Press "Enter" to skip to content

হঠাৎ মুখোমুখি বিশ্ব – ২০৪৫

Spread the love

সুব্রত ঘোষ: কলকাতা, ২৬ এপ্রিল ২০২০ যুগান্ত হঠাৎ আবিষ্কার করল, ও একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। চারপাশের দৃশ্যগুলো সম্পূর্ণ অচেনা। পুরো রাস্তায় লোকজন বেশি নেই। অদ্ভুত ভাবে চারিদিকে সবুজের সমারোহ। গাড়ি যে কটা চোখে পড়ছে সেগুলোর পিছনে ধোঁয়া নিষ্ক্রমণের নল নেই। প্রকৃতির সতেজতায় এক বুক নিঃশ্বাস নিয়ে ও অনুভব করল এ তো ওর চেনা পৃথিবী নয়। তবে কি ও অন্য কোনো গ্রহে চলে এসেছে। পরক্ষণেই ভাবল, ধ্যাৎ, তাই কখনও হয় নাকি। মনে একরাশ বিস্ময় নিয়ে দু পা এগোতেই রাস্তার ধারের একটি সুসজ্জিত ছোট কুঠুরি থেকে একজন নিরাপত্তাকর্মী বেরিয়ে এসে, ওকে দাঁড় করিয়ে, ওর দিকে এমন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, যেন অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী দেখছে। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে লোকটি জানবার চেষ্টা করল, ও কে ? কোথায় থাকে ? কোথায় যাবে? মুখে মাস্ক নেই কেন ? যুগান্ত র মাথাটা কিরকম গুলিয়ে গেল। মনে হল কোনো প্রশ্নের উত্তরই ওর জানা নেই। ঘোলাটে নিষ্পলক নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। ওঁর কুঠুরি থেকে মাস্ক, গ্লাভস, একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ছোট বোতল ওকে দিয়ে, সেগুলোকে সাথে সাথে ব্যবহার করার নির্দেশ দিল। হাতের ওয়াকিটকি তে কাকে, কি যেন বলল। যুগান্ত যেন স্থবির হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স গোছের একটা গাড়ি এসে পড়ল। পুলিশ ওকে গাড়িটিতে উঠতে অনুরোধ করতেই, যন্ত্রচালিতের মত উঠে যেতেই, দরজা বন্ধ হয়ে গাড়িটি চলতে শুরু করল। অজানা আশঙ্কায় দুরু দুরু বক্ষে লক্ষ্য করল, মহাকাশচারীদের মত পোশাকে একজন গাড়িটি চালাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটি থেমে গেল, দরজাটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে খুলে গেল।
একজন যেন ওর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। গায়ে সাদা অ্যাপ্রণ, মুখে অমায়িক হাসি, নেমে আসার জন্য যেন সাদর অভ্যর্থনার ইঙ্গিত। গাড়ি থেকে নেমেই যুগান্ত অবাক।

চারিদিকে অত্যাধুনিক স্থাপত্যের গগনচুম্বী অট্টালিকা, তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা, আর চারিদিকে সবুজের ছোঁয়া। ভদ্রলোকের সাথে ক্যাপসুল এলিভেটরে ১১২ তলায় নেমেই একটা লেখা চোখে পড়ল, ” মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা বিভাগ “। বিলাসবহুল ব্যবস্থার মধ্যে বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চলল পরীক্ষা নিরীক্ষা। এখানে ওকে যা যা প্রশ্ন করেছে, তার মধ্যে দুটিমাত্র উত্তর ও সঠিক দিতে পেরেছে, নিজের প্রথম নাম, আর অস্তমিতাকে ভালোবাসার কথা। সব কিছুর পর কাউন্সেলিং বিভাগে নিয়ে গিয়ে ওকে বিশদে জানানো হল যে, ওর পরিচয় সনাক্ত করা যায় নি। ওর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২শে মার্চ ২০২০, থেকে যুগান্ত একটা সময়ের শূন্যতার মধ্যে আটকে পড়ে। এখন ২০৪৫ সন। করোনা ভাইরাসের আক্রমণের পর এটা এক সম্পূর্ণ নতুন বিশ্ব। এই বিশ্বের সাথে অভিযোজিত হওয়ার জন্য সমস্ত সহযোগিতা ওকে করা হবে। এখন ওকে পৌঁছে দেওয়া হবে পুলিশের কাউন্সেলিং বিভাগে। ইতিমধ্যেই ওর সব তথ্য চলে গেছে। ওখান থেকেই ওকে সব বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেই মত যথাস্থানে ওকে পৌঁছে দেওয়া হল। এখানেও একই রকম মর্যাদার সাথে ওকে গ্রহণ করা হল।
একজন পদস্থ কর্মকর্তা ওকে নিয়ে বসলেন। প্রথমেই উনি এই বিভ্রান্তিকর অবস্থা কাটানোর জন্য, যুগান্ত র সামনে একটা আয়না রাখলেন। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে যুগান্ত চমকে উঠল। মাথার সব চুল সাদা। মুখ পুরো ঢেকে গেছে সাদা দাড়ি আর গোঁফে। চোখের কোণে স্পষ্ট বলিরেখা। হঠাৎ ঘরের নিঃস্তব্ধতা ভঙ্গ করে অফিসারের কণ্ঠস্বর গম গম করে উঠল। ” আমাদের নতুন বিশ্বে স্বাগতম। আজ থেকে আপনার নাম মিঃ যুগান্ত রূপকার। আপনার পরিচয় : বিশ্ব নাগরিক, ঠিকানা : ভারতবর্ষ। আপনাকে আপনার পরিচয় পত্র হিসেবে একটি বায়োমেটালিক কার্ড দেওয়া হবে। তাতে আপনার ছবি, ঠিকানা এবং একটি ইউনিভার্সাল নাগরিক কোড ছাপা থাকবে। কার্ডটি ব্যবহার করার জন্য আপনাকে একটি গুপ্ত পাসওয়ার্ড দেওয়া হবে, যা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত হিসাবে সংরক্ষিত থাকবে। আপাতত জীবনধারণের জন্য বিশ্ব ব্যাংকে আপনার অ্যাকাউন্টে কিছু ইউ.টি.ইউ.( ইউনিভার্সাল ট্র্যানস্যাকশন ইউনিট, যেটাকে আপনি টাকা বলে জানেন ) রেখে দেওয়া হয়েছে। এটি সারা বিশ্বে অনুমোদিত। আপনার আই কার্ড আর পাসওয়ার্ডের সাহায্যে আপনি ওগুলো তুলে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন। সমস্ত লেনদেন এই কার্ডের মাধ্যমেই হবে। বিশ্বের যেখানেই যাবেন, এই কার্ডটি দিলেই আপনার নাগরিক কোড সিনক্রোনাইজ করে দেওয়া হবে, আর আপনার পাসওয়ার্ড দিয়ে আপনি সমস্ত পরিষেবা ব্যবহার করতে পারবেন। আপনাকে আই প্যাডের মত দৈর্ঘ্যে ছয় ইঞ্চি আর প্রস্থে সাত ইঞ্চি একটা ডিভাইস দেওয়া হবে তার নাম ওয়ার্ল্ডস্লেট। তাতে সবরকম পরিষেবামূলক অ্যাপ দেওয়া আছে। আপনি প্রথমেই জব অ্যাপ খুলবেন। আপনার পছন্দ এবং চাকুরি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব তথ্য পূরণ করলেই আপনি চাকরি পেয়ে যাবেন। এখন যে পরিমাণ ইউ. টি. ইউ আপনাকে দেওয়া হচ্ছে, তা ধীরে ধীরে আপনার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে। আপনি এখন বিনামূল্যের আবাসনে থাকবেন। সময় মত আপনাকে অন্য ব্যবস্থা করার জন্য সহযোগিতা করা হবে। আপনার ধর্ম ‘মানবিকতা’, আর মন্ত্র ‘ ভালবাসা ‘, লক্ষ্য বিশ্বভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা। আপনার কিছু প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করতে পারেন।” যুগান্ত আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমি অস্তমিতাকে ভালোবাসতাম, ওকে কি করে খুঁজে পাওয়া যাবে ?, যদি খুঁজে না পাই, বাকি জীবনটা কি একা কাটাতে হবে ?, আমার আই কার্ডে কি ভোটাধিকার থাকবে ?,” অফিসারের কণ্ঠস্বর পুনরায় গমগম করে উঠল, “ওয়ার্লডস্লেটে, ওল্ড ফ্রেন্ড সার্চ করে তাদের প্রোফাইল আপলোড করলেই সবাইকে পেয়ে যাবেন। কনফারেন্স কানেক্টর অ্যাপ এ সবার সাথে ডিজিট্যালি কথাও বলতে পারবেন। দেখা করতে হলে নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য জায়গা অগ্রিম সংরক্ষিত করতে হবে। একসাথে পাঁচজনের বেশি জমায়েত করতে পারবেন না। লাইফপার্টনার অ্যাপ এ আপনার প্রোফাইল আর পছন্দ আপলোড করলেই আপনি আপনার পছন্দ মত জীবনসঙ্গীনি বাছাই করে নিতে পারবেন। একজন উকিলের উপস্থিতি আর পুলিশের অনুমোদন যুক্ত, একসাথে থাকার কাগজে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই আপনারা একসাথে থাকার অধিকার অর্জন করবেন। এই উপলক্ষে কোনো জমায়েত অনুমোদিত নয়। আমাদের বিশ্বে, কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নেই। প্রত্যেক দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রের কৃতী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি তৈরী হয়। সেই কমিটির মনোনিত সদস্যদের নিয়ে তৈরী হয় কেন্দ্রীয় বিশ্ব কমিটি। বিশ্ব কমিটিই প্রতিটি দেশের মানবসম্পদ, খনিজ সম্পদ, প্রযুক্তিগত উন্নতি বিচার কোরে, বিশ্ব প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী, কোন দেশ কি উৎপাদন করবে, তা নির্ধারণ করে দেয় এবং চাহিদা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আপনার কোনো মতামত থাকলে, ওপিনিয়ন, ক্যোয়ারিস, প্রোটেস্ট অ্যাপে আপলোড করলেই আপনার সাথে বিষয়বস্তু নিয়ে গুরুত্বের সহিত আলোচনা করা হবে। এখন আপনাকে আপনার থাকার জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হবে। অদ্ভুত সুন্দর একটি নির্ধারিত গাড়িতে ওকে তুলে দেওয়া হল। লক্ষ্য করল গাড়িগুলি সৌরশক্তি অথবা ব্যাটারি দ্বারা চালিত। যে বাড়িটির সামনে ওকে নামিয়ে দেওয়া হল, যুগান্ত অভিভূত হয়ে গেল। পুরো বাড়িটির নীচ থেকে উপর পর্য্যন্ত প্রত্যেকটি তলা সবুজ গাছ দিয়ে ঘেরা, যেন এক স্বপ্নপুরীর রাজপ্রাসাদ।

মোহে আবিষ্ট যুগান্ত যেই প্রবেশ করতে যাবে অমনি কানে এল একটি ঘোষণা। চোখ খুলে দেখে ঘরে টিভি চলছে, আর এক সুবেশা তরুণী ঘোষণা করছে, ” ঘরের বাইরে যাবেন না। কোনো ভাবেই লকডাউনকে হালকা ভাবে নেবেন না। কোরোনা মোকাবিলায় এটাই একমাত্র পথ। ঘরে থাকুন,সুস্থ থাকুন।” বিছানা থেকে নেমে জানালাটা খুলতেই, সূর্যোদয়ের রক্তিম ছটায় সারা আকাশ যেন লাল আবিরের রংএ রাঙিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য্যে, যুগান্ত কে মুগ্ধ করে দিল।

অপলক দৃষ্টিতে বিশাল এই রক্তিম ব্যাপ্তির দিকে তাকিয়ে যুগান্ত র হৃদয় ছুটে চলল ওর স্বপ্নে দেখা নতুন বিশ্বের খোঁজে।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *