Press "Enter" to skip to content

“সতীপীঠ অট্টহাস”…..

“সতীপীঠ অট্টহাস”, কেতুগ্রাম , পূর্ব বর্ধমান ৷
—————————————————————-
ডাঃ দীপালোক বন্দোপাধ্যায় : ২১ জানুয়ারি ২০২২। এখানে পীঠদেবী “ফুল্লরা ” আর ভৈরব ” বিল্লেশ ”
বা বিল্লেশ্বর ৷ এখানে সতীর অধঃ ওষ্ঠ বা নিচের ঠোঁট পড়েছিল ৷কেউ বলে পড়েছিল উর্দ্ধ ওষ্ঠ বা উপরের ঠোঁট পড়েছিল ৷ শিলামূর্তিটি ওষ্ঠ আকারের ৷ কেতুগ্রামের উত্তরবাহিনী বহুলা বা ঈশানী (যাকে স্থানীয় ভাবে কাঁদর বলে) নদীর তীরে বনের মধ্যে এই অট্টহাস তীর্থ ৷ বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে ছেদিত হয়ে এখানে দেবীর ওষ্ঠ বা ঠোঁট পড়েছিল ৷ ওষ্ঠ হল অট্টহাসের দ্যোতক তাই এই শক্তিপীঠের নাম হয় “অট্টহাস” ৷ আবার কেউ কেউ বলেছেন দেবী অসুর বধ কালে অট্টহাস্যে ত্রিভুবন আতঙ্কিত হত বলে অট্টহাস নাম ৷ আবার আরেক মত এই মন্দিরের অরন্যময় পরিবেশে রাতে অট্টহাসির শব্দ শোনা যেত বলে মন্দিরকে পূণ্যার্থীরা অট্টহাস বলেন ৷ তপোবনের মধ্যে গা ছমছমে ভাব ৷ পাখির ডাক ৷ সোনাঝুরি সহ হরেক গাছের জঙ্গল ৷ মন্দিরের আগে রয়েছে সতীর মরদেহ কাঁধে শিবের ২০ ফুটের রুদ্রমূর্তি ৷ আরেকটু এগোলেই বিশাল বৃক্ষের উপরে খেজুর গাছ (সিমবায়োসিস) ৷ এখন আর গাছটিতে বাদুড়ের আস্তানা নজরে পড়লো না ৷ আছে শামুকখোল পাখি ৷ মন্দিরে প্রবেশ মুখে আছে ধ্যানস্থ মহাদেব ৷ তার সামনেই নাট মন্দির ৷ দেখে মনে হয় নেপাল বা দার্জিলিং এর কোন মন্দির ৷ দেওয়ালের চারপাশে শিব নিন্দা শুনে সতীর দেহত্যাগ ৷ বিষ্ণুচক্রে খন্ডিত সতী দেহ ৷ মূল
মন্দিরের পূর্বপাশে সাধক ভোলাবাবার মন্দির ৷ পঞ্চমুন্ডির আসন ৷ রটন্তী কালিকা মন্দির ৷ এই কালীর কাছে ডাকাতরা পুজো করত ৷ আগে অট্টহাসে পূজার পর শিবাভোগের (শিয়ালকে খাওয়ানো ) ব্যবস্থা ছিল ৷ ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় শৃগালকূল ধ্বংস হওয়ায় ৷ এখন ওই প্রথা উঠে গেছে ৷ শাক্তদেবী হলেও এখানে বাৎসরিক পুজো হয় বৈষ্ণবীয় উৎসবের সময় দোল বা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় ৷ এখানে ধূমধাম সহকারে ওই উৎসবের প্রচলন করেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ বা কাটোয়ার বিখ্যাত দুলাল সাধু ৷
যদিও বীরভূমেও অট্টহাস সতীপীঠ আছে ৷ যা লাভপুরের কাছে ৷ সেখানেও গিয়েছি ৷ আগে বলেছি সেই সাধনপীঠ তথা সতীপীঠের কাহিনী ৷
এই সতীপীঠে দেবীর পাথরের প্রতিমা উপর মহিষমর্দ্দিনীর পাথর মূর্তি রেখে নিত্যসেবা করা হয়৷ মহাভোগ যোগে কালীমন্ত্রে দেবী পূজিতা হন ৷ এখানে মূল অধিষ্ঠাত্রী দেবী দন্তরা চামুন্ডা ৷ ভূগর্ভের কয়েক হাত নিচে রয়েছে সতীর মূল শিলা বা পাথর ৷ হাজারেরও বেশি বছর আগের একটা নথি পাওয়া গেছে একটা স্কেচ তাতে এর প্রমাণ পাওয়া যায় ৷ “অট্টহাসে চামুন্ডা তন্ত্রে শ্রী গৌতমেশ্বরী “৷ তাই , অনেকে বলেন এখানে
প্রাচীন বৌদ্ধ দেবীর হিন্দুআয়ন হয়েছে ৷ তাই , মনে হয় হিন্দু ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক , বজ্রযানী ও সিদ্ধাচার্যগণ এখানে সাধনা করেছেন ৷
মায়ের কাছেই ছোট মন্দিরে বিল্লেশ থাকলেও মূল
বিল্লেশ মন্দির বিল্লেশ্বর গ্রামে ৷ সেখানে শিব লিঙ্গ মাটিতে বসা ৷ কষ্ঠি পাথরের শিববাহন ষাঁড়ের মূর্তি ৷ মহাপীঠ নিরূপম
গ্রন্থে এই পীঠের কথা বলা হয়েছে ৷ এই পীঠে একসময় ভয়ানক রঘু ডাকাত পুজো করে ডাকাতি করতে যেত ৷ সে নরবলি দিত বলে জনশ্রুতি আছে ৷ আবার যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত “বাংলার ডাকাত ” বইয়ে বলেছেন এখানে বেহারী বাগদী নামে এক ডাকাত পুজো করে নরবলি দিত ৷ ত্রিশ একর জঙ্গলে ঘেরা এই মন্দিরে আজও গা ছমছমে পরিবেশ ৷ বর্ধমান এর রাজা ১০ বিঘা বাগান ও ২০ বিঘা এই জমি দান করেছিলেন ৷ একসময় মন্দির বলতে ছিল ছই বা টোপ্পর আকৃতির পাঁচ ফুট উঁচু বেষ্টনী ৷ পরে খেড়ুয়ার জমিদার দেবীদাস চট্টোপাধ্যায় এখানে পাকা মন্দির নির্মাণ করেন ৷
১৩৪০ বঙ্গাব্দে খাটুন্দির কালী চট্টোপাধ্যায় , যিনি
সোনারুন্দির নায়েব ছিলেন এই মন্দির পুর্ণনির্মান
করে দেন ৷ তবে, এই পীঠের আসল উন্নতি হয়
কাটোয়া শাঁখাইয়ের সাধু ঐ দুলাল বাবা বা স্বামী ব্রহ্মানন্দজীর হাতে ৷ তারপর ভারত সেবাশ্রম থেকে আসা সাধু রামদাস ব্রহ্মচারী এর আরো সংস্কার করেন ৷
বর্তমান দায়িত্বে আছেন মহারাজ মহেন্দ্র শঙ্কর গিরি ৷
মূল মূর্তি শিলাকৃতি ৷ পরে প্রাচীন মন্দিরের গর্ভগৃহে
অষ্ট ধাতুর মহিষমর্দ্দিনী দুর্গা প্রতিমা বসানো হয়েছে ৷ একসময় এই জায়গার নাম ছিল খুলারাম পুর বা তুলারাম পুর ৷ মনে করা হয় ৭৩২ সালে কান্যকুব্জ থেকে যে পাঁচ জন ব্রাহ্মণ দক্ষ , শ্রীহর্ষ , ছান্দড়া, বেদগর্ভ ও ভট্টনারায়ণ বাংলায় এসেছিলেন ৷ এরমধ্যে বেদগর্ভ এখানে সাধনা করেন ৷ তাঁর তিন ছেলে – মহাদেব , ভবদেব ও অট্টহাস ৷ বিশ্বাস এখানে সাধনা করে তিনি ছোট ছেলের ঐ নাম রেখেছিলেন ৷ অট্টহাস থেকে পাওয়া অধরেশ্বরী মূর্তি কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের জাদুঘরে আছে ৷ অনেকে তাঁকে বলেন দন্তুরা চামুন্ডা ৷ যা আট চামুন্ডার অন্যতম ৷ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে গিয়ে দেখেছি পট স্টোনে তৈরী দৈর্ঘ্যে সওয়া এক ফুট এবং প্রস্থে সাড়ে ছয় ইঞ্চির মূর্তিটি ৷ প্রতিমার গোলাকার চোখ যেন বেরিয়ে আসছে ৷ মুখের ভিতর থেকে দু পাশের দুটি দাঁত বের করা ৷ বুকের পাঁজর মাংস শূণ্য ৷ মণিখচিত রত্নহার ৷ দেবীর বাঁ হাত মাটিতে এবং ডান হাত মনে হয় হাঁটুতে রাখা ছিল ৷ ঐ খানটা ভাঙা ৷ আমার মনে হয়েছিল উনি দশমহাবিদ্যার অন্যতম ধূমাবতী ৷ অট্টহাসের মন্দিরে আগে একটি কৌটায় ঠোঁট চিহ্নিত একটা পাথর ছিল ৷ যা পুণ্যার্থীরা চাইলে দেখতে পেত ৷ পরে তা ১৯৬২-৬৩ সালে এখানকার সন্ন্যাসী মহারাজ ব্রহ্মানন্দ পাশে কুন্ডুপুকুরে ফেলে দেন বলে স্থানীয়রা বলেন ৷ কাটোয়া থেকে ২০ কিমি দূরে ও কেতুগ্রাম থেকে ৫ কিমি দূরে কেতুগ্রাম থানার রাউন্দি -শ্রীরামপুর ডাকঘরের অন্তর্গত দক্ষিণডিহি গ্রামে ৮৫ নম্বর জে.এল. ভুক্ত এই সতীপীঠ ৷ কাটোয়া থেকে নিরোল হয়ে সহজেই এখানে আসা যায় ৷ সকাল সাড়ে সাতটায় কাটোয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে একটা বাস সরাসরি অট্টহাস সতীপীঠ পর্যন্ত যায় ৷ এখন কলকাতা থেকে সতীপীঠ দেখানোর বাস হয়েছে ৷ প্রাচীন এই পীঠস্থানটি ১১৭৬ বঙ্গাব্দে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে এলাকাটি জনশূণ্য হয়ে যায় ৷এছাড়া এই এলাকায় বাণ বন্যা লেগেই থাকত ৷ এখন মন্দির পর্যন্ত পিচ ঢালা পথ এবং বর্ষায় ভীষণা ঈশানী নদীর উপর পাকা সেতু হয়েছে ৷ নিরোল স্টেশন থেকেও কাছে ৷তাই , এখন আবার এই সতীপীঠে ভালোই জন সমাগম
হয় ৷ সকাল দশটার মধ্যে ৫০ টাকা দিয়ে কূপন কাটলে দুপুরে পাওয়া পেট ভরে ভোগ প্রসাদ ৷ ভাত , ডাল , দুটি তরকারী , চাটনি ও পায়েস ৷এখানে হিন্দু ধর্মের সব সম্প্রদায়ের ( শৈব , শাক্ত , বৈষ্ণব , বীরাচারী , পশ্বাচারী , যোগী , কাপালিক , অঘোরী ,অবধূত ) সাধকগন সাধন পূজন করেছেন ৷ শ্রীচৈতন্যদেব , বেদগর্ভ , তৈলঙ্গস্বামী ,চিত্রনাথ , বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী , সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ , প্রবোধানন্দ মহারাজ , ভোলাবাবা, রাঘবানন্দ , সানন্দবাবা প্রমুখ এসেছেন ৷নাট্যকার ও রামকৃষ্ণ ভক্ত গিরীশচন্দ্র ঘোষ এই সতীপীঠের পঞ্চমুন্ডী আসনে বসে তপস্যা করেছেন ৷ভৈরব সাধকরা করেছেন ভৈরবী সহ চক্রানুষ্ঠান ৷এখানকার পঞ্চমুন্ডি আসনে রয়েছে অপঘাতে মৃতঅষ্টাদশী মহিলার , একটি বেজী , শিয়াল , সাপ ও হনুমানের মাথা ৷হয় চর্তুমুখী হোম যজ্ঞ ৷ “মহাতীর্থ অট্টহাস সতীপীঠের ইতিকথা ” এবং “আমার অট্টহাস ” নামে দুটি বই বের হয়েছে ৷ নিয়মিত বের হয় ষান্মাসিক স্মরণিকা ” অধরা “৷তন্ত্রচূড়ামণি ও শিবচরিতে মতে সতীর অধরা (ওষ্ঠ)পড়েছিল বলে পত্রিকার অধরা নাম ৷ এখন এখানে রয়েছেন পীঠাধীশ্বর মহেন্দ্র শঙ্করগিরি ৷ ৷তিনি এখানে করেন মানবসেবা ৷করোনা বিপর্যয়েও তিনি নানাভাবে ত্রাণের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ ৷মন্দিরের ফোন নম্বর – ৯৬৩৫৪৬৯৯০৪ এবং ওয়েব সাইট www.attahas.in. মাকে পুরোহিতের মতই জয় দুর্গা মন্ত্রে প্রণাম জানাই ৷
” কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈর রিপুকুলভয়দাং মৌলিবদ্ধেন্দুরেখাং / শঙ্খ চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীর ত্রিনেত্রাম্ ৷/
সিংহস্কন্ধাধিরূঢ়াং ত্রিভুবনমখিলং তেজসা পূরয়ন্তীং ৷/ধ্যায়েদ্দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধি কামৈঃ ৷”জয় মা অধরেশ্বরী , সতীমা অট্টহাসেশ্বরী !
৷কাশী ছাড়া একমাত্র কেতুগ্রামেই আছে দুটি
সতীপীঠ ৷তিনি “বহুলাক্ষী ” দেবী ৷যাঁর ভৈরব “ভীরুক “৷ বহুলা দেবীর মন্দিরটি লালগোলার রাজার তৈরী ৷ ” নমস্তে ভীরুকায় ভূতনাথ নাম ধারিনে ৷ / বহুলাক্ষী ভৈরবায় সদা শ্রীখন্ড বাসিনে৷”
আসলে ভীরুক হলেন শ্রীখন্ডের ” ভূতনাথ ” !এই বহুলাক্ষীই আসলে বিশালাক্ষী বা বাশুলি ৷ এক সময় যার পুরোহিত ছিলেন কবি কৃত্তিবাসের পূর্বসুরী বিখ্যাত সাধক কবি “চন্ডীদাস ” ৷ যাঁর সঙ্গে বিধবা রামীর প্রেমকাহিনী অনেকের জানা ৷ নানুরে রামী চন্ডীদাস এঁর পুজো করতেন ৷ দক্ষিণ ভারতীয় ” রাও ” পদবী ধারী ব্রাহ্মণরা (যাদের উত্তরসুরীরা “রায় ” উপাধি নিয়েছেন ) এর পূজারী ছিলেন ৷ দেখে যান কাছাকাছি দুটি পীঠ ৷

More from GeneralMore posts in General »
More from TravelMore posts in Travel »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.