Press "Enter" to skip to content

বাদল সরকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে এম এ পড়েন বৃদ্ধ বয়সেই। নাটক লেখা, প্রযোজনার কাজ ছাড়াও দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোতে অদম্য উৎসাহ ছিল।

Spread the love

—————-স্মরণ : বাদল সরকার—————-

বাবলু ভট্টাচার্য: ঢাকা, সত্তর দশকের উত্তাল সময়ের শুরু থেকে ‘থার্ড থিয়েটার’ নামক ভিন্ন এক নাট্য আঙ্গিক ও দর্শনের এর উদগাতা, নাট্যকার, সংগঠক, পরিচালকের ভূমিকাতে পরবর্তী চার দশক ধরে নাট্যজগৎ তাঁকে দেখেছে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বর্ণময় নাট্যজীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন বিজয় তেণ্ডুলকর, গিরিশ কারনাড, হাবিব তনবীরের পাশাপাশি ভারতীয় নাটকের এক বিশিষ্ট স্তম্ভ। তিনি বাদল সরকার। বাদল সরকারের জন্ম হয়েছিল ১৯২৫ সালে, হাওড়ায়। শিবপুর মহাবিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে প্রথমে মাইথন, পরে কলকাতায় চাকরি করেন। ১৯৫৭-৫৯ লন্ডনে ও ৬৩-৬৪ সালে ফ্রান্সে থাকার সময় প্রচুর ইউরোপীয় থিয়েটার দেখার সুযোগ পান। এরপর কর্মসূত্রে নাইজেরিয়ায় থাকার সময় অনেকগুলো নাটক লেখেন। ১৯৬৭ সাল থেকে টাউন প্ল্যানিং এর চাকরী নিয়ে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।

বয়সকালে সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, এখানে তুলনামূলক সাহিত্যে এম এ পড়েন বৃদ্ধ বয়সেই। নাটক লেখা, প্রযোজনার কাজ ছাড়াও দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোতে অদম্য উৎসাহ ছিল। বিশ্বভাষা ‘এস্পারেন্তো’ নিয়ে ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ— এ নিয়ে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। শেষ কয়েক বছরে আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘পুরানো কাসুন্দী’তে বিস্তারিতভাবে নাটক দেখা, অভিনয় করা, নাটক নিয়ে নানা ভাবনা চিন্তার কথা সরস ভাবে লিখে গেছেন। সরসতা বাদলবাবুর জীবন ও রচনার একটা খুব বড়ো দিক। তাঁর প্রথম দিকের নাটকগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই কৌতুক নাটক। রঙ্গনাট্য সঙ্কলন নামে সেগুলি সঙ্কলিত হয়েছিল। বড়ো পিসিমা, সলিউসন এক্স, রাম শ্যাম যদু, বল্লভপুরের রূপকথা— বাংলা কৌতুক নাটকে অতি বিশিষ্ট সংযোজন।

এই নাটকগুলোর প্রেরণা হিসেবে অবশ্য কাজ করেছে কোন কোন বিদেশি নাটক বা চলচ্চিত্র। এরপর বাদল সরকার লিখলেন ‘সারারাত্তির’ এবং তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো নাটক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’— আধুনিক ভারতীয় নাটকের অন্যতম মাইলস্টোন। প্রসেনিয়াম মঞ্চে বাদলবাবুর নাট্যকার হিসেবে তীব্র সাফল্য যখন তৈরি হচ্ছে ‘সারারাত্তির’, ‘এবং ইন্দ্রিজিৎ’, ‘বাকি ইতিহাস’, ‘প্রলাপ’, ‘ত্রিংশ শতাব্দী’, ‘পাগলা ঘোড়া’র মতো নাটকগুলির মধ্য দিয়ে সাত-আট বছরের সময়কালের মধ্যে, তখনই তিনি প্রসেনিয়াম থিয়েটার ছেড়ে সরে আসছেন মানুষের সঙ্গে নাটকের আরো বেশি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। শুরু হয় ‘থার্ড থিয়েটার’ বা অঙ্গনমঞ্চের নাটকের পথ চলা। থার্ড থিয়েটারের জন্যই লেখা হয়েছে সত্তর দশক ও তার পরবর্তী বাদলবাবুর বিখ্যাত নাটকগুলো। সাগিনা মাহাতো, স্পার্টাকাস, মিছিল, ভোমা, সুখপাঠ্য ভারতের ইতিহাস, হট্টমালার ওপারে, গণ্ডী, একটি হত্যার নাট্যকথা, নদীতে— এরা কোথাও প্রচলিত রাজনৈতিক আধিপত্যর তীব্র সমালোচনাতে উচ্চকিত, কোথাও মানুষের দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ের সঙ্গী, কোথাও নতুন মানবিক সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠার মরমী স্বপ্নে বিভোর।

বাদল সরকার ২০১১ সালের আজকের দিনে (১৩ মে) ৮৬ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *