তোমাকে প্রণাম জানাই।
আর একটি বহুল প্রচলিত শ্লোক—
“দীপজ্যোতিঃ পরং ব্রহ্ম
দীপজ্যোতির্জনার্দনঃ।
দীপো হরতি মে পাপং
সন্ধ্যাদীপ নমোऽস্তুতে॥”
অর্থ—প্রদীপের জ্যোতিই পরম ব্রহ্ম, প্রদীপের জ্যোতিই নারায়ণ। এই জ্যোতি আমার অজ্ঞানতা ও পাপ দূর করুক। সন্ধ্যার প্রদীপকে প্রণাম।
প্রদীপ জ্বালানোর সময় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে ভক্তিভরে বলা যেতে পারে—
“ওঁ পিতৃভ্যঃ স্বধা নমঃ।
ওঁ পিতামহেভ্যঃ স্বধা নমঃ।
ওঁ প্রপিতামহেভ্যঃ স্বধা নমঃ।”
অর্থাৎ, পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ—সকল পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা ও স্বধা নিবেদন করছি।
এটি পিতৃস্মরণ ও তর্পণসংক্রান্ত একটি প্রচলিত শ্রদ্ধা নিবেদনের রূপ। পূর্ণাঙ্গ তর্পণের বিধি পরিবার ও শাস্ত্রীয় পরম্পরা অনুযায়ী পৃথক হতে পারে।
১১. পিতৃস্মরণ ও পিতৃস্তোত্র পাঠ
ভূত চতুর্দশীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা।
ছবি প্রতীকী। লোকেশন ভূতের রাজা দিল বর সল্টলেক সেক্টর ফাইভ।










Be First to Comment