Press "Enter" to skip to content

কলকাতার বনেদিয়ানার ছোঁয়া বেঙ্গালুরুর পালবাড়ির দুর্গাপুজোয়, ঐতিহ্য আর আন্তরিকতায় মুগ্ধ প্রবাসীরাও…।

নিজস্ব প্রতিনিধি : বেঙ্গালুরু, ২০ অক্টোবর, ২০২৬।  কর্মসূত্রে শহর ছেড়ে দূর রাজ্যে বসবাস, কিন্তু মন জুড়ে সেই কলকাতার পুজো। শৈশবের স্মৃতি, বনেদি বাড়ির সাবেকিয়ানা আর বাঙালির চিরাচরিত দুর্গোৎসবের আবেগকে সঙ্গী করেই বেঙ্গালুরুর বুকে জমে উঠেছে পালবাড়ির দুর্গাপুজো। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাজসজ্জা, আচার-অনুষ্ঠান এবং আপ্যায়নে নজর কাড়ছে এই পুজো। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স এলাকার এই পুজো দেখতে প্রতি বছরই ভিড় করেন বহু মানুষ। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজে মুখর পালবাড়ির প্রাঙ্গণ।

এবারের পুজোর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর দেবী সেট্টি। উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার ফটো জার্নালিস্ট জোয়া লোবো।

উল্লেখ্য, পালবাড়ির এই পুজোর প্রতিমা থেকে পুজোর উপাচার, ভোগ থেকে মিষ্টি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাঙালির চেনা ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা। কলকাতা থেকে প্রতিমাশিল্পী এনে তৈরি করা হয়েছে দেবীমূর্তি। পুজোর ভোগ ও মিষ্টি তৈরির জন্যও কলকাতা থেকে আনা হয়েছে অভিজ্ঞ রাঁধুনি ও হালুইকর। রয়েছেন পুরোহিতও। পুজোর সঙ্গে যুক্ত সকলের থাকা-খাওয়ার জন্য করা হয়েছে উন্নতমানের ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে, ভিনরাজ্যে থেকেও কলকাতার দুর্গাপুজোর পূর্ণাঙ্গ স্বাদ তুলে ধরার প্রয়াস পাল পরিবারের।

এই পুজোর নেপথ্যে রয়েছেন রোজী পাল। কলকাতার শ্যামবাজারে বড় হয়ে ওঠা রোজীর ছোটবেলার পুজোর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন তাঁর বাবা লোকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাবার হাত ধরে কলকাতার বিভিন্ন দুর্গাপুজো ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাই তাঁর মনে তৈরি করেছিল উৎসবের প্রতি গভীর টান। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় পুজোর সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সেই স্মৃতি ও আবেগকে বাঁচিয়ে রাখতেই কয়েক বছর আগে বেঙ্গালুরুতে দুর্গাপুজো শুরু করার উদ্যোগ নেন রোজী।

রোজীর শ্বশুরবাড়ি ফলতার জমিদার পরিবারে। দীর্ঘদিন বেলুড়ের বাসিন্দা হওয়ায় রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপুজো দেখতেও নিয়মিত যেতেন তিনি। ফলে তাঁর পুজোর ভাবনায় একদিকে যেমন রয়েছে কলকাতার শৈশবের স্মৃতি, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে বেলুড়ের ধর্মীয় পরিবেশ ও ঐতিহ্যের প্রভাব।

স্বামী সুজিত পালের কর্মসূত্রে বেঙ্গালুরুতে চলে আসার পর রোজীর জীবনও বাঁধা পড়ে এই শহরের সঙ্গে। তবে শহর বদলালেও বদলায়নি দুর্গাপুজোকে ঘিরে তাঁর আবেগ। সেই আবেগ থেকেই প্রবাসের মাটিতে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবকে আপন করে নেওয়ার উদ্যোগ।

একটি বিশাল ফ্ল্যাটে আয়োজন করা হয়েছে পুজোর। পুজোর পাশাপাশি রয়েছে গান, আড্ডা এবং বাঙালির চিরাচরিত খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মিলনমেলায় পুজো হয়ে উঠেছে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ।

পুজোর ভাবনা ও পরিকল্পনায় রোজী পাল অগ্রণী ভূমিকা নিলেও, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পাল পরিবারের কর্তা সীতাংশুশেখর পাল এবং তাঁর স্ত্রী শিপ্রা পাল। তাঁরা বেঙ্গালুরুর স্থায়ী বাসিন্দা নন। কলকাতা থেকে পুজোর প্রয়োজনীয় উপাচার ও সামগ্রী নিয়ে গিয়ে প্রতিটি আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দিকে নজর রাখেন তাঁরা। পুজোর প্রতিটি রীতি যাতে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়, সেদিকেও থাকে বিশেষ নজর।

আজকের দিনে কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন অসংখ্য বাঙালি। কিন্তু দূরত্ব যে শিকড়ের টানকে মুছে দিতে পারে না, পালবাড়ির দুর্গাপুজো তারই উদাহরণ।

কলকাতা থেকে বহু দূরে বেঙ্গালুরুর মাটিতে তাই পালবাড়ির পুজোয় ধরা পড়ছে সেই চেনা শারদীয় আবেগ যেখানে দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি উদ্‌যাপিত হচ্ছে বাংলার সংস্কৃতি ও শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা।

More from CultureMore posts in Culture »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *