Press "Enter" to skip to content

চৈত্র সংক্রান্তির চড়ক ও গাজন….।

Spread the love

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬।  দেবাদিদেব মহাদেব , হর হর বোম বোম , ‘ কাশীর বিশ্বনাথ কী জয় , জামালপুরের বাবা বুড়োরাজ কী জয় , মেড়তলার বুড়োশিব কী জয় ‘ এমন নানা নামে ” গা ” মানে গঞ্জ বা গ্রাম আর “জন” মানে জনগন বা ভক্তা সন্ন্যাসীরা ” গর্জন” করতে করতে স্থানীয় শিব বা ধর্মরাজকে মাথায় নিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করাই হলো ” গাজন ” ! চৈত্র সংক্রান্তির দিন শিবের “গাজন বা চড়ক পুজো ” বাঙালী হিন্দুর বছরের শেষ উৎসব ৷ চক্র থেকে চড়ক ৷ চারদিকে ঘোরে ৷ সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন হলো “সংক্রান্তি “৷ ঋগ্বেদে বজ্রবিদ্যুতের অধিদেবতা মরুৎগণের বাহন ‘পৃষতী’ ৷ যা অতি দ্রুতগামী৷ সংস্কৃত সাহিত্যে একে চিত্রা হরিণের মত বলে কল্পনা করা হয়েছে ৷ যে চান্দ্রমাসে চিত্রা নক্ষত্রে পূর্ণিমা তিথি হয় সেটাই সৌর চৈত্র মাস ৷ চৈত্র সক্রান্তিতে মঙ্গলময় শিবের উপাসনা গাজন ৷ চড়কের আগের দিন সমুদ্র মন্থনে বিষ পান করে নীল কন্ঠ হওয়া মহাদেবের নামে ঘরে ঘরে মেয়েরা করেন “নীলের উপোস ” ৷ ভগবানের কাছে সন্তানের মঙ্গল কামনায় ৷ তাই এই লোকায়ত উৎসব গাজনের আরেক নাম নীলের গাজন ৷ ব্রহ্মবৈবর্ত , বৃহদ্ধর্ম ও লিঙ্গপুরাণে , কিংবা গোবিন্দানন্দের বর্ষক্রিয়াকৌমুদী এবং রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বে এসময় শিব আরাধনার কথা আছে ৷ তবে , তা এখনকার চড়ক বা গাজনের মত নয় ৷ প্রচলিত ধারণা চড়ক বা গাজনের সূচনা ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের হাত ধরে ৷ চড়কের আগের দিন চড়ক গাছটিকে জলাশয় থেকে তুলে ধুয়ে মুছে খাড়া করা হয় ৷ জলভরা একটি পাত্রে শিবলিঙ্গ বা সিঁদুর মাখানো কাঠের তক্তা যা শিবের পাটা নামে পরিচিত তা রাখা হয় ৷ তাকে বলে “বুড়ো শিব” ৷ মালদহ , চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে এই গাজনেরই নাম ” গম্ভীরা ” ৷ জলপাইগুড়িতে বলে “গমীরা” ৷ যেখানে সঙ সেজে বিভিন্ন বিষয়ে গান করা হয় ৷ যার প্রথম শব্দই “শিব হে ” ৷ অনেক জায়গায় কুমিরের পুজো হয় ৷ গাজনের সন্ন্যাসীদের কৃচ্ছসাধন দেখার মত ৷ শিবের বর পাওয়ার আশায় কঠোর তপস্যা করেছিলেন “বান রাজা” ৷ সাধনায় শরীর শুকিয়ে গেলেও যখন বর পান না তখন নিজের দেহ ফুটিয়ে রক্তার্ত করলেন ৷ সেই থেকে জিভের মধ্যে শলাকা তীর ঢোকানো , কাঁটা ঝোপে ঝাঁপ দেওয়া ,বঁটি ঝাঁপ , বাণ ফোঁড়ার মত কষ্টসাধ্য সাধনা করেন গাজন সন্ন্যাসী বা ভক্ত্যা ৷ প্রবলবেগে মাথা ঘুরিয়ে মন্ত্র বলতে বলতে অনেকের “ভর” হয় “৷ গাজনের পুজোয় সবার সমানাধিকার ৷ মহাদেবের প্রতি অবিচল ভক্তি ও নিষ্ঠায় তাঁরা করেন “ফুল খেলা ” বলে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া , আগুনের উপর দিয়ে হাঁটা ,দেহ রক্তার্ত করা ,কাঁটায় ঝাঁপ দেওয়া , গলা বেঁধা , জিভে লোহার শলাকা বেঁধানো ” বাণ সন্ন্যাস” ,পিঠে বঁড়শি বিঁধে চড়ক গাছে ঝুলন্ত ঘোরা ” বঁড়শি সন্ন্যাস”, পিঠের চামড়া ভেদ করে সরু বেত প্রবেশ করা “বেত্র সন্ন্যাস ” ! যা রোমহর্ষকর ও ভয়াবহ ৷ এতে নিজের পাপ ও দেশের পাপ নাকি দূর হয় ৷ আগে কোমরের দুপাশে বাণ ফুঁড়ে বাণগুলি সরষের তেলে ভেজানো কাপড়ের টুকরোয় জড়িয়ে আগুন ধরানো কালনা এলাকায় দেখেছি এই সময় প্রবল গর্জনে ভক্তারা শিবের জয়ধ্বনি করতেন ও জোরে ঢাক বাজতো ৷ এখন তা বন্ধ হয়েছে ৷ এখন হয় ধুনি বা ধুনুচি নাচ ৷ এমন কষ্টসাধ্য অনুষ্ঠান তামিলনাড়ুতে সুব্রহ্মনিয়ম বা কার্তিক উপাসনায় দেখেছি ৷ গ্রাম বাংলার অনেক জায়গায় ” বানাম ” পিঠে বঁড়শী গিঁথে চড়কে ঘোরানো এখনও হয় ৷ দু থেকে ষোল জন পর্যন্ত একটি চড়ক গাছে ঘুরতে পারেন ৷ পূর্বস্থলীর মুড়াগাছা গ্রামে ও বালুর মাঠে গতবারেও দেখেছি ৷ ” বম বম লোকেশ্বর / লোকে বলে মহেশ্বর/ তুমি বিপদে হর জীবন ধর / বিশ্ব ভূবন ভূতেশ্বর ” এই সব গান গাইতে গাইতে কষ্ট সহ্য করেন ৷ সন্ন্যাসীরা এই ক’দিন নিরামিষ হবিষ্যি গ্রহণ করে নিয়ম পালন করেন ৷ রুদ্র অর্থাৎ কালার্করুদ্রদেব বা শিবের সাথে কালী বা নীল চন্দ্রিকা বা নীল পরমেশ্বরীর বিয়েকে বলে নীল ব্রত যাকে নীলা বা নীলাবতীও বলে , মহিলারা পালন করেন ৷ “হুতোম প্যাঁচার নকশা” য় সেকালের কলকাতার গাজন ও চড়কের নানা আখ্যান আছে ৷ তারমধ্যে বিভিন্ন রকম পোশাক পরে “সাং” উল্লেখযোগ্য ৷ স্যার চালর্স ডি অরলির আঁকা ছবিতে সাং এর শোভাযাত্রা কেমন ছিল জানা যায় ৷ আজও ছাতু বাবুর বাজার ও কলেজ স্কোয়ারে চড়কের মেলা বসে ৷ হুগলির চুঁচুড়ার ষন্ডেশ্বরের গাজন কয়েকশো
বছরের ৷ শিব মন্ত্র নিয়ে গেরুয়া বস্ত্র পড়ে , উপবীত ধারণ করে হবিষ্যান্ন ( হবিষ্যি)খেয়ে “খাটাখাটুনি ও যোগাচার” পালন করেন ৷ ষন্ডেশ্বর ছিলেন মগধের পিপ্পিলি রাজবংশের গৃহদেবতা ৷ তাই , ওখানকার রাজার পাত্রমিত্র সেজে সাতজন সন্ন্যাসী এই গাজন অনুষ্ঠান করেন ৷ বাঁকুড়ার এক্তেশ্বরের গাজনে খিস্তি খেউর প্রচলিত ছিল ৷ এতে বোঝা যায় গাজন সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসব ৷ মহারাষ্ট্রের বগাড় , সিকিম -ভূটানের চোড়গ , অন্ধ্রের সিরিমনু , শ্রীলঙ্কার টুককুম উৎসবের সাথে এই পার্বণের সাদৃশ্য আছে ৷ যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে “গাজন আসলে হরকালীর বিয়ে ” ৷ শিব -শক্তির এই মিলন “শং নিতং সুখমানন্দনিকারঃ পুরুষঃ স্মৃত ৷ / বকারঃ শক্তিরমৃতং মেলনং শিব উচ্যতে ” ( শিবপুরাণ) ৷ গাজনের সন্ন্যাসী ও সাং এরা হলেন এর বরযাত্রী ৷ তবে , নবদ্বীপে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন শহরের পঞ্চ শিব – বুড়ো শিব , যোগনাথ , অলোকনাথ , বালক নাথ ও এলানে শিবের স্ব স্ব মন্দিরে ধূমধাম করে গৌরীর সাথে বিয়ে হয় ৷ নবদ্বীপের ব্যবসায়ীরা নিজেদের জিনিষ ও টাকায় এই বিয়ের যৌতুক , ভোজের ব্যবস্থা করেন ৷ গাজনে সন্ন্যাসীরা উপবীত বা পৈতে পড়েন, উপবাস , ফলাহার ও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন করেন ৷ বর্ধমানের কুড়মুনে “মড়ার খুলি ” নিয়ে তাঁরা নাচেন ৷ চড়ক গাছ সারাবছর পাশেই কোন জলাশয়ে রাখা হয় তুলে উঁচু কাঠের উপর আড়াআড়ি কাঠে দড়ি বেঁধে পিঠে বঁড়শি গেঁথে ” চড়কে ” ঘোরানো হয় ৷ যদিও ১৮৬৩ সালের এক আইনে এগুলো নিষিদ্ধ করা হয় ৷ তবু চলছে ৷ ছেলেরা মেয়ে সেজে নাচে ৷ কোথাও বা ডাকিনী , যোগিনী , হনুমানের মুখোস পড়ে সঙ্গীরা নাচে ৷ দিনাজপুরে শিব পার্বতী সেজে নাচ সেখানকার লোকসংস্কৃতির অঙ্গ ৷ সংক্রান্তির আগের দিনে বহুরকম শাকসব্জি দিয়ে রাঁধা ” পাঁচন ” খাওয়ার প্রচলন আছে হাতিয়া , ভোলা , নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের এবং সেদেশ থেকে আসা এখানকার হিন্দু বাড়ীতে ৷ বিভিন্ন স্থানে অনেক বাড়ীতে তেতো বা টক খাওয়া হয় ৷ ফরিদপুরের হিন্দুরা তিতা ডাল করেন ৷ তেমাথার মোড়ে গিয়ে শত্রুর মুখে ছাই আর মিত্রের মুখে ছাতু দেওয়ার প্রথা পালন করেন৷
সবই আসলে নতুন বছরকে আবাহনের নামান্তর ৷
কাটোয়ার অনেক জায়গায় ” বোলান গান ” হয় ৷ শ্রীখন্ডের ভূতনাথ ঠাকুরের কাছে বোলান শুনেছি ৷ সবাইকে চৈত্র সংক্রান্তি / চড়ক / গাজনের অভিনন্দন !

 

More from CultureMore posts in Culture »
More from InternationalMore posts in International »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Mission News Theme by Compete Themes.