Press "Enter" to skip to content

বিজ্ঞাপনের রমরমা তখন আর এখন….।

Spread the love

প্রবীর রায় : প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। কলকাতা, ২০ মে ২০২৪। আজকাল টিভি খুললেই দেখা যায় বিজ্ঞাপনের রমরমা। ছোট থেকে বড় সবরকমের কোম্পানির বিজ্ঞাপন। কয়েক হাজার বিজ্ঞাপন রোজ চলে টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে।

টিভি তে বিজ্ঞাপন চালাতে হলে , বিজ্ঞাপনের ফিল্ম বানাতে হয়। সিনেমা হলেও সেটার প্রয়োজন হয়। প্রিন্ট মিডিয়া বা হোর্ডিং, ব্যানারের জন্য তার প্রয়োজন হয় না। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন এত ধরণের টিভির রমরমা ছিল না। দূরদর্শন ছাড়া আর কোনো চ্যানেল ছিল না।

দূরদর্শনে প্রথম কালার কভারেজ করতে এসে কি ফাঁপরে যে পড়লাম। একটা ইতিহাস সৃষ্টি করলাম কিন্তু তার জন্য খেসারত দিতে হলো বেশ কয়েক লাখ টাকা। ১৯৮২ / ৮৩ তে লাখ টাকা মানে অনেক।

ইন্ডিয়াতে প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল টুর্নামেন্ট হলো “জওহরলাল নেহেরু ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট “। ইডেন গার্ডেনসে অনুষ্ঠিত হয় ১৬ই ফেব্রুয়ারী , ১৯৮২ থেকে ৩রা মার্চ, ১৯৮২। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফুটবল টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন। তখন দূরদর্শন ছিল সাদা কালো। কলকাতা দূরদর্শন সেটা কভার করে সাদা কালো protopak ক্যামেরা দিয়ে, তৎকালীন স্পোর্টস প্রোডিউসার বিশ্বনাথ দাসের তত্ত্বাবধানে। আমি মানে আমার কোম্পানি “24 FRAMES ” কভার করে রঙ্গিন ক্যামেরায় মুম্বাইর “Western Outdoor Advertising ” আর জাপানের ” Hitachi ” র সাহায্যে।

যাক এবার আসল ঘটনায় আসি। টুর্নামেন্ট তো শেষ হলো, ৩রা মার্চ। এবার শুরু হলো আমার আসল কাজ। দূরদর্শনে চালাতে হবে, বিদেশের টিমের কাছে বিক্রি করতে হবে। তখনকার সময় প্রায় ৪ (চার) লাখ টাকার বেশি খরচ হয় গেছে। ভারতে প্রথম colour coverage। তার উপর প্রত্যেকটা ম্যাচ rewind করে , ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে , slow motion করে ইন্ডিয়ান প্লেয়ারদের দেখানো হচ্ছে। তৎকালীন ভারতীয় টিমের কোচ পি. কে. ব্যানার্জী সবাইকে দেখাচ্ছেন। সবাই খুব এক্সসাইটেড। কিন্তু আমাকে তো টাকাটা তুলতে হবে।

সবরকম Corporate House দের সঙ্গে কন্টাক্ট করা শুরু করলাম। দিল্লিতে দূরদর্শনের কন্ট্রোলার অফ প্রোগ্র্যাম ছিলেন Mr. J.M. Singh, তখন Mandi House হয়নি। তখন দূরদর্শন ছিল খান মার্কেট এ “লোকনায়ক ভবনে “।

Mr. Singh এর সঙ্গে দেখা করলাম। উনি বললেন “সব খেলা তো দেখানো সম্ভব হবে না। আপনি সবগুলো ম্যাচ নিয়ে একটা সিরিজ করুন, আমরা সম্প্রচার করবো কিন্তু রঙ্গীন দেখাতে পারবো কি না জানি না। আপনি প্রোগ্র্যাম , স্পনসর রেডি করুন , আমি টেকনিকাল টিমের সঙ্গে কথা বলছি। ”

আমি ঠিক করলাম সব ম্যাচ নিয়ে ৪/৫ টা পর্বে ইম্পরট্যান্ট মুহূর্তগুলো তুলে ধরবো। ভালো গোল, ভালো সেভ, ভালো মুভ। স্লো মোশনে, রিয়েল স্পীডে সব দেখাবো। তখন দূরদর্শনে স্লো মোশন দেখানো যেতো না। যেটা দেখাতো , তাকে বলতো গ্রাব্বিং। আটকে আটকে স্লো মোশন হতো। তা ছাড়াও আরো অনেক স্পেশাল এফেক্টস আমাদের মানে “হিতাচির” মেশিনে ছিল। “ওয়েস্টার্ন অউটডোরের” কাছেও ছিল। সেগুলোকে ব্যবহার করবো অনুষ্ঠানটা ইন্টারেষ্টিং করার জন্য।

কলকাতায় ফিরে এসে স্পনসর খোঁজা শুরু করলাম। সব  এডভার্টাইসিং এজেন্সিদের সঙ্গে কন্টাক্ট করলাম। তখন কলকাতায় বড় এজেন্সী বলতে “জেমস ওয়াল্টার থম্পসন “, “ক্লারিওন এডভার্টাইসিং”, “অগিলভি বেনসন মাথের (OBM) , “উল্কা এডভার্টাইসিং” ইত্যাদি। কিন্তু ওনারা কেউই দূরদর্শন স্পন্সরে রাজি না। তখন দূরদর্শনের TRP (টেলিভশন রেটিং পয়েন্ট) ও কম ছিল কারণ খুব কম বাড়িতেই তখন টিভি ছিল। দিল্লী, মুম্বাইও ঘুরলাম কিন্তু সব জায়গায় একই কথা।

ঘুরতে ঘুরতে গেলাম, “পিয়ারলেস” কোম্পানিতে। ওনাদের তখন PRO ছিলেন Mr. Bhattacharjee। ওনার সঙ্গে দেখা করলাম, উনি সব শুনে খুব ইম্প্রেসেড হলেন। বললেন চলুন, আপনাকে Mr. B. K. Roy এর কাছে নিয়ে যাই। Mr. Roy তখন “পিয়ারলেস” এর সর্বেসর্বা।

“পিয়ারলেস ভবন” এ গিয়ে ওনার সঙ্গে দেখা করলাম। উনি আমার পুরো লেটারটা পড়লেন , আমার সঙ্গে ডিটেল্সে কথা বললেন। ওনার বাঙালী প্রীতির কথা সবাই জানতেন। সব শুনে উনি জিজ্ঞাসা করলেন , “তোমার সঙ্গে আর কারা যুক্ত এই কাজে ?” আমি বললাম ” আমি একা। ” জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার বয়স কত ?” আমি বললাম ৩৪। উনি অবাক হয়ে বললেন “তুমি একটা বাঙালি ছেলে, এই বয়েসে এতো বড় কাজ তুলেছো ? কত টাকা রেট করেছো?” আমি বললাম
৮০ ,০০০/- per day। উনি পেপার টা নিয়ে সই করে approved লিখে বললেন “আমি একটা টাকাও কমালাম না। কিন্তু দূরদর্শনের approval তোমাকে আনতে হবে। ”

আমি তো হাতে আকাশের চাঁদ পেলাম। চলে গেলাম দিল্লী। কথা হলো Mr. Singh এর সাথে। উনি বললেন দূরদর্শন তো প্রাইভেট ইন্সুরেন্সএর বিজ্ঞাপন করবে না। “আপনি এক কাজ করুন, ওদের ব্যালান্স শিট, অডিট রিপোর্ট দিন।” আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম, এই সব কোথা থেকে পাবো ? ফোন করলাম কলকাতায় Mr. Bhattacharjee কে , “উনি বললেন আমাদের দিল্লী তে Connaught Place এ অফিস আছে। আমি বলে দিচ্ছি, আপনি ওখানে চলে যান, সব দিয়ে দেবে। ” পিয়ারলেসের দিল্লী অফিস থেকে সব কালেক্ট করে Mr Singh কে সব দিলাম। উনি বললেন “আমি মিনিস্ট্রিতে পাঠাচ্ছি কিন্তু আপনি অন্য স্পন্সরও দেখুন। যদি পিয়ারলেস approve ও হয়, তাহলেও অনেক টাইম লাগবে।”

এই সব মানুষের সহযোগিতা আমি কোনোদিন ভুলবো না। শুধু সহযোগিতা না, প্রতি মুহূর্তে উৎসাহ দিতেন, উপদেশ দিতেন , কি ভাবে এগোবো। আর আজ ! কিছু কমবয়সী ছেলে মেয়ে চ্যানেল আর OTT প্লাটফর্মে কাজ পেয়ে ,ধরাকে সরা জ্ঞান করে। কেউ দেখা করতে গেলে, রিসেপশন থেকে বলা হয় মেইল করুন। রেফারেন্স ছাড়া এনারা দেখাই করেন না। হোয়াটস্যাপ করলে , সামান্য Reply করার ভদ্রতাও এনাদের নেই। এই চাকরি না থাকলে , ওদের দিকে কেউ ঘুরেও তাকাবে না। অথচ তখনকার সময় দিল্লিতে আমি এপয়েন্টমেন্ট ছাড়া “ডিরেক্টর জেনারেল”, দূরদর্শন এর সঙ্গেও দেখা করেছি, তিনজন সেক্রেটারি পেরিয়ে।

যাক এদের নিয়ে আলোচনা না করে, আসল ঘটনায় আসি।

আবার চলে এলাম কলকাতায় স্পন্সরের খোঁজে। গেলাম ” Duncans ” এ। ওনাদের তখন “রিজেন্ট সিগেরেট” এর একটা বিজ্ঞাপন খুব পপুলার হয়েছিল। যার ক্যাচ লাইন ছিল “An Exclusive affair “। “Duncans ” এর বিজ্ঞাপন দেখতেন রানা মুখার্জী। সবার প্রিয় রানাদা। রানাদা সব দেখে শুনে বললেন “ঠিক আছে আমরা রাজি”। তুমি প্রোগ্র্যাম টার নাম দাও #AnExclusiveAffair । সিগেরেট তো বিজ্ঞাপন করা যাবে না , আমরা চা এর বিজ্ঞাপন করবো। “Duncans Tea ” কিন্তু অনুষ্ঠানটার নাম হবে “An Exclusive affair”। কলকাতায় ফেরার আগে , আমি অবশ্য দিল্লিতেও কয়েকটা কর্পোরেট হাউসে চেষ্টা করেছিলাম। যেমন “Nikitasha ” ( রাজ কাপুরের মেয়ে রিতু নন্দার কোম্পানি), “FSL” (Food Speciality of India ) , “Horlicks” ইত্যাদি। এনাদের কারোরই দূরদর্শন বিজ্ঞাপনের উপর কোনো আগ্রহ ছিল না।

কলকাতায় স্পনসর ঠিক হওয়ার পর , আবার দিল্লী, আবার Mr Singh। উনি সব দেখে বললেন ” An Exclusive Affair ” টাইটেল allow করবে না দূরদর্শন। কারণ এর সঙ্গে একটা সিগেরেট ব্র্যান্ডের নাম যুক্ত। আমার তখন কি অবস্থা শুধু আমি জানি। রানাদাকে কন্টাক্ট করলাম। বললাম সব। বললাম আমি আর একটা টাইটেল ঠিক করেছি #An Event to Remember “। রানাদা বললেন আমি পাঠাচ্ছি তোমার প্রপোসাল ডিরেক্টরকে। কলকাতায় ফিরে এলাম।

পরের দিন গেলাম ডালহৌসিতে “Duncans ” এর অফিসে। রানাদা বললেন সরি প্রবীর , ডিরেক্টর ওই টাইটেল এ রাজি না। আমরা তো চায়ের বিজ্ঞাপন করতে চাই না কিন্তু এটা ছাড়া দূরদর্শন রাজি হবে না বলে আমরা চায়ের বিজ্ঞাপন করছি কিন্তু পরোক্ষে ” An Exclusive Affair ” টাইটেল টা দিয়ে সিগারেটের মানে “রিজেন্ট ” এর।

আমি অনেক চেষ্টা করলাম Mr Singh কে কনভিন্স করতে। উনি বললেন , আমার হাতে সব নেই। উপর থেকে রাজি না ওই টাইটেল এ।

উপসংহার: এই অনুষ্ঠানটা শেষ পর্যন্ত টেলিকাস্টই হলো না। একটা বিরাট আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলাম। তখন টিভি বিজ্ঞাপনের মানেই বুঝতো না বেশির ভাগ কোম্পানি। তার পরিণতি আমার ক্ষতি।

পরবর্তী ও শেষ পর্ব
“রবিশঙ্কর — এ লিজেন্ড অফ গ্লোরি ” র অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন পাওয়ার কাহিনী ।

More from EntertainmentMore posts in Entertainment »
More from InternationalMore posts in International »
More from SportMore posts in Sport »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *