Press "Enter" to skip to content

 অ্যাডিউ রেড মাইনার্স ! স্যালুট টু ইউ… ।

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৮ আগস্ট, ২০২৬।  ভারতীয় ফুটবলের একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান। সাদা জার্সি গায়ে সবুজ মাঠে আর দেখা যাবে না প্রণয় হালদারদের। মাত্র পাঁচ বছর আগে যারা আইএসএল লিগ শিল্ড জিতে দেশের অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল, গতকাল যুবভারতীতে ডুরান্ড কাপের কোয়ার্টার ফাইনালই হয়ে রইল তাদের শেষ যুদ্ধ। শেষ ম্যাচেও বুক চিতিয়ে লড়াই করে মাথা উঁচু করেই বিদায় নিলেন ফুটবলাররা। জামশেদপুর এফসি-র এই আকস্মিক বিদায় স্তব্ধ করে দিয়েছে গোটা ফুটবল দুনিয়াকে।

সোমবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডুরান্ড কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং জামশেদপুর এফসি। ম্যাচের শুরুতেই মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে গোল করে মোহনবাগানকে এগিয়ে দেন সাহাল আবদুল সামাদ। শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, ম্যাচটি হয়তো সহজেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে সবুজ-মেরুন শিবির। কিন্তু এত সহজে হার মানার পাত্র ছিল না জামশেদপুর। প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোলরক্ষক বিশালের ভুলে সমতায় ফেরে তারা। তারপর ম্যাচের বাকি সময় দুই দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও নির্ধারিত সময়ে আর কোনও গোল হয়নি। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

পেনাল্টি শুটআউটেও অসাধারণ লড়াই জামশেদপুর এফসির। প্রথম আটটি শট পর্যন্ত মোহনবাগানের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা তাদের। শেষবারের মতো মাঠে নেমে যে কোনও মূল্যে জয় ছিনিয়ে আনার প্রবল ইচ্ছা প্রতিটি ফুটবলারের খেলায় ! কিন্তু ভাগ্য শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গ দেয়নি। সাডেন ডেথে গিয়ে হার মানতে হল জামশেদপুরকে। তবুও বিদেশি ফুটবলার ছাড়াই মনে রাখার মত লড়াই ! তাই প্রশংসা কুড়িয়েছে ফুটবলপ্রেমী থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ সবার। অনেকের মতে, হারলেও সম্মান নিয়ে মাঠ ছেড়েছে জামশেদপুর।

এই ম্যাচের পরই কার্যত শেষ জামশেদপুর এফসির যাত্রা। ডুরান্ড কাপের পর আর কোনও প্রতিযোগিতায় মাঠে দেখা যাবে না এই ক্লাবকে। ভারতীয় ফুটবলের মানচিত্র থেকে মুছে যাবে এক সময়ের সফল এই দল। তবে ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস মনে রাখবে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে আইএসএল লিগ শিল্ডজয়ী একটি ক্লাবের এমন পরিণতি অনেক সমর্থকের কাছেই অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

ম্যাচ শেষে আবেগ সামলাতে পারেননি দলের অধিনায়ক প্রণয় হালদারও। তিনি বলেন, “ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা এখনও কিছুই জানি না। তবে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।” তাঁর কথাতেই ফুটে উঠেছে সতীর্থদের লড়াইয়ের মানসিকতা এবং ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা।

প্রণয়ের সঙ্গে মোহনবাগানের সম্পর্কও বহুদিনের। একসময় তিনি সবুজ-মেরুন জার্সি গায়ে খেলেছেন। তাই ম্যাচ শেষে যুবভারতী থেকে বেরোনোর সময় অসংখ্য মোহনবাগান সমর্থক তাঁকে ঘিরে ধরেন ! এক আবেগঘন মুহূর্ত ! হঠাৎ নিজের কিটস থেকে জার্সি বের করে একে একে সমর্থকদের হাতে তুলে দেন ! হাসিমুখে বলেন, “এই জার্সিটা কেউ তো পরবে। সেটা দেখেই আমি খুশি হব।” চোখে জল ! বিদায়ের মুহূর্তে প্রাক্তন ক্লাবের সমর্থকদের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা সকলের মন ছুঁয়ে যায়।

তবে জামশেদপুর এফসির অধ্যায় শেষ হলেও ক্লাবের আইএসএল লাইসেন্স হারিয়ে যাচ্ছে না। সেই লাইসেন্স নিয়েই আগামী আইএসএলে খেলবে চার্চিল ব্রাদার্স। জানা গিয়েছে, মাত্র ১০০ টাকার প্রতীকী টোকেন মূল্যে এই হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে ! শুধু লাইসেন্সই নয়, জামশেদপুরের দুই কোচের চুক্তিসহ মোট ১২ জন ফুটবলারও নতুন মালিকানার অধীনে চলে যাবেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকেই চার্চিল ব্রাদার্স আনুষ্ঠানিকভাবে জামশেদপুরের কোচিং স্টাফ ও ফুটবলারদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

তাই ক্লাব বন্ধ হয়ে গেলেও ফুটবলার এবং কোচদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেল। অন্তত তাঁদের পেশাদার ক্যারিয়ার নতুন একটি ক্লাবের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। হয়ত জামশেদপুর এফসি নামটি ভারতীয় ফুটবলের মাঠে দেখা যাবে না, তবুও এই দলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি, সাফল্য, সংগ্রাম এবং সমর্থকদের আবেগ চিরকাল বেঁচে থাকবে।

মাত্র পাঁচ বছর আগে আইএসএল লিগ শিল্ড জয়ের উচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে আজকের বিদায়ের কান্না এই অল্প সময়েই জামশেদপুর এফসি ভারতীয় ফুটবলে রেখে গেল এক অনন্য অধ্যায়। শেষ ম্যাচে হারলেও তাদের লড়াই, আত্মসম্মান এবং অদম্য মানসিকতা বহুদিন ধরে মনে রাখবেন ফুটবলপ্রেমীরা।

 

 

 

 

More from SportsMore posts in Sports »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *