Press "Enter" to skip to content

পুরুষ মনের অদৃশ্য যন্ত্রণা….

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৫ মে, ২০২৬। ।উপার্জনের চাপ, দুর্বলতা লুকানো, একাকিত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য সমাজে পুরুষকে সাধারণত শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হ

“ছেলেরা কাঁদে না”,

“পুরুষ মানুষকে শক্ত হতে হয়”,

“সংসারের দায়িত্ব পুরুষের কাঁধে”।

এই কথাগুলি শুনতে সাধারণ হলেও, ধীরে ধীরে এগুলো পুরুষ মনের ভিতরে এক অদৃশ্য কারাগার তৈরি করে। সেখানে ভয় আছে, হতাশা আছে, ক্লান্তি আছে—কিন্তু প্রকাশের অধিকার নেই। সমাজ পুরুষের সফলতা দেখে, উপার্জন দেখে, দায়িত্ব পালন দেখে; কিন্তু তার নিঃশব্দ মানসিক যন্ত্রণাকে খুব কম মানুষই অনুভব করে।

নারীর কান্না দৃশ্যমান, পুরুষের কান্না অধিকাংশ সময় নীরব।

আর এই নীরবতাই আজ বহু পুরুষকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।

উপার্জনের চাপ : পুরুষ মানসিকতার এক অদৃশ্য যুদ্ধ বর্তমান সমাজে একজন পুরুষের মূল্য অনেক সময় তার উপার্জনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা হয়। সে কেমন মানুষ, কতটা সৎ, কতটা সংবেদনশীল—এসবের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় সে কত টাকা আয় করে।

একজন বেকার পুরুষকে সমাজ যেমন অবহেলা করে, তেমনি কর্মরত পুরুষকেও নিরন্তর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হয়।

চাকরি টিকিয়ে রাখা, সংসারের খরচ, সন্তানের শিক্ষা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তার মনের ভিতরে সারাক্ষণ চাপ জমতে থাকে।

এই চাপ অনেক সময় তাকে রূঢ়, খিটখিটে বা নীরব করে তোলে। কিন্তু মানুষ তখন তার আচরণ দেখে বিচার করে, তার ভিতরের ক্লান্তিকে নয়।

ছোট গল্প : “অর্ণবের হাসি”

অর্ণব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত।

সকালে বেরোত, গভীর রাতে ফিরত। বাড়িতে স্ত্রী, বৃদ্ধ মা এবং ছোট্ট ছেলে।

ছেলেটি একদিন বলল—

“বাবা, তুমি সবসময় এত চুপচাপ থাকো কেন?”

অর্ণব হেসে বলল—

“কাজের চাপ রে।”

কিন্তু সত্যিটা অন্য ছিল।

অফিসে কর্মী ছাঁটাই চলছিল। প্রতিদিন ভয় হতো—পরের নামটা যদি তার হয়! ব্যাংকের ঋণ, ছেলের স্কুল ফি, মায়ের ওষুধ—সবকিছু ভাবতে ভাবতে সে রাতে ঘুমোতে পারত না।

একদিন গভীর রাতে বারান্দায় বসে সে নিঃশব্দে কাঁদছিল।

স্ত্রী দেখে ফেলল।

অর্ণব তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল—

“ধুলো পড়েছিল চোখে।”

কারণ সে জানত—সমাজ পুরুষের কান্না দেখতে অভ্যস্ত নয়।

দুর্বলতা লুকানোর প্রবণতা – পুরুষের সবচেয়ে বড় মানসিক সংকট হলো—সে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে ভয় পায়।

কারণ তাকে শেখানো হয়েছে, দুর্বলতা মানেই অক্ষমতা।

ফলে একজন পুরুষ যখন ভেঙে পড়ে, তখনও সে হাসিমুখে দায়িত্ব পালন করে যায়।

অনেক পুরুষ ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, অনিদ্রা, ভয় কিংবা মানসিক অবসাদে ভুগলেও কাউকে বলতে পারে না।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে “Emotional Suppression” বলা হয়—অর্থাৎ অনুভূতিকে চেপে রাখা। দীর্ঘদিন ধরে এই দমন চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ, মদ্যপানের প্রবণতা, হঠাৎ রাগ, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও বাড়তে পারে। ছোট গল্প : “সৌম্যের নীরবতা”

সৌম্য কলেজে খুব প্রাণবন্ত ছেলে ছিল।

বন্ধুদের হাসাত, গান গাইত, সবার পাশে থাকত।

চাকরির পরে ধীরে ধীরে সে বদলে গেল।

বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেল। অফিস আর বাড়ি—এই ছিল তার জীবন।

একদিন তার বন্ধু রাহুল জিজ্ঞেস করল—

“কী হয়েছে তোর?”

সৌম্য মৃদু হেসে বলল—

“কিছু না, সব ঠিক আছে।”

কিন্তু কিছুই ঠিক ছিল না।

তার ভিতরে জমছিল ভয়, ব্যর্থতার বোধ, একাকিত্ব।

এক রাতে সে নিজের ডায়েরিতে লিখল—

“সবাই ভাবে আমি শক্ত মানুষ। অথচ আমি শুধু একটু ভরসা চাই।”

এই একটি বাক্যই বহু পুরুষ মনের বাস্তব চিত্র।

পুরুষের একাকিত্ব : ভিড়ের মধ্যেও নিঃসঙ্গতা

পুরুষের বন্ধু থাকে, পরিচিত মানুষ থাকে, সামাজিক অবস্থান থাকে—তবুও তার ভিতরে এক গভীর নিঃসঙ্গতা কাজ করতে পারে।

কারণ অধিকাংশ পুরুষ নিজের মনের কথা বলার মতো নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায় না।

সে ভয় পায়—

“আমার দুর্বলতা জানলে মানুষ আমাকে ছোট ভাববে।”

ফলে সে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে গুটিয়ে যায়।

অনেক বিবাহিত পুরুষও মানসিকভাবে অত্যন্ত একা। সংসারে দায়িত্ব আছে, কিন্তু অনুভূতির আদান-প্রদান নেই। তার ক্লান্তির খবর কেউ জানতে চায় না। সে যেন একটি “দায়িত্ব পালনকারী যন্ত্র” হয়ে ওঠে।

ছোট গল্প : “বৃদ্ধ বাবার অপেক্ষা”

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নির্মলবাবু প্রতিদিন বিকেলে বারান্দায় বসে থাকতেন।

ছেলে বড় চাকরি করে, শহরে থাকে।

ছেলে প্রতি মাসে টাকা পাঠাত, দামি মোবাইলও কিনে দিয়েছিল।

কিন্তু ফোন করার সময় পেত না। একদিন পাশের বাড়ির এক কাকু জিজ্ঞেস করলেন— “দাদা, ছেলে কবে আসবে?”

নির্মলবাবু হেসে বললেন—

“ও খুব ব্যস্ত।”

তারপর আস্তে করে বললেন—

“পুরুষরা বয়স বাড়লেও একা থাকে, শুধু সেটা কাউকে বলতে পারে না।”

মানসিক স্বাস্থ্য : পুরুষও মানুষ

সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বহু ভুল ধারণা আছে।

বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে।

অনেকেই মনে করেন—

পুরুষ যদি হতাশ হয়, কাঁদে বা সাহায্য চায়, তবে সে দুর্বল।

আসলে সত্যি তার উল্টো।

নিজের কষ্ট স্বীকার করা সাহসের কাজ। সাহায্য চাওয়া পরাজয় নয়, বরং মানসিক পরিপক্বতার পরিচয়।

একজন পুরুষেরও প্রয়োজন—

ভালোবাসা, মানসিক সমর্থন, নিরাপদ সম্পর্ক, অনুভূতি প্রকাশের অধিকার।

পুরুষও মানুষ।

তারও ভয় হয়, মন ভাঙে, অপমান লাগে, একা লাগে, ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে।

সম্পর্কের নতুন শিক্ষা

নারী ও পুরুষ—দুজনেই মানুষ, দুজনেরই মানসিক চাহিদা আছে। একজন নারী যেমন সম্মান ও বোঝাপড়া চান, একজন পুরুষও তেমনই চান একটু স্বীকৃতি, একটু সহানুভূতি।

একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন—

বিচার নয়, বোঝাপড়া

উপহাস নয়, সহমর্মিতা

নীরবতা নয়, খোলামেলা কথা

দায়িত্ব নয় শুধু, মানসিক সঙ্গও

যে পরিবারে পুরুষ তার দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে, সেই পরিবারই প্রকৃত অর্থে মানসিকভাবে সুস্থ পরিবার।

উপসংহার : পুরুষ মনের যন্ত্রণা অধিকাংশ সময় দৃশ্যমান নয়। তারা হয়তো রাস্তায় হাঁটে, অফিসে কাজ করে, হাসে, দায়িত্ব পালন করে—কিন্তু ভিতরে ভিতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।সমাজ যদি সত্যিই সুস্থ হতে চায়, তবে পুরুষকে শুধু “উপার্জনকারী” নয়, একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও দেখতে শিখতে হবে। একজন মনোবিদ হিসাবে লক্ষ্য করেছি। পুরুষের নীরবতা সবসময় শক্তির চিহ্ন নয়, অনেক সময় তা অব্যক্ত কান্নার অন্য নাম।

 

 

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *